বিএনপির ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ফর্মূলায় আগ্রহী নয় কূটনীতিকরাও

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সহানুভূতি অর্জনের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলাপ চালাচ্ছে। তাদের দপ্তরে আর্জি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছে। ইতিমধ্যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন। জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে তারা আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে, আগামীতে আরো কিছু পশ্চিমা দেশের সঙ্গে বৈঠক করবে।

এই বৈঠকগুলোর উদ্দেশ্য কয়েকটি। আগামী নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করা। সেইসাথে সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার, সুশাসনের অভাবসহ ইত্যাদি নানা বিষয়ে অভিযোগ করা। এছাড়া খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ-আলোচনাও আছে।

সম্প্রতি জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিএনপি নেতৃবৃন্দের আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএনপি আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, বিএনপি তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যথারীতি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলার দাবি তুলেছে আবারও। এসময় বৈঠকে একাধিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে বিএনপিকে। যেমন- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে রয়েছে কি না, আর এই দাবি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ মেনে নেবে কি না।

উত্তরে বিএনপি নেতারা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সংবিধানে নেই। কিন্তু তারা মনে করেন, অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। বরং এর বিপরীতে যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে- ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি তাহলে কেন অংশগ্রহণ করেছিল? এর সদুত্তর বিএনপি দিতে পারেনি জার্মান কূটনীতকদের।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে কোনো শর্ত ছাড়াই দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। আর সে কারণেই এখন যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলার কথা বলছে, তখন তাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো বিএনপির অবস্থান যেমন জানতে চাইছে, তেমনি এই বিষয়ে নিজস্ব মতামতও দিচ্ছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া উচিত, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন এবং সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে দেওয়া উচিত। নির্বাচনে যেন সকল রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পায় সেটি নিশ্চিত করা উচিত।

এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছে। তবে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, সবগুলো উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং সংস্থাই বাংলাদেশে নির্বাচন যেমন অংশগ্রহণমূলক চায়, তেমনি নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হোক এটাই চায়। কেউই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মূলাকে সমর্থন করেনা। অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এটি অব্যর্থ ফর্মুলা- সেটি কূটনীতিকরা মনে করেনা।

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচন কীভাবে হবে সেটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এই নির্বাচনে যেন জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে, সেটি তারা চায়। তবে এই চাওয়ার সঙ্গে তারা কখনই মনে করেনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেই সেটি অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে।

বিশেষ করে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আর বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই বলেই উন্নয়ন সহযোগীরা মনে করে। বরং দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনকে কীভাবে অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য করা যায় সেটি বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান থাকতে পারে না বলেও কোনো কোনো রাষ্ট্র মনে করে। বরং তারা মনে করে, সকল রাজনৈতিক দলগুলোরই স্ব স্ব ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে্ সেই ভূমিকা পালনের মাধ্যমে জন-অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন করা সম্ভব। এবারের নির্বাচনের ব্যাপারে পশ্চিম দেশগুলোর ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। আর সেই কারণে নির্বাচনের প্রায় ২ বছর আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে উন্নয়ন সহযোগীরা।

তবে সেই আলাপ-আলোচনায় সবচেয়ে বড় যে তথ্যটি বেরিয়েছে তা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তাদের সায় নেই। বরং তারা চায় শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।