বাংলাদেশের কূটনীতিতে অভাবনীয় মোড়!

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্স:

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কূটনীতি ছিলো পশ্চিমা নির্ভর। পশ্চিমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ইত্যাদি বিষয়গুলোর জন্য বাংলাদেশকে পশ্চিমাদেরকে সবসময় সন্তুষ্ট রাখতে হবে, গার্মেন্টসসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি ও বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় দেশগুলো সাথে সুসম্পর্ক রাখা ছিলো বাংলাদেশের কূটনীতির অপরিহার্য শর্ত।

কিন্তু সেখান থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি অভাবনীয় মোড় নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের কূটনীতির মূল কথা, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়। কিন্তু এর বাইরে বাংলাদেশের কূটনীতির নিবিড় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের কূটনীতি ছিলো পশ্চিমা নির্ভর।

পশ্চিমাদের আনুগত্য স্বীকার করা, পশ্চিমাদের ভয় করা এবং পশ্চিমাদের বিধি-নিষেধ মেনে চলা, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটা বড় প্রভাব বলয় রচনা করতে সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের প্রভুত্ববাদ তৈরি করেছিল বাংলাদেশে। আর এ কারণে মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে নাক গলাতেন, যেকোনো বিষয়ে অযাচিত পরামর্শ দিতেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ধারায় গত এক দশকে পরিবর্তন হয়েছে। আর সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় দেখা যাচ্ছে।

দুই দিনের সফরে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সেখানে তিনি জ্বালানি তেলের ব্যাপারে সরকারকে আশ্বস্ত করেছেন। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কায় বাংলাদেশে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলেই কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ক্রমেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভারত, চীন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। রাশিয়ার যুদ্ধে সেই সম্পর্কের বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় যখন বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদে ভোটদানে বিরত থাকে। শুধু এই সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং তুরস্কের সঙ্গেও সম্পর্ক বৃদ্ধি করছে।

বাংলাদেশের কূটনীতিতে এখন অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। আর এই কারণে বাংলাদেশের মেরু পরিবর্তন ভবিষ্যতের সাথে সুদৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ এমন দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক বিনির্মাণ করছে, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।

বাংলাদেশের এখন আর্থিক অবস্থা ভালো, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর খুব একটা নির্ভরশীল হতে হয়না। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক, এডিবি বাংলাদেশকে সাহায্য করবেই। কারণ, বাংলাদেশ একটা বড় বিনিয়োগ বাজার এবং এই দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগে বিশ্বব্যাংক প্রবলভাবে আগ্রহী।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আগের সেই প্রভাব বলয় নেই। আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যে সহায়তা পেতো, তার ওপর বাংলাদেশ এখন খুব একটা নির্ভরশীল নয়। অন্যদিকে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে বাংলাদেশে গার্মেন্টসের যে বাজার বা অন্যান্য বাণিজ্য রয়েছে তা মূলত প্রতিযোগিতার কারণেই বাংলাদেশ টিকে আছে।

একদিকে বাংলাদেশের ভালো মানের পোশাক, অন্যদিকে কম খরচে উৎপাদন। এই দুই মিলিয়ে বাংলাদেশ পোশাকশিল্পে বিশ্ব বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে। এ কারণেই বাংলাদেশ এখন তার উন্নয়ন অংশীদার খুঁজছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে এই সম্পর্কের উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। যুদ্ধ এবং রাজনীতির বাইরে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার কূটনীতির দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। সে কারণেই বাংলাদেশের কূটনীতিতে একটি নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।