বীজ নিয়ে কৃষকদের সাথে অভিনব প্রতারণা!

0

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:

এয়ারটাইট (বায়ুরোধী) প্যাকেটের গায়ে ফসলের লোভনীয় ছবি। লাবনী, টুনটুনি, গিরাকাটা, রূপবান, নলডোগ, পটিয়া, দিয়া, যাদু, রাজমনি… বিভিন্ন ফসলের বীজের প্যাকেটের গায়ে লেখা এসব বাহারি নাম। শুধু নামটি লেখা বাংলায় বাকি সব তথ্যই ইংরেজি কিংবা চীনা ভাষায়।

সব ফসলের বীজের প্যাকেটের গায়েই বড় করে লেখা আছে হাইব্রিড। লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের মাসুদ বীজ ভাণ্ডারের আদনান সীড, রামগঞ্জের বাবুল বীজ ভাণ্ডার, রুহুল আমিন বীজ ভাণ্ডার ও আমিন সীড ব্র্যান্ডসহ কয়েকটি বীজের এমন বাহারি নাম দিয়ে চলছে বেচাকেনা, ঠকছেন কৃষকসহ সব ধরনের গ্রাহকরা।

প্যাকেট দেখে বোঝার কোন উপায় নেই বীজের প্যাকেটগুলো বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলার প্রত্যন্ত গ্রামেই প্যাকেটজাত করা হয়েছে। চকচকে মোড়কে ঢাকা এবং উন্নতমানের বীজ হিসেবেই গ্রামগঞ্জের ছোট বড় অন্য বীজ বিক্রেতাদের হাত বদল হয়ে এসব বীজ সরাসরি চলে যাচ্ছে কৃষকদের ক্ষেতে।

বাহারি নাম আর ফসলের লোভনীয় ছবি দেখে বেশি দামেই বীজ কিনছেন কৃষক। পরে প্যাকেটের ছবির সাথে ফলনের ছবির কোন মিল থাকেনা কিংবা কাঙ্ক্ষিত চারা গজায় না, এমন অভিযোগ কৃষকদের।

এভাবেই দীর্ঘদিন যাবত প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। এমন প্রতারণা দীর্ঘদিন চলে আসলেও লক্ষ্মীপুরে বীজ ব্যবসা মনিটরিং কিংবা মান যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের লাভলু, জাকির হোসেনসহ কয়েকজন জানালেন, এটা বীজ ব্যবসার নামে অরাজকতা। এমন অবস্থা চলতে থাকায় স্বয়ং ক্ষুব্দ লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগও। লক্ষ্মীপুরে বহু বছর যাবত বীজ মনিটরিংয়ের কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী না থাকলেও আছে বীজ বিক্রয়ের ৪৫টি সনদপত্র।

লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, রামগতি এবং কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন বীজ বিক্রয় প্রতিষ্ঠান, কৃষক এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বীজ ব্যবসা নিয়ে কথা হয় জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ১০-১২ জন ক্ষুদ্র বীজ বিক্রেতার সাথে।

এ সময় সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের আবদুল মাজেদ এবং কমলনগরের রিয়াজসহ কয়েকজন জানান, দেশের বড় বড় নামি দামি কোম্পানির দেখাদেখি লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় কয়েকজন রাতারাতি বীজ প্যাকেটিং শুরু করে। এতে অল্প দিনেই তাদের ভাগ্য বদল হয়ে যায়।

খোলা বীজ স্থানীয় বাজার ও দেশের বিভিন্ন স্থান হতে মণ (৪০ কেজি) হিসেবে কিনে এনে প্যাকেটে বাহারি নাম ও উচ্চ দাম বসিয়ে রাতের অন্ধকারে ঘরে বসে নিজেদের তৈরি প্যাকেটে প্যাকেটিং করে। পরে ছোট ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কৃষকের হাতে তা তুলে দেয়।

তাদের কারোরই বীজ উৎপাদনের নিজস্ব খামার, পরীক্ষাগার, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বীজ আমদানির কোনো প্রকার লাইসেন্স নেই। এ ধরনের ব্যবসায়ীদের ছোট-বড় বীজের দোকান আছে। তবে সেসব দোকানের নাম তাদের বীজের প্যাকেটে থাকে না।

নিজেদের বীজ হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন নামে। দোকানে দেশীয় বিভিন্ন বড় কোম্পানির বীজ থাকে। কোনো কৃষক যখন অন্য কোম্পানির বীজ কিনতে চায়, তখনই কৃষককে ভুল বুঝিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের বীজ হাতে ধরিয়ে দেয়।

বীজ বিক্রেতা রিয়াজ জানান, এ কাজটি করতে দোকানদারের আড়ালে তাদের লাগে একটা প্রত্যয়ন সনদপত্র। কষ্ট শুধু সনদপত্রটা আদায় করা। তারপর দেদারচ্ছে চলছে ব্যবসা। জেলা পর্যায়ে এ ব্যবসার কোন তদারকি নেই।

তিনি আরো জানান, ২ বছর আগেও যিনি বাজারে বাজারে ফেরি করে তরকারি বিক্রয় করতেন, তিনি এখন লক্ষ্মীপুর জেলার বড় বীজ কোম্পানি। অথচ তার একটি দোকান ছাড়া বীজ উৎপাদনের নিজস্ব খামার, পরীক্ষাগার, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বীজ আমদানির কোনো প্রকার লাইসেন্স নেই।

সদর উপজেলার কৃষক কাউছার জানান, অবস্থা দেখে মনে হয়, যে কেউই প্রত্যয়ন সদনটি নিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে বীজ কিনে চকচকে প্যাকেটে ভরে ইন্টারনেট থেকে নেয়া ছবি আর বাহারি নাম দিয়ে উচ্চ মূল্যে বীজ বিক্রয় করতে পারে।

আবদুর রাজ্জাক নামের এক কৃষক জানান, কোনো বীজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে উল্টো কৃষককে শত প্রশ্ন ছুড়ে দেয় বীজ বিক্রেতারা। কীভাবে জমি চাষ করেছিলেন, মাটির মান কেমন ছিল, সার, কীটনাশক, নিড়ানী ঠিক মতো দিয়েছিলেন কি না?

এমন সুচতুর প্রশ্ন এড়িয়ে চলতে কৃষক কোনো প্রকার অভিযোগ তুলতে সাহস পায় না। তাছাড়া কৃষরা জানেনই না যে কার কাছে অভিযোগ করবেন, আদৌ তাতে কোনো ফল মিলবে কি না!

কমলনগর উপজেলার কৃষক রায়হান ও কামরুল জানান, তিনি গত মৌসুমে লক্ষ্মীপুরের মাসুদ বীজ ভাণ্ডার থেকে আদনান সীড নামক এক কোম্পানির পটিয়া নামক একটি জাতের শিমের বীজ কিনে ২০ শতক জমিতে বপন করেছিলেন।

প্রায় ২০ দিন পরেও কোনো চারা গজায়নি। প্রতিটি ৫০ গ্রাম শিমের বীজের প্যাকেট কেনেন ২৩০ টাকা দরে। সে হিসেবে ১ কেজির দাম পড়েছে ৪ হাজার ৬শ টাকা।

তিনি আরো জানান, স্থানীয়ভাবে তাদের এলাকায় প্যাকেট ছাড়া শিমের বীজ প্রতি কেজি ১শ ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মাসুদ বীজ ভাণ্ডার আদনান সীড নামে বীজ প্যাকেটিং করে দীর্ঘদিন যাবত বাজারজাত করছে।

লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে, লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের মাসুদ বীজ ভাণ্ডারের আদনান সীড, রামগঞ্জে বাবুল বীজ ভাণ্ডার, ভবানীগঞ্জ এলাকার রুহুল আমিন বীজ ভাণ্ডারের আমিন সীড, নূর সীড অন্যতম।

স্থানীয়ভাবে রাতারাতি কোম্পানি বনে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফসলের বীজের প্যাকেটের গায়ে তাদের নাম লেখা থাকলেও সরবরাহকারী বা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কোনো নাম লেখা পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র একটি রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লেখা রয়েছে। প্যাকেট খুলে দেখা যায় ভিতরে সাধারণ বীজ। দাম নামি দামি কোম্পানির বীজের দামের চেয়ে অনেক বেশি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, আদনান সীড নামে বাজারে সরবরাহকারী লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের মাসুদ বীজ ভাণ্ডারের মালিক মাসুদ জানান, তাদের একটা লাইসেন্স ছাড়া বীজ উৎপাদনের খামার, পরীক্ষাগার ও কোনো কর্মকর্তা নেই।

কিন্তু নিজেদের প্যাকেট করা বীজের গায়ে চীনা ও ইংরেজি ভাষা এবং হাইব্রিড কেন লিখছেন- তার কোনো উত্তর তিনি দিতে পারেননি। তারা সব রকমের ফসলের বীজ প্যাকেট করে বাহারি নাম দিয়ে গায়ে হাইব্রিড লিখে বাজারজাত করছেন।

আমিন সীডের ব্যবস্থাপক মো. দিদার হোসেন জানান, তারা বীজ উৎপাদন করেন না, বিভিন্ন কোম্পানি ও কৃষকদের থেকে বীজ কিনে প্যাকেটজাত করে বিক্রয় করেন। কিন্তু নাম রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তারাও প্রায় সব রকমের ফসলের বীজ বিক্রয় করেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, বিএডিসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত বীজ কেউ দোকানে বিক্রি করতে চাইলে সরকারি বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির প্রত্যয়নপত্র লাগে। এছাড়া কেউ নিজেদের উৎপাদিত বীজ বাজারে বিক্রয় করতে চাইলেও বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির প্রত্যয়নপত্র লাগে।

প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার আগে ও কোনো বিশেষ বীজ বাজারে বিক্রি করার আগে বীজের মান যাচাই-বাচাই করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু লক্ষ্মীপুরে অন্য কোম্পানির বীজ বিক্রয়ের সনদ নিয়ে নিজেরাই রাতারাতি কোম্পানি বনে যাওয়ায় বীজের কোন মান যাচাই করা হয় না। ফলে বীজ কিনে কৃষকরা হচ্ছেন প্রতারিত, লোকসানে পড়তে হচ্ছে আবাদেও।

কৃষকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর শিশুপার্ক সংলগ্ন একটি ভাড়া বাড়িতে লক্ষ্মীপুর জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তার কার্যালয় রয়েছে। তবে গত ২ বছরের মধ্যে স্থানীয় কেউ ঐ অফিসের কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অফিসে আসতে কিংবা অফিস থেকে বের হতে দেখেননি।

জেলা অফিস কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ে কোনো ধরনের মনিটরিং না থাকলেও বীজ বিক্রয়ের জন্য জেলাব্যাপী অনেকগুলো লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। বীজ বিক্রয়ের লাইসেন্স নিয়ে দোকানদাররা নিজেরাই রাতারাতি ভেজাল বীজের কোম্পানি হয়ে যাচ্ছে।

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কথা হয় জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জহির আহমদের সাথে। তিনি জানান, কয়েক বছর যাবত লক্ষ্মীপুরে এ পদে স্থায়ী কোন কর্মকর্তা ও কোন কর্মচারী নেই। তিনি নিজে ফেনী জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত।

গত ১ মাস আগে লক্ষ্মীপুর জেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সে কারণে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান এ কর্মকর্তা। তবে বাজারের খোলা বীজ কিনে প্যাকেটিং করে নাম দিয়ে বিক্রয় করাকে কঠিন অপরাধ বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লক্ষ্মীপুরের উপ-পরিচালক ড. মো. জাকির হোসেন জানান, লক্ষ্মীপুর জেলায় বীজ ব্যবসা নিয়ে যা হচ্ছে তা অরাজকতার সমান। তিনি কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে ভেজাল বীজ তৈরি ও বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অফিস লক্ষ্মীপুর সূত্রে জানা যায়, বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত বীজ বিক্রয়ের জন্য লক্ষ্মীপুর জেলায় ৪৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বীজ বিক্রয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে শতাধিক বীজ বিক্রয়ের দোকান।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।