দেশদ্রোহী তাসনিম খলিল ও রাজাকারের দালাল বার্গম্যানের আয়নাবাজির গোমর ফাঁস

0

সময় এখন:

সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশ পেয়েছে দেশাদ্রোহিতার দায়ে পলাতক তাসনিম খলিল পরিচালিত নতুন একটি প্রোপাগান্ডা থ্রিলার। একে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আয়নাবাজি করার চেষ্টা করেছেন খলিল। তবে সংবাদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকতার ছাত্র না হওয়ার কারণে চিত্রনাট্যটি ঠিকমতো সাজাতে পারেনি তাসনিম খলিল।

অজস্র দুর্বলতায় ভরা ভিডিওচিত্রটি কোনো সংবাদতো হয়নি, এমনকি কোনো সফল প্রোপাগান্ডা ভিজ্যুয়ালও হয়ে ওঠেনি। জঙ্গিবাদকে উৎসাহ দেওয়া এবং বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে ছোট করার একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এটি। তাই এর পেছনে কারা আছে তাদের পরিচয় সবার জানা জরুরি।

তবে উগ্রবাদী যে গোষ্ঠীটিকে টার্গেট করে তাসনিম খলিল ও বার্গম্যানরা ভিডিওটি তৈরি করেছে, সেই মহলের মধ্যে কিছুটা উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। কারণ, তারা ভাবছে এটি হাওয়া সিনেমার মতোই কিছু একটা হয়েছে।

কিন্তু সাংবাদিকতার নামে সিনেম্যাটিক থ্রিলার নির্মাণ করে সচেতন মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়না। এ কারণে ইন্টারনেট ও সাংবাদিকতা বিষয়ে শিক্ষিত দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছে খলিল গং। বরং এটি দেখার পর জঙ্গিবাদের অংশনি সংকেত নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ।

দেখা যাক, এই থ্রিলারের সঙ্গে যুক্ত কুশীলবদের পরিচয় ও ইতিহাস সম্পর্কে। শেখ মোহাম্মদ আবু সালেহ ওরফে লিটন নামের এক প্রবাসীকে মূল চরিত্রে রেখে জঙ্গি লিটন, জঙ্গি তেহজীব করিমের মা, জঙ্গিবাদে যুক্ত থাকার কারণে চাকরিচ্যুত সরকারি নিরাপত্তা কর্মকর্তা হাসিনুর ও এদের সাথে সম্পর্কিত জঙ্গি নেতা ও জঙ্গি হামলার ঘটনাগুলো সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে রাখুন।

কে এই কারাতে মাস্টার আবু সালেহ ওরফে লিটন:

পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ আবু সালেহ ওরফে লিটন। ২০০২ সাল থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির নেতাদের সঙ্গে পরিচয় তার। তাদের পরামর্শেই ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কারাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন তিনি। এরপর জেএমবির অন্যতম শীর্ষ নেতা মাওলানা হাকিম তাকে জঙ্গিদের কারাতে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

২০১৫ সাল থেকে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের অন্যতম সমন্বয়ক ও শীর্ষ প্রশিক্ষক হয়ে ওঠেন লিটন। এর মধ্যেই ২০১৬ সালে ১লা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানের নৃশংস হামলাসহ একাধিক নাশকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

পড়ুন: র‍্যাবের আটক দুজনকে অনেক আগেই তুলে আনা হয়েছিল?

গুলশান হামলার পর পুলিশের নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযানে একের পর এক গ্রেপ্তার হতে থাকেন জঙ্গিরা। গ্রেপ্তার জেএমবি সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লিটনকে খুঁজতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১৬ই নভেম্বর রাজধানীর আদাবর এলাকার একটি ক্যাফেতে বৈঠকরত অবস্থায় অস্ত্র-গুলি ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ তাকে আটক করে পুলিশ।

পড়ুন: পাঁচ জঙ্গি গ্রেপ্তার, থানায় হামলার পরিকল্পনা ছিল!

পড়ুন: প্রকৌশলী থেকে যেভাবে জঙ্গি হলেন সালাম

শেখ মোহাম্মদ সেলিম নামের এক মালয়েশিয়া প্রবাসীর ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে এই নরঘাতক ও জঙ্গি লিটনকে নিয়ে কী নাটকটাই না করলো জামায়াতের পেইড এজেন্ট তাসনিম খলিল! সেলিমের সঙ্গে জঙ্গিবাদের সম্পর্কও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে সেলিমের নাটকীয় তথ্যসূত্র ধরে ঘুরে আসা যাক আন্তর্জাতিক জঙ্গি তেহজীব প্রসঙ্গ থেকে।

লিটনের মাকে খুঁজতে গিয়ে বের হলো আন্তর্জাতিক জঙ্গি তেহজীব করিমের ইতিহাস:

শেখ মোহাম্মদ আবু সালেহ ওরফে লিটনের বরাতে শেখ মোহাম্মদ সেলিম হোসেন দাবি করলেন, কারাতের ইভেন্টে অংশ নিতে নাকি লিটনের অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার কথা ছিল! অথচ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, অলিম্পিকের কারাতে ইভেন্টে বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন না।

এছাড়াও সেলিম আরো দাবি করেন, বাথরুমে অঙ্কিত নাম্বারে ফোন করে তিনি সেলিমের মায়ের সাথে কথা বলেন। কিন্তু সেই নাম্বারটি আসলে কার- তা সংবাদ প্রতিবেদনের নামে পরিবেশিত দুর্বল স্ক্রিপ্টের আয়নাবাজি থ্রিলার থেকেই জানা গেছে। নাটকীয়ভাবে যে ফোন নাম্বারের ডিজিট উচ্চারণ করে লিটনের মায়ের বলে দাবি করলেন সেলিম, তার সাথে লিটনের কোনো সম্পর্কই নেই। প্রকৃতপক্ষে নম্বরটি জঙ্গি তেহজীব করিমের মায়ের। আর এই তেহজীব করিম কে, জানেন কী?

পড়ুন: এক প্রতিষ্ঠানেই জঙ্গি ২৬ শিক্ষক-কর্মকর্তা

পড়ুন: লেকহেড স্কুলের যত জঙ্গি কানেকশন

২০১৬ সালে সংঘটিত দুটো নারকীয় হামলার সমন্বয়ক তেহজীব। ১লা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে এবং ৭ই জুলাই দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাত শোলাকিয়ায় গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত তেহজীব করিম। ২০১০ সালে ইয়েমেনের জঙ্গি নেতা আনওয়ার-আল-আওলাকির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি।

তবে সেখানকার আল-কায়েদা বিরোধী সরকারি অভিযানে ধরা পড়ে সেখানেই ১০ মাস জেল খাটেন তেহজীব। সেসময় রাজধানীর লেকহেড গ্রামার স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তেহজীব। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিমের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হয়ে ওঠেন প্রশিক্ষিত জঙ্গি তেহজীব।

পড়ুন: লেকহেড স্কুলের সাবেক শিক্ষকসহ ২ জন রিমান্ডে

পড়ুন: লেকহেড স্কুলের সঙ্গে জঙ্গির যোগসূত্র পুরোনো

জঙ্গি তেহজীবের ভাই রাজীব করিমও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত। ২০১১ সালে একটি বিমানে জঙ্গি হামলার অপচেষ্টার দায়ে ব্রিটেনে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটছেন তিনি। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে জানান, এই দুই ভাই আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তেহজীবের শ্বশুরও জঙ্গিদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান আইসিইউডি-এর সংগঠক।

পড়ুন: বিমানবন্দর থেকে নিখোঁজ জঙ্গি তেহজিব করিমই কি আজিমপুরে নিহত?

চতুর এই জঙ্গি সংগঠক ২০১৬ সালে আজিমপুরে পুলিশের অভিযানে নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১৭ই মে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এমন এক কুখ্যাত জঙ্গির মায়ের ফোন নাম্বার আবিস্কারের মধ্য দিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন দেশদ্রোহী তাসনিম খলিল?

জঙ্গিদের সাথে প্রবাসী সেলিমের সম্পর্ক:

প্রবাসী আবু সালেহ ওরফে সেলিম, সংবাদ প্রতিবেদনের নামে জামায়াতের মুখপাত্র তাসনিম খলিল যাকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন তার টেলিফিল্মে, পুলিশের হাতে আটক জঙ্গি তেহজীবের মায়ের নাম্বার সেই সেলিম পেলেন কীভাবে?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় থাকতেন সেলিম। এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০১৬ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে চূড়ান্ত আঘাত হানার পরিকল্পনা করেন জঙ্গিরা। এসময় জঙ্গি তেহজীব এবং সংগঠনের নেতাদের নির্দেশে দেশে ফেরেন সেলিম।

কিন্তু যুদ্ধপরাধীদের পরিবার এবং দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে গোয়েন্দা পুলিশের জালে ধরা পড়েন তিনি। পরবর্তীতে ছাড়া পেয়ে আবারো মালয়েশিয়ায় চলে যান সেলিম। কিন্তু দেশে থাকা অবস্থায় যেসব নির্দেশনা পান তিনি, তা বাস্তবায়নে নতুন মিশন শুরু করেন এবার।

সেই সূত্রেই জামায়াতের পেইড এজেন্ট তাসনিম খলিলদের সঙ্গে তার গড়ে ওঠে সখ্য। এরপর জঙ্গি ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে জনমত গড়তে কৌশলে এক অভিনব আয়নাবাজির আশ্রয় নেন তারা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নামে তথ্যহীন কিন্তু চটকদার এক ভেলকিবাজি থ্রিলার নির্মাণ করেন তারা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গবাদিমার্কা দর্শকদের ভিউ থেকে ডলার উপার্জন করা।

সেলিমের নাটকীয় বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে দৃশ্যে আসা হাসিনুর আসলে কে:

প্রবাসী সেলিমের বক্তব্যকে সমর্থন জানাতে সিনেম্যাটিক পোশাকে সজ্জিত হয়ে এক রহস্যমানবরূপে দৃশ্যে আবির্ভূত হন হাসিনুর রহমান। নিজেকে দাবি করেন বরখাস্তকৃত সেনা কর্মকর্তা এবং বীরপ্রতীক হিসেবে। তারপর সেনানিবাসকে সুপরিচিত অঙ্গন বলে বিভিন্ন কথা বলতে শুরু করেন তিনি। অথচ গুগলম্যাপের মাধ্যমেই এসব স্থাপনার কথা যে কেউ জানতে পারেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই হাসিনুর আসলেই দশম বিএমএ-এর একজন পদচ্যুত সেনা কর্মকর্তা। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক ছিলেন তিনি। সেসময় তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য ফাঁস হয়। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় কোর্ট মার্শাল হয়, বিচারের পর চাকরিচ্যুত হয়ে কয়েক বছরের জন্য সাজাও খাটেন তিনি।

পড়ুন: র‍্যাবের সাবেক অধিনায়ক হাসিনুরকে ‘তুলে’ নেওয়ার অভিযোগ

মূলত, উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের কারণে ২০০৯ সালের ২২শে অক্টোবর হিযুবত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এসময় আটক করা হয় সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-এর শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদকে। তার স্বীকারোক্তি থেকেই ফাঁস হয় র‌্যাব-৭ এর তৎকালীন অধিনায়ক হাসিনুরের নাম।

এরপর বিস্তারিত তদন্তে জানা যায়, ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বোমা হামলা এবং ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত জঙ্গি মাওলানা ইয়াহিয়ার সাথে দীর্ঘদিন ধরেই গোপন সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন হাসিনুর। ২০১১ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেন নিষিদ্ধ হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মাওলানা ইয়াহিয়া।

পড়ুন: কে এই হাসিনুর রহমান?

পড়ুন: হুজি নেতার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

পড়ুন: নিখোঁজের দেড় বছর পর বাড়ি ফিরলেন র‌্যাব অধিনায়ক হাসিনুর

এছাড়াও পার্বত্য চুক্তিবিরোধী একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং অপরাধ দমনে বিভিন্ন সেনা অভিযানের খবর ফাঁস করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগেও অভিযুক্ত ছিলেন এই কর্মকর্তা। ২০১৪ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পরেও নিয়মিত জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে গোপনে যোগাযোগ করা এবং অনলাইনে উস্কানি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পড়ুন: নিখোঁজের দেড় বছর পর বাসায় চাকরিচ্যুত র‌্যাব কর্মকর্তা ডিউক

এবার দেখা যাক তাসনিম খলিলের অতীত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১১ই মে আটক হন তাসনিম খলিল। বিদেশী সংস্থার হয়ে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদীদের মদত দেওয়ার অভিযোগ ছিল খলিলের বিরুদ্ধেও।

সময়গুলো মিলিয়ে ফেলুন। দুইয়ে-দুইয়ে চার মিলে যায় খুব সহজেই। দেশদ্রোহী হাসিনুরের সঙ্গে তাসনিম খলিলের প্রকাশ্যে পর্দায় আসা সময়ের ব্যাপার ছিল। বক্তব্যের শুরুতেই নিজেকে বীরপ্রতীক পরিচয় দিয়ে যে ট্যুইস্টটা দিলেন হাসিনুর, তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। দর্শকদের সাইকোলজি নিজের পক্ষে নেওয়ার যেসব কৌশল রয়েছে, তারমধ্যে এটি অন্যতম।

তাসনিম খলিলের ভেলকিবাজি:

সরলপ্রাণ সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে ধর্মব্যবসায়ীরা যেভাবে ট্যুইস্ট করেন, ঠিক সেভাবেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও একটা ট্যুইস্টের কৌশল হয়েছে এই থ্রিলারে। বীরপ্রতীক শব্দটি দর্শক সাইকোলজিকে প্রভাবিত করার অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে।

থ্রিলারের এক পর্যায়ে, হুট করেই আলখেল্লা পরিহিত বৈচিত্রময় সাজে সজ্জিত হয়ে পদচ্যুত কর্মকর্তা হাসিনুর পর্দায় আসেন। তার উপস্থিতির সিনেম্যাটিক ধরণ দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নেয়। এরপরই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দর্শকের মনস্তত্বকে নাড়া দেওয়ার কৌশল হিসেবে বীরপ্রতীক শব্দটিকে ব্যবহার করেন তিনি।

কিন্তু অনুসন্ধান বলছে, ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএমএ-এর দশম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা হাসিনুর। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছেন তিনি, বাস্তবতা হলো, তিনি প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযোদ্ধাই নন। বরং জঙ্গিবাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন সবসময়!

সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে তাসনিম খলিলের পার্টনার ডেভিড বার্গম্যান এর আগেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিপক্ষে নিয়মিত লিখেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বসূচক খেতাব নিয়ে এই নোংরা খেলায় মেতেছেন তাসনিম খলিল।

এর আগে মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণের মতো জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত নেতা মীর কাশিম আলীর ফাঁসি ঠেকাতে ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল রাজাকার কাশিমের পরিবার। বাংলাদেশের সরকারকে চাপ দেওয়ার জন্য সেই অর্থ আন্তর্জাতিক মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছিল ড. কামালের জামাতা ডেভিড বার্গম্যানের মাধ্যমে।

সেই সূত্রে এখন রাজাকার মীর কাশিম ও রাজাকার প্রধান গোলাম আযমের ছেলেকে নিয়েও নতুন ট্যুইস্ট সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হয়েছে এখানে। বিএনপি-জামায়াতের টাকা খেয়ে আল-জাজিরাতেও এমন একটি নাটক সম্প্রচার করে ব্যর্থ হয় তারা। এ কারণে এবার মার্কিন গোয়েন্দাদের অর্থায়নে পরিচালিত নেত্র নিউজের মাধ্যমে নতুন নাটক সম্প্রচার হলো।

জামায়াত-বিএনপির পেইড এজেন্ট তাসনিম খলিল শুরুতেই একটা নোংরা বক্তব্য সম্প্রচার করে দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার নির্দেশনায় হিন্দিতে কথা বলতে বলার প্রসঙ্গ তুলে সুকৌশলে দ্রুত অন্য বর্ণনায় চলে যান নাটকের অন্যতম চরিত্র সেলিম। আটক ইস্যুতে হুট করেই হিন্দি শব্দ এলো কেন?

কারণ, জামায়াতের পুরনো কৌশল এটি। মানুষের মনে ভারত-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে হঠকারিতা ঘটানোর পাঁয়তারা। ঠিক সেই কাজটিই সজ্ঞানে করা হয়েছে এখানে। এরপরেও কি কারো বুঝতে বাকি থাকে যে, এই থ্রিলারের চিত্রনাট্য কাদের ডিমান্ড অনুসারে সাজানো হয়েছে? যদি একটু সচেতন হন, তাহলে সবাই সহজেই বুঝবেন।

শুরুতে আকারে-ইঙ্গিতে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ভারত-বিদ্বেষ, এরপর শেষাংশেও অপ্রাসঙ্গিকভাবে কথার মাঝে আজান শোনানোর মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের ভাবাবেগে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। থ্রিলারের শেষাংশে সেলিমের কথার মাঝে চালিয়ে দেওয়া হলো আজানের কয়েক সেকেন্ড।

অথচ আশপাশে কোথাও আজান শুরু হলে তার শব্দ বক্তব্যের পুরো সময় ধরেই চলার কথা। নাটকটি দেখার পর নিশ্চই বুঝতে পারছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আযানের কয়েক সেকেন্ড চালিয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগের নামে অতি কৌশলে জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন নির্মাতা তাসনিম খলিল।

এছাড়াও দেশদ্রোহী তাসনিম খলিল বিভিন্ন সময় দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন কুৎসা রটনা করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই থ্রিলারেও বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর প্রতীক, সেনানিবাসের গুগল ম্যাপ, সেনা সদস্যদের ছবি ব্যবহার করে চটক সৃষ্টি করেছেন। গুগলম্যাপের ছবি চাইলে যে কেউ নিতে পারেন।

যে কেউ ইন্টারনেটে ঢুকেই যেকোনো স্থানের গুগল ছবি সংগ্রহ করতে পারেন। একে কি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলে? নাকি এসব ভিডিও তারা আসলে শুধু তাদের জন্যই তৈরি করেন, যারা আসলে সাংবাদিকতা কী তা জানেন না? হ্যাঁ, খলিলদের টার্গেট অডিয়েন্স আলাদা। তাসনিম খলিলরা সাংবাদিকতার নামে মানুষের সাথে যা করছেন তা আসলে ভাঁওতাবাজি।

পুরো থ্রিলার জুড়ে জঙ্গিদের খুনোখুনি ও রক্তপাতের ইতিহাস চেপে গিয়ে উল্টো তাদেরকে আন্তর্জাতিকমানের স্পোর্টসম্যান হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা করা হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত এই জঙ্গিরা শুধু দেশেই হলি আর্টিজান, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেননি, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করেছেন।

এদেশের সাধারণ মানুষদের রক্তে রঞ্জিত যে জঙ্গিদের হাত, কেন তাদেরকে নিষ্পাপ ফেরেশতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন তাসনিম খলিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সবাইকে আরেকটু চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।

তাসনিম খলিল তার এই প্রোপাগান্ডা থ্রিলার বাজারে ছাড়ার পরপরই মাঠে নেমেছে বিএনপি-জামায়াত জোট এবং নুরু গংরা। ১৬ই আগস্ট এই থ্রিলারের পক্ষে মাঠ গরমের চেষ্টা করলেন বিএনপি মহাসচিব- রাজাকারপুত্র মির্জা ফখরুল। ১৮ই আগস্ট এই বিষয়টি উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করলেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের লাশ ফেলে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বুঁদ মান্না।

এরই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে অস্থির করার অপচেষ্টা করলেন নুরু গংরা। এ যেন আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখা একের পর এক দৃশ্যের মঞ্চায়ন। এখনো কি বুঝতে বাকি থাকে যে, কাদের অর্থে নির্মিত হয়েছে এই প্রোপাগান্ডা ভিডিও থ্রিলারটা।

পড়ুন: উত্থান চেষ্টার নেপথ্যে ॥ জামায়াতী ঘরানার লোকদের মদদ

জামায়াত-বিএনপি জোট আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে সীমাহীন নৈরাজ্য চালানোর পরিকল্পনা করছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করার মিশনে নেমেছে তারা। যেন আগামী নির্বাচনের আগে ২০১৪ সালের মতো পেট্টোল বোমা ও আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে মানুষ খুন করে দেশে অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে, কেউ যেন তাদের বাধা দিতে না পারে।

এমনকি সরকারবিরোধী প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করার কোটি ডলারের মিশন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এই দুর্বৃত্ত চক্রটি। এর আগেও তাদের একাধিক অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। মানুষ সচেতন হলে ভবিষ্যতেও তাদের অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে এদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।