‘রাতের ভোট’ নামক প্রমাণহীন এক আজগুবি তত্ত্বের আবিষ্কার হয়েছিল যেভাবে

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

পল জোসেফ গোয়েবলস ছিলেন জার্মানির কুখ্যাত নাৎসি পার্টির একজন শীর্ষ নেতা। দলের প্রধান অপপ্রচারকারী (Chief propagandist) হিসেবে অফিসিয়ালি দায়িত্ব পালন করেন। সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে পরবর্তীতে হিটলারের প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী হিসেবে ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্বরত ছিলেন।

গোয়েবলস বলতেন, একটি মিথ্যা দশবার প্রচার চালালে লোকে তা সত্য বলে মেনে নিতে শুরু করে। হিটলার এবং তার অনুসারীদের পতন ঘটলেও গোয়েবলসীয় ফর্মূলা টিকে আছে এখনও।

১৯৭৫-এ ইতিহাসের ভয়াবহতম নৃশংসতার পরবর্তী সুফলভোগীদের সমন্বয়ে ক্যান্টনমেন্টে গড়ে ওঠা দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্থানে সেনা কলেজে পড়াশোনার সময় সেই গোয়েবলসীয় থিওরি আত্মস্থ করেন। যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে পুরোপুরি কাজে লাগান।

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, বঙ্গবন্ধুর নাম, তাঁর ভাষণের কপি পর্যন্ত মুছে ফেলার সকল যোগাড়যন্ত্র করেছিলেন জিয়া। এমনকি কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস নেতাদেরকে পুনর্বাসন এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে মিথ্যা ইতিহাস গেলান কয়েকটি প্রজন্মকে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইতে বাংলাদেশের ওপর নিপীড়ন চালানো গোষ্ঠীকে ‘হানাদার’ বলে উল্লেখ করা হতো। পাকিস্থানের নাম পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি, পাছে শিশু-কিশোররা পাকিস্থানের আসল চেহারা জেনে ফেলে, ঘৃণা করতে শুরু করে। ছিল না বঙ্গবন্ধুর নাম ও তাঁর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কিত কিছু।

পাকিস্থানপন্থীদের হাতে রচিত হয় বাংলাদেশের মিথ্যা ও ফাঁক-ফোকরযুক্ত ইতিহাস। এভাবে নাৎসী গোয়েবলসীয় ফর্মূলা বহাল তবিয়তে চালিয়ে গেছে বিএনপি। জিয়ার সেই শিক্ষা যথাযথভাবে কাজে লাগায় তার দলের নেতারা।

আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা, লাখো সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতনকারী বিএনপিকে নাৎসী বাহিনীর সাথে তুলনা করা যায়। জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়া হলেন হিটলারের ভূমিকায়, আর সেই বাহিনীর বর্তমান শীর্ষ প্রোপাগান্ডিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দলের দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমদে এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীররা।

তবে সাহিত্যের ভাষায় বেশ রসালো ভঙ্গিমায় গলাবাজিতে সক্ষম বলে বিএনপিতে বেশ কদর রয়েছে রিজভীর। নিজ বাড়িতে ঠাঁই নাই, দলীয় কার্যালয়ের একটি বিলাসবহুল কক্ষে বছরের পর বছর অবস্থানকারী ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এক আজগুবি তত্ত্ব বের করলেন তিনি।

সারাদিন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার পর রিজভী যখন বুঝলেন বিএনপির ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখনই লন্ডন থেকে নাজিল হওয়া ‘ওহি’ (ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষায়) অনুযায়ী লিখিত বক্তব্য নিয়ে হাজির হলেন মিডিয়ার সামনে। দাবি করলেন- ভোট নাকি আগেরদিন ‘রাতে’ করে ফেলেছে আওয়ামী লীগ! তার এমন বক্তব্যে সারাদেশ স্তম্ভিত!

রাতেই যদি ভোট হয়ে যায়, তবে রাতভর মিডিয়ার সামনে সেই তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরলো না কেন বিএনপি? দিনভর ভোটে অংশগ্রহণ করার পর কেন হঠাৎ সন্ধ্যায় রিজভীর সেই কথা মনে পড়লো? বাংলা সিনেমার স্মৃতিভ্রষ্ট নায়িকা যেভাবে দেয়ালে মাথা ঠুকে হারানো স্মৃতি ফিরে পায়, রিজভীও কি তবে বিএনপি কার্যালয়ের সিঁড়ির চিপায় দেয়ালে আঘাত পেয়ে হুঁশ ফিরে পেয়েছিলেন?

এটা কিন্তু মোটেই Funny কিছু নয়, অত্যন্ত সিরিয়াস ইস্যু। বিএনপির মন্ত্রী এম মোর্শেদ খানের মালিকানাধীন ‘সিটিসেল’ এর মনোপলি যুগ পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ বহুকাল আগেই। দেশে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল অন্তত ১২ কোটিরও বেশি। আর ইন্টারনেট সুবিধাপ্রাপ্তের সংখ্যাও ৯ কোটির ওপর ছিল।

শুধু তা-ই নয়, বিএনপির দাবি, তাদের এই দলটি উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয়, যার কর্মীর সংখ্যা কোটি কোটি! তাই তর্কের খাতিরে বিএনপির ‘রাতের ভোট’ তত্ত্ব মেনে নিলে দেশের ন্যূনতম একটি ভোটকেন্দ্রেও রাতে ভোট হচ্ছে- এমন কোনো ঘটনারও স্থিরচিত্র বা ভিডিও বিএনপি কেন দেখাতে পারেনি আজ পর্যন্ত? তাদের কোটি কোটি কর্মী কি ঘাস কেটেছিল?

রিজভী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা কেন্দ্র দখল করে সব ব্যালটে সিল মেরে রেখেছে। বিএনপি যদি নিশ্চিত হয়, তবে সিল মারার কোনো ছবি/ভিডিও পাওয়া যায় না কেন? এমন প্রশ্নের কিন্তু কোনো উত্তর নেই।

শুধু তা-ই নয়, বিএনপি-জামায়াতপন্থী শতাধিক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালের ভ্রাম্যমান সাংবাদিক ছড়িয়ে আছে দেশজুড়ে, তারাও পর্যন্ত রুহুল কবির রিজভীর এই আজগুবি তত্ত্বের পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

শুধুমাত্র নাটকীয় কথাবার্তা বলে রাতারাতি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অতি প্রচারের কারণে জনপ্রিয়তা পায় এই রূপকথার গপ্পোটি। তবে কেউ এমন ঘটনার কোনো চাক্ষুস সাক্ষীর বয়ান কিংবা ক্যামেরায় ধারণকৃত তথ্য-প্রমাণ চাইলে তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। গোয়েবলসীয় অপপ্রচারের পক্ষে কোনো সলিড তথ্য-প্রমাণ থাকে না।

হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে এবং ‘১০ হুন্ডা ২০ গুন্ডা ভোট ঠান্ডা’ নীতিতে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া বিএনপি পরাজয় বুঝতে পেরে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস চালায়। কিন্তু তারাও জানে, এসব গালভরা বুলি দলের লোকজন বিশ্বাস করলেও অন্য কোথাও ধোপে টিকবে না।

তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা নির্বাচন কমিশনের কাজ করার সাংবাদিকদের সংগঠন আরএফইডি আয়োজিত ‘আরএফইডি-টক’ অুনষ্ঠানে বলেছিলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘রাতের ভোট’-এর যে কথা শোনা যায়, তা কেবলই একটা মৌখিক অভিযোগ।

ভোটের দিন বা আগে-পরে নির্বাচন কমিশনে কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ করেননি। এমনকি নির্বাচনের পরও সংক্ষুব্ধ প্রার্থীর আদালতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। তবু কেউ আদালতের শরণাপন্ন হননি। এ থেকে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি অভিযোগ, যার কোনো সত্যতা নেই।

সিইসি বলেন, ‘দিনের ভোট রাতে হয়’ অনেকভাবেই এ কথাটি বলা হয়। নির্বাচনের সময় যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বা কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটে, প্রার্থীর পক্ষ থেকে এসবের তথ্য-উপাত্ত আমাদের কাছে দিতে হয়। সে তথ্য-উপাত্ত আমরা পাই গণমাধ্যম এবং রিটার্নিং অফিসারদের কাছ থেকেও। নির্বাচনের দিন আমরা সারাদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে বসা ছিলাম, তথ্য-উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আমরা দেখেছি কোথাও কোনো অসুবিধা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ইসি চলে আইনের মাধ্যমে, যখন আমাদের কানে কোনো অভিযোগ আসে, তখন আমরা সেটার তদন্ত করি, সে হিসেবে পদক্ষেপ নিই। কোনো প্রিসাইডিং অফিসার যদি আমাদের কাছের তাৎক্ষণিক জানায় সমস্যা হচ্ছে বা আমরা যদি কোথাও থেকে খবর পাই যে অনিয়ম হচ্ছে, তাহলে আমরাও নির্বাচন বন্ধ করতে পারি।

কিন্তু এ রকম কোনো অভিযোগ আমরা নির্বাচনের সময় পাইনি। আইন অনুযায়ী কোনো নির্বাচনের ফল যখন রিটার্নিং অফিসার আমাদের কাছে জমা দেন, তখন আমরা সেটার গেজেট প্রকাশ করি। সেটা না মানলে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেবেন।

এ ছাড়া গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যেই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। এর বাইরে তখন আর নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার থাকে না। কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচনে একজন ব্যক্তিও নির্বাচন কমিশনে কিংবা আদালতে এ বিষয়ে অভিযোগ করেননি, কোনো প্রতিকার চাননি।

তাই থিউরিটিক্যাল আমাদের বিশ্বাস করতে হয়, ওই নির্বাচনে কারও কোনো অভিযোগ ছিল না। অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। আমি তো দেখিনি, আপনি তো দেখেননি, কেউ দেখেছে, রাতে হয়েছে, কেউ প্রমাণ দিয়েছে? কেউ অভিযোগ করেনি, তাই এই অভিযোগের সত্যতা নেই।

নূরুল হুদা বলেন, যদি কেউ অভিযোগ করত, আদালত যদি নির্দেশ দিত, তদন্ত হতো, হয়তো কিছু বেরিয়ে আসত, বেরিয়ে এলে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেত। হয়তো সারাদেশে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেত বা কিছু এলাকায় নির্বাচন বন্ধ হতো। এটা কেন তখন কোনো রাজনৈতিক দল অভিযোগ করেনি, পদক্ষেপ নেয়নি তারাই ভালো জানে।

সিইসির যৌক্তিক বক্তব্যে এটা স্পষ্ট, বিএনপি কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারবে না জেনেই আদালতের দ্বারস্থ হয়নি। মৌখিক প্রোপাগান্ডার মাধ্যমেই এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার গোয়েবলসীয় ফর্মূলা বেছে নিয়েছে এই নব্য নাৎসী দল বিএনপি।

এখানে আরেকটা বিষয় যুক্ত করা যায়, ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ধূলিস্মাৎ করতে দিনে-দুপুরে ষড়যন্ত্রের আয়োজন করেছিল বিএনপি-জামায়াত। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ, বরকতউল্লাহ ভুলু, জয়নুল আবেদিন ফারুক প্রমুখ নেতাদের সহিংসতা ও নাশকতার নির্দেশবাহী ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল এ সময়।

এমনকি নোয়াখালীতে কেন্দ্র দখলের উদ্দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সশস্ত্র আক্রমণের ভিডিও পর্যন্ত দেখা গেছে।

তাই জাতির ওপর বিবেচনার ভার, বাংলাদেশের মানুষকে বারবার ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করলো কারা, ভেবে দেখুন। গণতন্ত্রের শত্রু নব্য নাৎসী বিএনপিকে প্রতিহত করা তাই জরুরি।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।