রাষ্ট্রীয় মদদে জঙ্গীবাদের চাষাবাদ এবং লালন-পালন করত বিএনপি

0

সময় এখন:

কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ও সর্বাত্মক সহযোগিতায় সেই দেশের সর্বত্র নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে বোমা হামলা করে একটা উগ্র ধর্মান্ধ মতাদর্শী জঙ্গীগোষ্ঠীর দেশ দখলের নীলনকশার (অ)শুভ উদ্বোধন পৃথিবীর আর কোথাও কোনো দেশে হয়নি। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত সরকার এই বাংলাদেশে সেই সুযোগ করে দিয়েছিল।

এমন রাজসিক ভঙ্গিতে সারাদেশে যখন ধর্মান্ধ নরপিশাচরা সাধারণ মানুষদের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে তাদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছিল, তখন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে শুরু করে জনগণের জানমাল নিরাপদ রাখার শপথ নিয়ে সার্ভিসে ঢোকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এই জঙ্গীদের রক্ষক ও প্রতিপালক।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইতিহাসে এটি ছিল এক অচিন্ত্যনীয় কলঙ্কজনক অধ্যায়। এত জঘন্যভাবে আর কখনই তারা ব্যবহৃত হননি। কিছু উন্মত্ত ধর্মান্ধ ও প্রশিক্ষিত জঙ্গীরা রাস্তা দিয়ে মিছিল নিয়ে যাচ্ছে, শোডাউন করতে করতে তাদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে, আর পুলিশ তাদের পুরো পথটা অনুগত বডিগার্ডের মত সিকিউরিটি দিচ্ছে! এমন দৃশ্য শুধু একবার ভাবুন তো?

দুই প্রধান জঙ্গী নেতা- সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই এবং শায়খ আবদূর রহমান সভা করছে মাথার ওপর ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) ছবি টাঙিয়ে। ঠিক অতটাই আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সমর্থন ছিল জঙ্গি সংগঠন- হরকাতুল জিহাদ ও জামায়াতুল মুজাহিদিনের ওপর বিএনপি সরকারের। অতটাই আপন ছিল তারা। সেই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের সাথে গলায় গলায় পিরিত ছিল বাংলা ভাইয়ের। ‘মামা’ সম্বোধন করে ফোনালাপ করতেন তারা।

পাকিস্থানের গোয়েন্দা সংস্থা- আইএসআই’র অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষক প্রেরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে গড়ে তোলা হয়েছিল এসব জঙ্গি সংগঠন। যার মূল হোতা ছিলেন তারেক রহমান। খালেদা জিয়া সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং তার অধীনস্ত সরকারি শীর্ষ দুটি গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকতা- যারা বিএনপি সরকারের একান্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত; তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এসব জঙ্গি সংগঠন প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা এবং কর্মকর্তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলো এসব জঙ্গি সংগঠন। বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন মন্ত্রী-সাংসদের রাজনৈতিক খেলার সঙ্গী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা। বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্থানের সাথে একীভূত করা এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের অভ্যন্তরে জঙ্গি হামলা ঘটানোই ছিল জঙ্গিদের লক্ষ্য। বাংলাদেশের প্রগতিশীল মতাদর্শে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকিস্থানের ভাবাদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য তারা দেশজুড়ে চালিয়েছিল তাণ্ডব। আর সেই জঙ্গিমাতা খালেদা জিয়া বারবার বলেছেন- বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি!

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)।

সেসময় দেশের ৫০০ স্পটে এ সিরিজ বোমা হামলায় দু’জন নিহত এবং অন্তত ১০৪ জন আহত হন। নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতেই সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়েছিল জেএমবি। আজ বুধবার (১৭ আগস্ট) সেই সিরিজ বোমা হামলার ১৭ বছর পূর্ণ হলো। সিরিজ বোমা হামলার ওই ঘটনার পর দেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে এ ঘটনার ১৭ বছরে সব কটি মামলার প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ১৫৯টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৮টি, সিএমপিতে ৮টি, আরএমপিতে ৪টি, কেএমপিতে ৩, বিএমপিতে ১২, এসএমপিতে ১০, ঢাকা রেঞ্জে ২৩, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১, রাজশাহী রেঞ্জে ৭, খুলনা রেঞ্জে ২৩, বরিশাল রেঞ্জে ৭, সিলেট রেঞ্জে ১৬, রংপুর রেঞ্জে ৮, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬ ও রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়।

২০০৫ সাল থেকে চলতি বছরের (২০২২) ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত এসব মামলার মধ্যে ১৪৩টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়। বাকি ১৬টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করতে না পারায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। মামলাগুলোতে ১৩০ জন এজাহারনামীয় আসামি ছিলেন। বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে মোট ৯৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছিল ১ হাজার ১৩১ জনকে। অভিযোগপত্রের আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ১ হাজার ২৩ জনকে। আসামিদের মধ্যে ৩২২ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। ১৫ জনের ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। এসব মামলায় খালাস পেয়েছেন ৩৪৯ জন আর জামিনে আছেন ১৩৩ জন।

মামলার তদন্তে যা উঠে এসেছে:

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সিরিজ বোমা হামলার পর পরই জঙ্গিদের ধরতে সারাদেশে জেমবি বিরোধী অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযান গ্রেপ্তার করা হয় জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম (বাংলা ভাই), আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহসহ সাড়ে ৪শ’ জঙ্গিকে। ঝালকাঠিতে বোমা হামলায় দু’বিচারককে হত্যা মামলায় ২০০৭ সালে ফাঁসি কার্যকর করা হয় জেএমবির শীর্ষ এ নেতাদের।

জেএমবির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পরে সংগঠনটির আমির হন মাওলানা সাঈদুর রহমান। দ্বিতীয় দফা পুনর্গঠিত হতে থাকে জেএমবি। তবে তিনিও বেশি দিনে গ্রেপ্তার এড়িয়ে থাকতে পারেননি। ২০১০ সালের ২৫শে মে ঢাকা থেকে তাকেও গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, সাঈদুর রহমান গ্রেপ্তারের ৪ বছর পর ২০১৪ সালে আবারও জোরালোভাবে নিজেদের শক্তি জানান দেয় জেএমবি। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে জঙ্গি ছিনতাই করে তারা। এ সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি (৩৮), রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ (৩৫) এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে (৩৫) ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

জেএমবির আদ্যপান্ত:

১৯৮৮ সালে শায়খ আবদুর রহমান জেএমবি প্রতিষ্ঠা করলেও প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পর ১৯৯৮ সালে সংগঠনটি দেশব্যাপী তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তবে দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু হয় ২০০৩ সালের প্রথমদিকে। পরে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা ও ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারককে হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে এ জঙ্গি সংগঠনটি।

এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর জেএমবির শুরা কমিটির প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান, অপারেশন কমান্ডার আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহসহ শীর্ষ ৬ জনের ফাঁসি ২০০৭ সালের ৩০শে মার্চ কার্যকর হওয়ার পর আত্মগোপনে যায় সংগঠনের অন্য নেতা-কর্মীরা।

মতাদর্শগত পার্থক্য ও নেতৃত্ব সংকটের কারণে ২০১৫ সালে জেএমবি থেকে একটি বড় অংশ বেরিয়ে গিয়ে নব্য জেএমবি নামে নতুন সংগঠন তৈরি করে। জেএমবি সংগঠনটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পুরাতন জেএমবি ও নব্য জেএমবি। পুরাতন জেএমবি ছোটখাট নাশকতা করে সংগঠনটি সচল রাখতে চাইলেও নব্য জেএমবি চুপচাপ তাদের সাংগঠনিক ও আর্থিক শক্তি বাড়ানোর কাজ করতে থাকে। যার প্রতিফলন ঘটে ২০১৬ সালের ১লা জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়ে।

হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা করে দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যা করা হয়। এর ঠিক সপ্তাহখানেক পর ৭ই জুলাই শোলাকিয়ার ঈদগাহে আরও একটি হামলা চালায় নব্য জেএমবি। এসব হামলার দায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করলেও একে ‘নব্য জেএমবি’ বা জেএমবির বিদ্রোহীর অংশগ্রহণ বলে বলছেন বাংলাদেশি গোয়েন্দারা।

এ দু’জঙ্গি হামলার পর অনেকটা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা জঙ্গি আস্তানার সন্ধান করতে থাকে এবং নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতাদের খোঁজে অভিযান পরিচালনা করতে থাকে পুলিশের কাউন্টার টোরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

এরপর রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ধরতে অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের তৎপরতার মুখে নব্য জেএমবি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। শীর্ষ জঙ্গিদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন। অনেকে আবার ধরা পড়েছেন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।