আবারও গণমাধ্যমের ❛বাসন্তি চক্রান্ত❜, আরেক ৭৫-এর পটভূমিকা সৃজন?

0

মু্ক্তমঞ্চ:

এই সেই কুখ্যাত ছবি। জাল পরা বাসন্তি ডানে আর বামে দাঁড়ানো বাসন্তির কাকাতো বোন দূর্গতি।

বাসন্তিকে মাছ ধরার জাল পরিয়ে ছবিটা তোলে ফটোগ্রাফার আফতাব আহমেদ। প্রকাশিত হয়েছিলো দৈনিক ইত্তেফাকে ১৯৭৪ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, বুধবার; ইত্তেফাকের ভেতরের ক্রোড়পত্রে। তৎকালীন ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলো ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। মানিক মিয়া সাহেবের বড় পূত্র।

ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ভাইকে একটা বিশেষ বিশেষ ধন্যবাদ এই ছবিটি কবে প্রকাশিত হয়েছে সেটির সময় জানাবার জন্য এবং একই সাথে এই মিথ্যে ছবিটি যেই লোকটি তুলেছিলো, সেই আফতাব আহমেদ সম্পর্কে আমাকে তাঁর অভিজ্ঞতা জানাবার জন্য।

আপনারা অনলাইনে এই বাসন্তিকে নিয়ে অনেক লেখা পাবেন। কিন্তু আশ্চর্য হলেও লক্ষ্য করবেন সেইসব লেখাতে কোথাও লেখা নেই যে, এই ছবিটি ইত্তেফাকে কবে প্রকাশিত হয়েছে। দিন-তারিখ কোনো লেখকই কি এক অদ্ভুত কারণে লেখেন নাই।
সবাই খালি তাঁদের লেখাতে উল্লেখ করেন, ‘১৯৭৪-এর দূর্ভিক্ষের সময়’ বাক্যটি। রিটন ভাই এই তারিখ সংক্রান্ত বিষয়ে সাহায্য না করলে বড় সমস্যা হয়ে যেতো। ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতি একটা পর্যায়ে বেশ নাজুক ছিলো। পরপর কয়েকটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ, ঝড়-জলোচ্ছাস এবং সেই সাথে দীর্ঘ বন্যা। বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য সেই সময় ছিলো অসম্ভব রকমের চ্যালেঞ্জিং।

এমনিতেই সেই পাকিস্থান আমল বা তারও আগের আমল থেকে উত্তর বঙ্গ এলাকায় বছরের দুইটি সুনির্দিষ্ট সময়ে মঙ্গা হতো। এরপর এই ১৯৭৪-এর বন্যা, ঝড়, সাইক্লোন ইত্যাদি। অনেকটা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। সেই সময়ের সারা বছরের পত্রিকা পড়লেই দেশের পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারা যায়।

এই জাল পরা বাসন্তি বিষয়ে ক্যাডেট কলেজ ব্লগের ব্লগার রাজীব সাহেব খুব বিস্তারিত লিখেছিলেন। সেই লেখা থেকেই আমি কৌট করে বলছি-

‘সেই ছবি তোলার প্রত্যক্ষদর্শী হলেন, রাজো বালা। তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন। প্রকৃত দৃশ্য বর্ণনা করতে চান না। এখনো ভয় পান। তার মতে, এসব বললে ক্ষতি হতে পারে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে বলে আর লাভ কী!

পরে অনেক আলাপ-আলোচনার পর রাজো বালা বর্ণনা করেন সেই দৃশ্য। ছলছল চোখে আনমনা হয়ে কথা বলেন তিনি। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, ৭৪-এ যখন বাসন্তি-দুর্গাতিদের ছবি তোলা হয়, তখন ছিল বর্ষাকাল। চারদিকে পানি আর পানি।
এমন প্রেক্ষাপটে তিনজন লোক আসেন বাসন্তিদের বাড়িতে। এদের মধ্যে একজন ছিল তৎকালীন স্থানীয় রিলিফ চেয়ারম্যান, তার নাম আনছার। অপর দুজনকে রাজো বালা চিনতে পারেনি।

বাসন্তি-দুর্গতিদেরকে একটি কলাগাছের ভেলায় করে বাড়ি থেকে বের করা হয়। আর অন্য একটি ভেলায় রেখে তাদের ছবি নেয়া হয়। এ সময় পাশের একটি পাট ক্ষেতে ছিলেন রাজো বালা। ছবি তোলার আগে আগন্তুকরা বাসন্তিদের মুখে কাঁচা পাটের ডগা দিয়ে বলে এগুলো খেতে থাকো। এর বেশি আর কিছু জানাতে পারেননি রাজো বালা।

বাসন্তির কাকা বুদুরাম দাসের কাছে সেই ছবি তোলার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কাঁচুমাচু করেন। এক পর্যায়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করেন সেই ছবি তোলার নেপথ্য কাহিনী। শেষ পর্যায়ে তিনি ঐ ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং প্রতিকার চান।

সঠিকভাবে দিন-তারিখ মনে নেই। একদিন বাসন্তি ও তার কাকাতো বোন দুর্গাতিসহ পরিবারের আরও কয়েকজন মিলে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের ওপর বসেছিলেন। তখন দুপুর গড়িয়েছে। এমন সময় ইউপি চেয়ারম্যান আনসার আলি বেপারি (এক সময়ের মুসলিম লীগ ও পরে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা) কয়েকজন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ একজন সাংবাদিককে (আফতাব আহমেদ, আলোকচিত্রী, দৈনিক ইত্তেফাক) নিয়ে আসেন মাঝি পাড়ায়।

তারা বাসন্তি ও দুর্গাতির ছবি তুলতে চান। এ সময় তারা বাঁধের ওপর মাঝিদের রোদে শুকোতে দেয়া জাল তুলে এনে তা বাসন্তির ছেঁড়া শাড়ির ওপর পরিয়ে ছবি তোলেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় এই ছবি দু’টি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। সুত্র: ‘চিলমারীর এক যুগ’ – মোনাজাত উদ্দিন।

বুদুরাম এভাবে ছবি তুলতে আপত্তি জানিয়ে নিষেধ করেছিলেন। তবুও তারা শোনেননি। এ প্রসঙ্গে বুদুরাম দাশ তার ভাষায় জানায়- ‘চেয়ারম্যান সাব ছেঁড়া হউক আর ফারা হউক একনাতো শাড়ি আছে উয়ার উপরত ফির জাল খান ক্যা পরান, ইয়ার মানে কি? (চেয়ারম্যান সাহেব, ছেঁড়া হোক একটা শাড়ি তো আছে, তার ওপর জাল কেন পরান; এর কারণ কী?

তখন সাইবদের মইদ্যে একজন কয়- ইয়ার পরোত আরো কত কিছু হইবে….। (তখন একজন সাহেব জানায় এরপর আরো অনেক কিছু হবে)।

সে সময়ে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতে একটা ক্রান্তিকাল পার করছিলো। বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছাসসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকার প্রাণপণে এমন অবস্থা থেকে বের হবার সমস্ত চেষ্টাই করছিলেন। কিন্তু এই সুনির্দিষ্ট ছবিটি সেই সময়ে ব্যাপক আলোড়িত হয় এবং বঙ্গবন্ধু সরকারকে এক মিথ্যে ও বানোয়াট ছবির প্রোপাগান্ডায় আহত হতে হয়।

এই ছবিটিতে থাকা বাসন্তি ছিলেন একজন বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। এই নারীটিকে দিয়েই এই অমানুষ আফতাব আহমেদ ও তার সঙ্গে থাকা শফিকুল কবির।

সেই ক্রান্তিকালে শুধু বঙ্গবন্ধু সরকারকে বিদ্ধ করবার জন্যই ইত্তেফাকের এই চক্রান্ত শুধু অমানবিকই নয় বরং এটি ছিলো পুরো মাত্রায় জোচ্চুরি এবং অসভ্যতা। সাংবাদিকতার যে নৈতিক আদর্শ রয়েছে সেটার পূর্ণ পরিপন্থী ছিলো এই ছবি তুলবার ইতিহাস।

বলা বাহুল্য এই আফতাব আহমেদ-ই তার বাসার কাজের ছেলের মাধ্যমে ছুরিকাহত হয়ে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হন ২০১৩ সালে।

এই বিষয়ে আমাদের প্রিয় রিটন ভাইয়ের একটা দীর্ঘ লেখা রয়েছে। এই লেখাটা অসম্ভব রকমের গুরুত্বপূর্ণ। সেই লেখার একটা পর্যায়ে রিটন ভাই লেখেন-

“১৯৯১ সালে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার গ্রিনরোড কার্যালয়ে এক দুপুরে এসেছিলেন তিনি। আমি তখন পত্রিকাটার ফিচার এডিটর। সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার টেবিলে এসেছিলেন তিনি অনেক আগ্রহ নিয়ে। আমি তাঁকে চা অফার করেছিলাম ঠিকই কিন্তু তাঁর প্রতি আমার ক্ষোভের কথাটাও জানিয়েছিলাম অকপটে।

বলেছিলাম— জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার প্রেক্ষাপট বা পটভূমি নির্মাণে আপনিও তো একজন কুশীলব ছিলেন! চায়ে চুমুক দিতে দিতে বেশ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তিনি আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ছবিটা সাজানো ছিলো সত্যি কিন্তু ওটার পেছনে এতোবড় একটা ষড়যন্ত্র আছে তা তিনি জানতেন না।

তাঁর জবাবটিকে নাকচ করে দিয়ে আমি বলেছিলাম— পলিটিক্যালি মোটিভেটেড বলেই ইত্তেফাক আপনাদের দুজনকে কুখ্যাত সেই এসাইনমেন্টের জন্যে নির্বাচন করেছিলো। যে কোনো কারণেই হোক— আপনারা শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের প্রবল বিরোধী ছিলেন। তাছাড়া আপনি রংপুরের সন্তান। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা এবং পথঘাট আপনার চেনাজানা।”

এই হচ্ছে ঘটনার এক সার সংক্ষেপ।

এই যে এখন টিসিবি’র গাড়ির পেছনে দেখেন এক ভদ্রমহিলা খাদ্যের জন্য লুটিয়ে পড়েছে কিংবা মানুষের লাইন। এসব দেখে আমি বিচলিত হই না। বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে আমি এমন অসংখ্য মিথ্যে প্রোপাগান্ডা আর বেঈমানির ইতিহাস খুঁজে পাবেন যেখানে এই বাংলাদেশ নিয়ে আপনি নিজেই দ্বিতীয় ভাবনা ভাবতে শুরু করবেন।

একটা ঘটনা ঘটলে সেই পুরো ঘটনা নানাদিক থেকে বিশ্লেষন কেউই করতে চায় না। একটা সুনির্দিষ্ট লাইনে এবং একই ধারার ভাবনা সবাইকে পেয়ে বসে। ফলে একটা ঘটনা যে নানা রকমের পয়েন্ট থেকে দেখা যায় সেই ভাবনার প্যাটার্ন অনেকটা উপেক্ষিতই থেকে যায়। যেসব ভাবনাকে আমরা বলি ‘আউট অফ দা বক্স’ ভাবনা।

সেই সময়ের একটা মাছ ধরা জাল যিনি পরতে পারেন অর্থাৎ মাছ ধরার জালের মত মূল্যবান বস্তু যিনি পরে থাকতে পারেন তার পরণে শাড়ি থাকতে পারে না, এটা নিয়ে একজন বাংলাদেশিও সেদিন প্রশ্ন তোলেনি।

মাছ ধরার জাল তো অনেক জরুরী একটি বিষয় হবার কথা সেই মঙ্গার সময়। একজন নারী এমন উপার্জনের অস্ত্র বস্ত্র আকারে কেন পরে থাকবে কিংবা এটি আদৌ সম্ভব কি না, এই প্রশ্ন কারো মাথায় আসলো না? অদ্ভুত!

কেউ এই ছবিকে চ্যালেঞ্জ করেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, দশকের পর দশক লেগেছে এই ছবির সত্যতা বের করতে। ফলে এই বাংলাদেশের টিসিবি’র ট্রাক বলুন কিংবা হাজারো সমস্যা বলুন, আমার কিছুই বিশ্বাস হয় না।

এই বাংলাদেশে ১৫ই অগাস্ট হয়েছে, এই বাংলাদেশে ৩রা নভেম্বর হয়েছে, এই বাংলাদেশেই ২১শে অগাস্ট হয়েছে। এই বাংলাদেশকে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

লেখক: নিঝুম মজুমদার
পরিচিতি: প্রবাসী ব্লগার ও আইনজীবী।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।