বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদাকে বিদেশ থেকে তুলে আনার সেই স্পেশাল মিশন

0

সময় এখন:

বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে যারা মূল ভূমিকা পালন করেছিল এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে যারা অংশ নিয়েছিল তাদের মধ্যে বজলুল হুদা একজন। এহেন ঘৃণ্য খুনিকে ১৯৯৮ সালে থাইল্যান্ড থেকে ফেরত আনে বাংলাদেশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেন মেজর নূর চৌধুরী ও মেজর বজলুল হুদা। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯৭৬ সালের ৮ই জুন বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত অপর খুনিদের মতো বজলুল হুদাকেও বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে নিয়োগ দেন।

শুরুতে বজলুল হুদাকে পাকিস্থানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তিনি বাংলাদেশের জাকার্তা ও কুয়েত সিটির মিশনেও কাজ করেছেন। পাকিস্থানে কর্মরত অবস্থায় বজলুল হুদার বিরুদ্ধে মিশনের কর্মচারীদের গায়ে হাত তোলার অভিযোগ ছিল।

লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধুর অন্যতম দুই খুনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদ ও কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান ১৯৮৭ সালের ৩রা আগস্ট ফ্রিডম পার্টি নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন।

পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির হয়ে মেহেরপুর-২ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন বজলুল হুদা। ১৯৯১ সালে এক জনসভায় বজলুল হুদা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে আমি নিজের হাতে গুলি করে হত্যা করেছি। কার সাধ্য আছে আমার বিচার করার? এ দেশে শেখ মুজিব হত্যার বিচার কোনোদিনই হবে না।’

অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ঢাকার দায়রা জজ আদালত ১৯৯৮ সালের ৮ই নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন। পরে ২০০৯ সালের ১৯শে নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট বজলুল হুদাসহ তাদের ১২ জনের ফাঁসি নিশ্চিত করে রায় দেন। ২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি তার ফাঁসি কার্যকর হয়।

তবে এই আত্মস্বীকৃত খুনিকে কীভাবে ব্যাংকক থেকে ফেরত আনা হলো সে গল্প এতদিন ছিল অজানা। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কখনোই এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে এ কাজে গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের।

কীভাবে ফেরত আনলেন? কারা তাকে সহায়তা করেছিল? থাই সরকারের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ বজায় রাখতেন? বজলুল হুদার পালানোর পথটাও বা বন্ধ করলেন কী করে— পুরো প্রক্রিয়াটা যেন এক ক্রাইম থ্রিলার মুভি। কিন্তু বাস্তবে এটা আরও বেশি রোমহর্ষক।

আকরামুল কাদের-এর বয়স এখন ৮০’র মতো। তবুও তার মনে আছে কীভাবে খুনিকে ফিরিয়ে আনা হয় দেশে।

দক্ষ নাবিকের মতো গোটা বিষয়টি পরিচালনা করেছিলেন তিনি। একদিকে থাই কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে ঢাকা। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গোপনীয়তা বজায় রেখেই সুচারুভাবে কাজটি করতে হয়েছে তাকে। এমনকি যেদিন বজলুল হুদাকে ফেরত আনা হয় সেদিনও হাতেগোণা কয়েকজন জানতেন বিষয়টি।

একনজরে আকরামুল কাদের

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই বজলুল হুদাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় সদ্য রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আকরামুল কাদেরকে।

শহীদ পরিবারের সন্তান আকরামুল কাদের ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট সার্ভিসে (সিএসএস) যোগ দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ১৯৭০ সালে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন।

আকরামুলের ৫ বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের মধ্যে ২ জন শহিদ হয়েছেন (এঁদের একজন বীর উত্তম)। আরেক ভাই আফসারুল কাদের চৌকস কূটনীতিক হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্থানে থাকা আকরামুল কাদের আফগানিস্তান হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আকরামুল কাদের একমাত্র কূটনীতিক, যিনি বঙ্গবন্ধুর তিন খুনিকে ফেরত আনার চেষ্টা করেছেন। প্রথম জন থাইল্যান্ডের বজলুল হুদা, দ্বিতীয় জন জিম্বাবুয়েতে আব্দুল আজিজ পাশা ও তৃতীয় জন যুক্তরাষ্ট্রের রাশেদ চৌধুরী।

ঘটনার শুরু:

১৯৭৫ সালের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করে সরকার। ওই সময় বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত অ্যাডভোকেট জুলমত আলি খানও ছিলেন।

জুলাইতে তাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন ওই সময়কার বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক অনুবিভাগের মহাপরিচালক আকরামুল কাদের। এটি ছিল রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার প্রথম নিয়োগ।

আকরামুল কাদের বলেন, ঘটনার শুরু হয় আমার নিয়োগের পরপরই। পরিষ্কার মনে আছে, নিয়োগের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিয়েছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে বজলুল হুদার প্রসঙ্গ আসে এবং তিনি আমাকে বলেন, বজলুল ব্যাংককের জেলে আছে। আপনি চেষ্টা করবেন তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার।

আমি ওনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে এটাই হবে আমার প্রথম কাজ।

ক্লিপটোম্যানিয়াক বজলুল হুদা:

থাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি আগেই শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পরে বেশি দেরি করেননি আকরামুল কাদের। স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ ঢাকা ত্যাগ করেন। নভেম্বরে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আকরামুল কাদের থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই ওই বছরের জুলাই থেকে বজলুল হুদা জেলে ছিল। বজলুল ছিল ক্লিপটোম্যানিয়াক (কারণে-অকারণে যারা চুরি করে)। শপ-লিফটিং তথা দোকান থেকে চুরির অভিযোগে থাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। থাই কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট দূতাবাসে পাঠিয়েছিল এনডোর্সমেন্টের জন্য।

ওই সময় কনস্যুলারের দায়িত্বে ছিলেন হানিফ ইকবাল (পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক হন)। হানিফ বুঝতে পেরেছিলেন তিনি একটি অত্যন্ত মূল্যবান বস্তু হাতে পেয়েছেন এবং তিনি তা ধরে রেখেছিলেন। কখনই তিনি পাসপোর্টটি থাই কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেননি।

ঢাকায় যখন বিষয়টি জানানো হয়, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। তাদেরকে জানায় বজলুল হুদা কে, কী করেছে এবং কেন তাকে বাংলাদেশে খোঁজা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে স্বীকৃতি পাওয়ার পর ১৯৭৫ সালে থাইল্যান্ডে দূতাবাস খোলে বাংলাদেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ দেশটিতে আকরামুল কাদেরের আগে দক্ষ কোনও কূটনীতিককে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়নি। এদিকে ৯০-এর দশকে থাইল্যান্ডে দ্রুত উন্নয়নও হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালে আর্থিক সংকটে পড়ে যায় দেশটি।

তিনি বলেন, এমন এক প্রেক্ষাপটেই আমি থাইল্যান্ড পৌঁছাই।

অভিজ্ঞ ও কৌশলী কূটনীতিক আকরামুল কাদের বুঝতে পেরেছিলেন দুই কর্তৃপক্ষের মধ্যে চিঠি চালাচালি করে বজলুল হুদাকে ফেরত আনা যাবে না। করতে হবে অন্য কিছু। রাষ্ট্রদূতের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই বিষয়ে যারা জড়িত তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করা ও যোগাযোগ রক্ষা করা।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল- বজলুল হুদা যেন জেল থেকে পালিয়ে না যায় সেটিও নিশ্চিত করা। কারণ ওই সময় থাইল্যান্ড থেকে অর্থের বিনিময়ে জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতো। এমনটা যেন না ঘটে সে জন্য সার্বক্ষণিক নজরদারিও চলতো।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রত্যার্পণ চুক্তি। যাতে বঙ্গবন্ধুর খুনিকে দ্রুত ফেরত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, এ তিন কৌশল মাথায় রেখে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করি।

হানিফ ইকবালের দায়িত্ব:

কনস্যুলার সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হানিফ ইকবাল প্রথম থেকেই বজলুল হুদার পাসপোর্টটি নিজের জিম্মায় রেখেছিলেন। একইসঙ্গে রাষ্ট্রদূত তাকে একটি বড় দায়িত্বও দেন।

ওই সময় অনেক বাঙালি থাইল্যান্ডের জেলে ছিল। তাদের দেখভাল ও ফেরত আনার জন্য জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করতে হতো হানিফ ইকবালকে। এর সুবাদে কারাকর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন।

বজলুল হুদা জেলখানায় কী করছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে সেসব খোঁজ হানিফ ইকবাল প্রতিদিনই পেতেন। ওই সময় অনেক বাঙালিকে দেশে ফেরত পাঠানো হতো এবং আশঙ্কা ছিল বজলুল হুদা কোনও একটি দলের সঙ্গে মিশে জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি বিশেষভাবে হানিফের প্রশংসা করতে চাই। কারণ কাজটি তিনি অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে করতে পেরেছিলেন। জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বেশ সুন্দর সম্পর্ক থাকাতেই এটি সম্ভব হয়েছে।

টু ম্যান আর্মি:

বজলুল হুদাকে ফেরত আনার কৌশল আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন রাষ্ট্রদূত। ওটা বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্ত টিমের দরকার ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে কাজটা মাত্র দুজন ব্যক্তি (রাষ্ট্রদূত ও হানিফ) সমাধা করেছিলেন।

ওই সময়ে সোহরাব হোসেন (পরে থাইল্যান্ড ও পাকিস্থানের রাষ্ট্রদূত) দূতাবাসে কর্মরত থাকলেও তাকে এ কাজে ব্যবহার করা হয়নি। অন্য কাউকে ঢাকা থেকে চেয়েও নেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, গোটা কাজটি থাইল্যান্ডে আমি ও হানিফ করেছি। পুরো বিষয়টি নির্ভর করেছিল ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর। আমি রাজনৈতিকভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম এবং হানিফ জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

শুধু তাই নয়, থাইল্যান্ডে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের কোনও কাগজের দরকার হলে সেটা দেওয়ার বিষয়টিও হানিফ করতেন। মামলা চলাকালে কোর্টেও উপস্থিত থাকতেন হানিফ ইকবাল।

আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান কৌঁসুলি ও বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আখন্দ একবার ব্যাংকক গিয়েছিলেন তাদের দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য।

আরও যারা:

বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত আনার কাজে বাংলাদেশ থেকে কাজ করেছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. নাসিম, আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, পররাষ্ট্রসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ও স্বরাষ্ট্র সচিব সুফিয়ুর রহমান।

এ কাজে রাষ্ট্রদূতকে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন থাইল্যান্ডের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুরিন পিতসুয়ান, ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার পিতাক দেবানন্দ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুটিকয়েক কর্মকর্তা। এছাড়াও একজন থাই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না, তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন পরবর্তীতে।

আকরামুল কাদের বলেন, গুটিকয়েক লোক বিষয়টি জানতো। আমি ঢাকায় ৪ জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। আর থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তারা আমাকে সাহায্য করেছিলেন। তাদের সহায়তা ছাড়া বজলুল হুদাকে ফেরত আনা সম্ভব ছিল না।

ব্যাংকক যাওয়ার আগে তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় বা যোগাযোগ কিছুই ছিল না। রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাদের সঙ্গে আমার চেনাজানা। প্রথম দিন থেকে মনখুলে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, সহায়তা চেয়েছি। আর নিয়মিতভাবে লেগে থেকেছি, যাতে বজলুল হুদাকে ফিরিয়ে আনা যায়।

সব মিলিয়ে পুরো পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমার দৃঢ়চেতা মনোভাব দেখে তারা অকাতরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের ওই সাহায্য কখনো কখনো নিজেদের সীমার বাইরেও ছিল। তারপরও তারা আমাকে সহায়তা করেছিলেন। তা না হলে কাজটি সম্ভব ছিল না।

থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কীভাবে বন্ধু তৈরি করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, থাইরা বেশ বন্ধুবৎসল। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলে এবং বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে তারা আজীবন বন্ধুই থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুরিন ও ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার পিতাক বেশ ভালো মানুষ ছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন বজলুল হুদা কেমন জঘন্য অপরাধ করেছে এবং কেন তাকে ফেরত পাঠানো উচিৎ।

ঢাকার সঙ্গে রসায়ন:

ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিব মোস্তাফিজুর রহমান ও স্বরাষ্ট্র সচিব সফিয়ুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন আকরামুল কাদের। যখনই কোনও কাগজপত্রের প্রয়োজন হতো ওই দুজনকে জানাতেন। রাষ্ট্রদূতের অনুরোধ তারা সবসময় রেখেছেন এবং দ্রুততম সময়ে থাইল্যান্ডে ডকুমেন্ট পাঠানো হতো।

পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত কাদের বলেন, তিনি আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি বুঝে যখন যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেনে নিয়েছেন। আমার ওপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল।

ব্যাংকক এয়ারপোর্টে ট্রানজিটকালে আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুর সঙ্গে দীর্ঘসময় বজলুল হুদার ফেরত আনার বিষয়ে আলোচনাও করেন তিনি।

থাই পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার অভিযোগে মামলা করার পর বিপদেই পড়ে যায় বজলুল হুদা। মামলার প্রথম পর্যায়ে সে দাবি করতে থাকে, যাকে খোঁজা হচ্ছে সেই ‘খুনি বজলুল হুদা’ অন্য ব্যক্তি। তার এ দাবি পরে মিথ্যা প্রমাণ হয়।

কোর্টে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধান যুক্তি ছিল, সামরিক ক্যুর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি। কয়েকজন বিপথগামী সামরিক অফিসার ট্যাংক রেজিমেন্টের সহায়তায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়াও তাঁর পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও অন্য ব্যক্তিরাও নিহত হন। পরে নভেম্বরে চার নেতাকেও হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ১৯৭৫ সালে ঢাকা থেকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। তখন ব্যাংককে ফারুক, রশিদরা স্বীকার করেছিল যে তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। বজলুল হুদাসহ অন্যরাও আত্মস্বীকৃত খুনি। এ কারণে এটি ক্যু নয়। আর তা প্রমাণের জন্য ঢাকায় যে কাগজপত্র পাঠানো হয়েছিল সেটি কোর্টে উপস্থাপন করা হয়। অবশেষে কোর্ট রায় দেন বজলুল হুদা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হত্যায় জড়িত।

এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে বজলুল হুদা। কিন্তু সেখানেও অপরাধ প্রমাণ হয় এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও কোর্টে তাকে শাস্তি দেওয়া হয়নি।

তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের বলেন, ঢাকা ১৯৯৮ সালের এই রায়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছিল। পরে বজলুল হুদা প্রধান বিচারপতির আদালতে আপিল করে। সেখানেও একই ফল আসে। আমরা মামলায় জিতে যাই এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিকে দেশে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে ফেরত আসেনি:

বজলুল হুদাকে ফেরত আনার জন্য প্রত্যর্পণ চুক্তিতে দ্রুত বাংলাদেশ সই করে এবং অনুসমর্থন করে। থাইল্যান্ড চুক্তিটি সই করলেও প্রক্রিয়াগত কারণে অনুসমর্থন করতে দেরি হচ্ছিল। কিন্তু অনুসমর্থন ছাড়া এ চুক্তির অধীনে কাউকে ফেরত পাঠানো সম্ভব ছিল না।

সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি অনেকে জানে না যে প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে বজলুল হুদাকে ফেরত পাঠানো হয়নি। কারণ, তাকে যখন ফেরত পাঠানো হয় তখনও চুক্তিটি কার্যকর হয়নি।

চূড়ান্ত চেষ্টা:

অনুসমর্থনে দেরি হওয়ায় খুনিকে ফেরত আনতে রাষ্ট্রদূত ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডেপুটি ফরেন মিনিস্টারকে তিনি রাজি করিয়ে ফেলেন খুনিকে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন জোগাড় করে দিতে।

এদিকে ওই সময় বজলুল হুদা নিজেকে স্টেটলেস তথা রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি দাবি করে বাংলাদেশে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানায়। খুনি এ বিষয়ে রাজার কাছে ক্ষমাও ভিক্ষা চায়।

আকরামুল কাদের বলেন, এ পর্যায়ে এসে আমার কাজ জটিল হয়ে পড়ে। কারণ, রাজার কাছ থেকে ক্ষমাভিক্ষা পেয়ে গেলে বজলুল হুদাকে দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হতো না।

জটিল কাজ:

বজলুল হুদার এই চালের বিপরীতে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করেন রাষ্ট্রদূত। আগেই থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডেপুটি ফরেন মিনিস্টারকে রাজি করিয়ে ফেলেছিলেন। এখন তাদের মাধ্যমে কেবিনেট থেকে অনুমোদন আদায় করার অনুরোধ করলে রাজি হন তারা। পরে অনুমোদনও দিয়ে দেয় ক্যাবিনেট।

এদিকে রাষ্ট্রদূতের চেষ্টা ছিল ক্ষমাভিক্ষার আবেদন রাজপ্রাসাদে পৌঁছার আগেই খুনিকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

রাষ্ট্রদূত বললেন, বজলুল হুদার বড় দুর্বলতা ছিল সরকারি সিস্টেমের বাইরে থেকে প্রভাব খাটানোর উপায় ছিল না। পুরোটা নির্ভর করছিল থাই সরকারের মনোভাবের ওপর। ওই ক্ষেত্রে আমি একটি জায়গা তৈরি করতে পেরেছিলাম। খুনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও সফল আমরাই হয়েছি।

বিভিন্ন মহলের চাপ:

ব্যাংককে বিএনপি ঘরানার একটি পক্ষ বজলুল হুদার বিষয়ে সোচ্চার ছিল এবং অবধারিতভাবে তারা আমাদের পরিকল্পনা ও কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এটি সরাসরি চাপ ছিল না। কিন্তু পরোক্ষভাবে আমাদের প্রভাবিত করেছিল, জানালেন আকরামুল কাদের।

ওই সময় বজলুল হুদাকে ফেরত পাঠানো হলে তার বোন ও আব্দুল আজিজ পাশার সহধর্মিণী আকরামুল কাদেরকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেয়।

আকরামুল কাদের বলেন, আমি যখন ২০০১ সালে দেশে ফেরত আসি তখন কিছুটা আতঙ্কে ছিলাম। বিশেষ করে র‌্যাব গঠনের পর। সব সময় বাসায় থাকতাম। আমার মনে আছে এ সংক্রান্ত কিছু কাগজ আমি পুড়িয়েও ফেলেছিলাম।

ফেরত আনার তোড়জোর:

খুনিকে দেশে ফেরত পাঠানোর কেবিনেট অনুমোদন পাওয়ার পর ঢাকায় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। বিমান বাহিনীর একটি রাশিয়ান আন্তোনভ-৩২ বিমান ব্যাংককে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ জন্য ইয়াংগুনের কাছ থেকে ওভার-ফ্লাইট অনুমতিও নেওয়া হয়।

প্রথম যে তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটি বদলানো হয় এবং প্লেনটির জন্য পুনরায় ওভার-ফ্লাইট অনুমোদন নেওয়া হয়। বিষয়টির গোপনীয়তা এত বেশি ছিল যে উড়োজাহাজটির পাইলট নৌশাদুল হকও (সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের ভাই) জানতেন না তার ব্যাংকক যাওয়ার মূল কারণ কী।

সাবেক রাষ্ট্রদূত আকরামুল বলেন, বিষয়টি গোপন রাখার জন্য বলা হয় ঢাকা থেকে ব্যাংককে প্রশিক্ষণ মিশনের জন্য প্লেন পাঠানো হচ্ছে।

হাই ভ্যালু প্রিজনার:

বজলুল হুদাকে ফেরত পাঠানোর আগেরদিন রাষ্ট্রদূতকে ভোরে জেলারের অফিসে থাকার অনুরোধ করা হয়।

রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। আমার স্ত্রীও জানতেন না আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি। সকাল ৭টার দিকে ব্যাংককের বাং কোয়াং জেলখানায় পৌঁছালে আমাকে অনেক কাগজ দেওয়া হয় সই করার জন্য। সই করার পর ‘হাই ভ্যালু প্রিজনার’ হিসেবে বজলুল হুদাকে আমার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কনভয়:

বজলুল হুদাকে ৬ গাড়ির একটি কনভয়ের মাধ্যমে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই কনভয়ের কয়েকটি গাড়িতে মেশিনগান স্থাপন করা ছিল এবং গোটা কনভয়টিতে কমান্ডোরা অংশগ্রহণ করেন। বজলুল হুদাকে একটি গাড়িতে বসানো হয় এবং সাইরেন বাজিয়ে কনভয়টি বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেয়।

রাষ্ট্রদূত বলেন, থাইল্যান্ডের স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোদের ওপর কড়া নির্দেশ ছিল, রাস্তায় কোনও প্রতিবন্ধকতা পেলে সেটাকে উপড়ে ফেলতে। সেদিন সবকিছু দেখে মনে হয়েছিল এটা যেন হলিউডি কোনো ছবি। আর সেই ছবিতে আমিও একটি চরিত্র। বঙ্গবন্ধুর কুখ্যাত খুনিকে এমন গুরুত্ব দিয়ে সব আয়োজন!

আর গাড়িবহরের যাত্রা শুরু হলে খেয়াল করলাম আশপাশের যান চলাচল বন্ধ করে বুলেটের গতিতে গাড়িগুলো ছুটছে ডন মং বিমানঘাঁটির উদ্দেশে। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা পৌঁছে গেলাম বিমানঘাঁটিতে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আন্তোনভ-৩২ বিমানটির দিকে। সেখানে আব্দুল কাহার আখন্দের কাছে বজলুল হুদাকে বুঝিয়ে দিই। প্লেনে ওঠার পরে বজলুল হুদাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়।

আমার মনে আছে, প্লেনে ওঠার আগে বজলুল হুদা আমাকে বলেছিল, তোমার সঙ্গে আমার ঢাকায় দেখা হবে। আমি বলেছিলাম ওকে, কোনও অসুবিধা নেই।

কৃতজ্ঞতা: শেখ শাহরিয়ার জামান

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।