হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু: বাস্তব নাকি তারেকের নতুন কোনো ষড়যন্ত্র

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্স:

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী গত সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যে মারা গেছেন বলে তার চাচাতো ভাইয়ের দাবি। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অজানা ছিল বিএনপির।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের দাবি, হারিছ চৌধুরীর বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। দলের চেয়ারপারসনের প্রেস উইং থেকেও একই রকমের জবাব পাওয়া গেছে।

তবে যুক্তরাজ্যের বাঙালি কমিউনিটির একটি সূত্রের দাবি, হারিছ চৌধুরী আসলে মারা যাননি। তাকে মৃত দেখিয়ে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তারেক রহমান। ভিন্ন কোনো পরিচিতি আর পরিচয়পত্র নিয়ে হারিছ চৌধুরীকে হয়ত অন্য কোথাও বসানো হচ্ছে।

তবে এই দাবি কতটা সত্য বা কতটা কাল্পনিক, সে বিষয়টি খোলাসা করা যায়নি। সেই সাথে তারেকের পরিকল্পনার বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।

এদিকে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবরটি বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রচার হলেও মিছলে ভিন্ন ভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) রাত থেকেই হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর প্রচার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।

কোনো কোনো গণমাধ্যম বলছে, হারিছ চৌধুরী যুক্তরাজ্যে সাড়ে ৩ মাস আগে মারা গেছেন। সেখানেই তার দাফন হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছে, সাড়ে ৩ মাস আগে তিনি ঢাকায় মারা গেছেন এবং ঢাকাতেই তার দাফন হয়েছে।

তবে হারিছ চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে কিছু বলা হয়নি। তার ভাই, বোন এবং স্বজনদের সাথে কথা বলেন সংবাদকর্মীরা। তবে বস্তুনিষ্ঠ মনে হচ্ছে না পরিবারের বক্তব্যগুলো। মোটামুটি সবারই দাবি, তাদের সাথে অনেক বছর ধরে যোগাযোগ নেই হারিছ চৌধুরীর!

জীবিত আছেন, লন্ডনে আছেন, এমন তথ্য জানার পরেও দেশ থেকে পালানোর পর থেকে আমৃত্যু ভাই-বোনের সাথে যোগাযোগ হয়নি, স্বজনরা তার হদিস জানেন না- এমন কথা কে বিশ্বাস করবে? অথচ তার পরিবার ও স্বজনদের দাবি, হারিছ চৌধুরী দেশ ছাড়ার পর থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ হয়নি!

হারিছ চৌধুরীর বড় বোন ও এক ছোট ভাই বলেছেন, তারা মৃত্যুর খবরটি শুনেছেন, তবে নিশ্চিত নন। লন্ডনে বসবাসরত হারিছ চৌধুরীর মেয়েকে টেলিফোন করা হলেও সেখান থেকেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার রাতে হারিছ চৌধুরীর চাচাতো ভাই সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আশিক উদ্দিন চৌধুরী তার ফেসবুক আইডিতে হঠাৎ হারিছ চৌধুরী ও তার ছবি সংযুক্ত করে লেখেন, ‘ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন’। এরপর এই ‘মৃত্যুর খবরের’ ডালপালা বাড়ে।

এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, মাস দুয়েক আগেও ফেসবুকে একই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন আশিক চৌধুরী। কিন্তু তখন বিষয়টি তেমন আলোচনায় আসেনি। মঙ্গলবার রাতে তিনি কেন আবার একই স্ট্যাটাস দিলেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মৃত্যুর গুঞ্জনের সত্যতা যাছাই করতে লন্ডনে হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করা হলে এক ব্যক্তি ফোনটি ধরেন। নাম-পরিচয় জানালে তিনি শুরুতেই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এই নম্বর আপনি কীভাবে পেলেন? গত ১৫ বছরে কেউ ফোন করে কিছু জানতে চায়নি।’

ফেসবুকে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে আলোচনার কথা জানালে তিনি ওই সব স্ট্যাটাসের লিংক তাকে পাঠানোর অনুরোধ জানান। কয়েকবার তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, হারিছ চৌধুরী বেঁচে আছেন কি না? তিনি এর জবাব দেননি। তবে বলেছেন, পরে যোগাযোগ করবেন। তিনি নিজে তার পরিচয়ও প্রকাশ করেননি।

গত সোমবার বিকেলে হারিছ চৌধুরীর রাজনৈতিক সহকর্মী বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা গণমাধ্যমকে বলেন, মারা গেছেন শুনেছেন। এর বেশি কিছু জানেন না। এক-এগারোর পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি বলে দাবি করেন তারা।

আশিক চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বড় ভাইয়ের কথা হঠাৎ মনে পড়ল তাই স্ট্যাটাস দিয়েছি। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে দিইনি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

তিনি আরো বলেন, হারিছ ভাই মারা গেছেন এটা সত্য। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফেরেন। পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি লন্ডনে মারা যান। সেখানেই কবর দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝিতে করোনায় মারা যান তার আরেক ভাই সেলিম চৌধুরী।

কার কাছ থেকে এই মৃত্যুর খবর শুনেছেন জানতে চাইলে আশিক চৌধুরী বলেন, হারিছ চৌধুরীর ছেলে-মেয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। তারা জানিয়েছেন।

কিন্তু বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত একজনকে পাওয়া গেছে যাকে আশিক চৌধুরী বলেছেন, হারিছ চৌধুরী গোপনে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি ঢাকায় মারা যান। গেণ্ডারিয়ায় তাকে দাফন করা হয়।

আশিক চৌধুরীর এই দুই রকম বক্তব্যের কারণে অনেকের মধ্যে হারিছ চৌধুরীর অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এমন ধোঁয়াশা অবস্থায় হারিছ চৌধুরীর বড় বোন একলাসুর নাহার বলেন, আমি আশিকের কাছ থেকে শুনেছি। নিজে কিছু জানি না। ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।

হারিছ চৌধুরীর বড় এই বোন আরো বলেন, মিথ্যা বলব না। ৩ বছর আগে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর দুবার ফোন দিয়েছিল হারিছ। তার পর থেকে আর যোগাযোগ হয়নি। আমি কানাডায় ছিলাম। ছোট ভাই সেলিম মারা যাওয়ার পর কয়েক মাস আগে দেশে আসি। তখন হারিছ মারা যাওয়ার খবর আশিকের কাছে শুনেছি।

হারিছ চৌধুরীর ছোট ভাই ডা. মুকিত চৌধুরী বসবাস করেন ইরানে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে আমাদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনেছি তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। ২০০৭ সালের পর থেকে ভাইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়নি।

সিলেটের কানাইঘাটের দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পনগরে হারিছ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি। ৫ ভাই, ৫ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। হারিছ চৌধুরীর দুই ভাই মারা গেছেন। সবার ছোট ভাই কামাল চৌধুরী জন্মলগ্ন থেকেই অসুস্থ। তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

এক ভাই থাকেন ইরানে। তিনি পেশায় চিকিৎসক। হারিছ চৌধুরীর ছেলে ও মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। মেয়ে ব্যারিস্টার, ছেলে বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন।

এদিকে তার মৃত্যুর খবরে বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো বিবৃতি বা বার্তা গণমাধ্যমে পাঠানো হয়নি। হঠাৎ তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। যদি তিনি মারাই যান তাহলে ৩ মাস এই তথ্য গোপন রাখার প্রয়োজন পড়ল কেন? আর কেনই বা হঠাৎ খবরটি প্রচার হলো?

আসলেই হারিছ চৌধুরীর ভাগ্যে কী ঘটেছে, এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। তাকে ঘিরে নতুন কোনো চক্রান্ত বা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে কি না, এটাও জিজ্ঞাসা দেশবাসীর।

সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল কাহের শামীমের দাবি, এটা অন্তত ৩ মাস আগের কথা। উনি মারা গেছেন ঢাকায়। পারিবারিকভাবে এটা জানানো হয়নি। হারিছ চৌধুরীকে ঢাকাতেই দাফন করা হয় বলে দাবি তার। তবে কোথায় দাফন করা হয় তা তিনি বলতে পারেননি।

উল্লেখ্য, বিএনপির রাজনীতিতে হারিছ চৌধুরী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার সরকারের পাশাপাশি তারেক রহমান চালু করেন সমান্তরাল আরেকটি সরকার ব্যবস্থা- একটি মাফিয়া সাম্রাজ্য, যার নাম হাওয়া ভবন। সেই হাওয়া ভবন থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো পুরো দেশ।

হাওয়া ভবনের অনুমতি বা তারেক রহমানকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে দেশে একটি কুটোও বাতাসে উড়ত না, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। সেই মাফিয়া সিন্ডিকেটের অন্যতম খুঁটি ছিলেন হারিছ চৌধুরী।

সরকারের উন্নয়নমূলক বাজেটই হোক বা বিদেশি বিনিয়োগ অথবা বেসরকারি উদ্যোগে কলকারখানা স্থাপন কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে একটি রিক্সা ক্রয়- প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ধারিত ছিল বখরা। সব কিছু থেকেই ১০% হারে চাঁদা ধার্য ছিল প্রিন্স অব বগুড়া খ্যাত মাফিয়া সর্দার তারেক রহমানের জন্য। লবিং, তদবির আর লেনদেন হতো হারিছ চৌধুরীর হাত দিয়েই।

তারেক রহমানের ডান হাত হিসেবে বিপুল ক্ষমতা উপভোগ করেছেন হারিছ চৌধুরী। তার বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনেও সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করতে হতো বিপুল অর্থ। যা সে সময় প্রথম আলো পত্রিকাতেও শিরোনাম হয়েছিল। দুর্নীতিবাজ বিএনপি নেতাদের ধরতে চলমান অভিযানের খবর পেয়ে রাতারাতি নিরুদ্দেশ হয়ে যান হারিছ।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।