বাংলাদেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি তথ্য

0

অর্থনীতি:

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আজ সোমবার (২১শে মার্চ) উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই কেন্দ্রের থেকে প্রতিদিন ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় উপজেলার ধানখালীতে কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ কেন্দ্র।

বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। ব্যয়বহুল তেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কুইক রেন্টাল সিস্টেমের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জায়গা নেবে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

১. চীন-বাংলাদেশের যৌথ প্রকল্প

পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে। ২০১৪ সালে এই সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল। নির্মাণের কাজ করেছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। আড়াইশো কোটি ডলার ব্যয়ে এই কেন্দ্র নির্মাণের সিংহভাগ অর্থায়ন করেছে চীন।

এরপর ২০১৬ সালের অক্টোবরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করেছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই ধানখালী গ্রামের ১,০০০ একর জমির উপর নির্মিত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এর কাছেই রয়েছে পায়রা বন্দর। যেখান থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি কয়লা আমদানি সহজ হবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

২. এক বছর পিছিয়ে যাওয়া

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সোয়া ১ বছর আগে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গেলেও, করোনা মহামারির কারণে সঞ্চালন অবকাঠামোর কাজ সম্পন্ন হতে সময় লাগে বেশি। ফলে এক বছর পিছিয়ে যায় কার্যক্রম।

পরীক্ষামূলক চালানোর পর ২০২০ সালের ১৫ই মে প্রথম কেন্দ্রটি পুরোপুরি উৎপাদনে আসে। আর দ্বিতীয় ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে কাজ শুরু করে সেই বছরের ডিসেম্বর মাসে। তবে সঞ্চালন লাইন পুরোপুরি নির্মাণ শেষ না হওয়ার কারণে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়নি।

এখন পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত, আমিনবাজার-মাওয়া-গোপালগঞ্জ- মোংলা পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন তৈরি করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতিদিন এই প্ল্যান্টে ৭০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

৩. দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ সঙ্কট দূর করবে

বাংলাদেশের বিদ্যুতের বিপুল চাহিদার এক দশমাংশ পূরণ হবে পায়রার এই একটি কেন্দ্র থেকে। এখানকার বিদ্যুৎ দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুতের সমস্যা অনেকাংশে মিটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প-কারখানা ও উন্নয়নের যে জোয়ার শুরু হবে, তাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই কেন্দ্রটি।

পাওয়ার সেলের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ২১ লাখ।

বাংলাদেশ পাওয়ার সেল বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। তবে সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা কম বলে পুরো ক্ষমতা ব্যবহার করা হয় না বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে।

সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৭৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে গত বছরের ২৭শে এপ্রিল। সক্ষমতা থাকলেও গড় উৎপাদন হচ্ছে ৯ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ আমদানি করা হয় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট।

খালেদা জিয়া সরকারের ১৬শ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে দেশে যে বিদ্যুতের হাহাকার ছিল, তা দূর করতে ক্ষমতায় এসে বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তাগিদ দেন শেখ হাসিনা। যার ফলে ধীরে ধীরে দেশে বিদ্যুতের সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

দেশে কল-কারখানা এবং অর্থনীতিতে আসে জোয়ার। তবে ধীরে ধীরে সরকার ছোটখাট বেসরকারি কেন্দ্র কমিয়ে বড় এবং স্থায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির দিকে মনোনিবেশ করে।

আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা থাকলেও সঞ্চালন ও সরবরাহ লাইনের ত্রুটির কারণে অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহক পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে এজন্য সবচেয়ে বেশি ভুগছেন গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্চালন ও সরবরাহ লাইন পুনর্বিন্যাস করার কাজ করছে সরকার।

আশা করা হচ্ছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে সরকার কুইক রেন্টাল প্রকল্পগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচও কমে যাবে।

৪. কয়লা ব্যবহার নিয়ে যুক্তি-তর্ক

পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন ১২ হাজার টনের বেশি কয়লা পোড়ানো হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে বঙ্গোপসাগরের রামনাবাদ চ্যানেল হয়ে কয়লা আসে। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকেও আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ যখন শুরু হয়, তখন থেকে সেখানকার পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা ওঠে।

সরকারের বিদ্যুৎ খাতে ২০১৬ সালের মহা-পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। যেখানে আমদানি ও নিজস্ব গ্যাসে ৩৫ শতাংশ, আমদানি নির্ভর কয়লায় ৩৫ শতাংশ, তেল, বিদ্যুৎ আমদানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাকি ৩০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশও সর্বশেষ জলবায়ু সম্মেলনে কয়লার ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পরিকল্পনায় থাকা ১০টি কয়লানির্ভর কেন্দ্র বাতিল করেছে সরকার কিছুদিন আগে।

সরকার শুরু থেকেই বলে এসেছে, পরিবেশের ক্ষতি না করে করা হবে এ কাজ। পরিবেশের ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে এই কেন্দ্রে আলট্রা সুপার ক্রিটিকাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.এম খোরশেদুল আলম বলছেন, বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড মেনেই বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে এখানে এবং কার্বন ও সালফার নিঃসরণের মাত্রা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

৫. আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি

পরিবেশ রক্ষায় যে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বা প্ল্যান্টের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা হয়, তাকে বলা হয় আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর দেশের সংখ্যা বাংলাদেশসহ ১৩টি।

এশিয়ায় ভারত, চীন, তাইওয়ান, জাপান ও মালয়েশিয়ায় আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঢাকনিযুক্ত কোল ইয়ার্ড ব্যবহার করার ফলে বাতাসের মাধ্যমে খোলা কয়লার গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যাবে। ফলে পরিবেশ দুষণের সম্ভাবনাও থাকবে না।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।