জাসদের কুৎসিত রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্রের স্বরূপ | মতামত

0

মুক্তমঞ্চ:

জাসদ নেতা শ্রদ্ধেয় আলহাজ্ব কমরেড ইনু সাহেবের একটা বক্তব্য শুনে চেয়ার থেকে উল্টে পড়ে কোমরে হেব্বী চোট পেয়েছিলাম। আর এখন মুভ মালিশ করছি গাঁটে গাঁটে। ইনু সাহেব বললেন যে,

‘শরিকরা না থাকলে হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবে না আওয়ামী লীগ’ … ‘আপনার (আওয়ামী লীগ) আশি পয়সা থাকতে পারে, আপনি এক টাকার মালিক না। যতক্ষণ এক টাকা হবে না, ততক্ষণ ক্ষমতা পাবেন না। আপনি আশি পয়সা; আর এরশাদ, দিলীপ বড়ুয়া, মেনন ও ইনু মিললে তবেই এক টাকা হবে। আমরা যদি না থাকি তাহলে আশি পয়সা নিয়ে আপনারা রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরবেন। এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবেন না।’

এরকম একটা ধাক্কা পেয়ে আসলে তাল সামলাতে পারিনি। তাই চেয়ারসহ প্রপাত ধরণীতল।

এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির নাম হলো জাসদ। জাসদের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সে সত্য দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার বোঝা যায়। এদের জন্মপ্রক্রিয়ার দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। ফিরে যেতে হয় ষাটের দশকে। “স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নাকি “স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ” এই বিতর্কে ছাত্রলীগে বিভাজন দেখা যায়। সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের পক্ষ নেয়া অংশের নেতৃত্বে ছিলেন এদেশের রাজনীতির রহস্যমানব খ্যাত সিরাজুল আলম খান। আর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সমর্থনকারী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি।

১৯৬৩ সালের নভেম্বরে তিনি আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে ছোট একটা সেল বা চক্র তৈরি করেন। রাজ্জাক ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রিয় কমিটির সহ-সম্পাদক। কাজী আরেফ ছিলেন ঢাকা নগর ছাত্রলীগের সভাপতি। এই সেলের তাত্ত্বিক ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তাঁরা বিপ্লবী রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন ছিলেন। আঙ্গুল কেটে রক্ত ছুঁয়ে তাঁরা শপথ নেন, যতদিন পূর্ব বাংলা স্বাধীন না হবে, ততদিন তারা ব্যক্তিগত সুখ- সুবিধার পেছনে ছুটবেন না, এমন কি বিয়েও করবেন না। … সেলটির নাম দেওয়া হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ (পৃষ্ঠা-১৯)। {জাসদের উত্থান ও পতনঃ মহিউদ্দিন আহমেদ}

স্বাধীনতার পরে অবিভক্ত ছাত্রলীগের সভাপতি হন নুরে আলম সিদ্দিকী। তিনি শেখ মণি, আব্দুর রাজ্জাকের অনুসারী ছিলেন। আর সিরাজপন্থী অংশের নেতৃত্ব দেন ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব, শফিউল আলম প্রধানরা। এই শফিউল আলম প্রধান ছিলেন পাকিস্তানের স্পীকার কুখ্যাত পাকি দালাল গমিরুদ্দিন প্রধানের ছেলে। কুখ্যাত সেভেন মার্ডারের মাধ্যমে এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম ক্যাম্পাসে রক্তক্ষয়ের ইতিহাস রচিত হয় যার কারণে।

এই বিভাজন ক্রমশঃ জটিল থেকে জটিলতার দিকে ধাবিত হতে থাকে। যার অবসান হয়, ছাত্রলীগের বিভাজন আর জাসদের জন্মের মধ্য দিয়ে। কারণ বঙ্গবন্ধু নূরে আলম সিদ্দিকির অংশকেই সমর্থন করেন।

শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মারমুখী ভুমিকা গ্রহণ করে জাসদ। ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪ সালে আহ্বান করে হরতাল। ১৭ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভা শেষে প্রায় হাজার ত্রিশ উত্তেজিত জনতার এক বিক্ষোভ মিছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ী ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। পুলিশ বাহিনী বাধা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তলব করা হয় রক্ষীবাহিনীকে। সংঘঠিত হয় খণ্ডযুদ্ধ। আহত নিহত হন বেশ কয়েকজন, উভয়পক্ষেই। এরপর কর্ণেল তাহেরের মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয় তারা। তৈরী করে “গণবাহিনী” আর “বৈপ্লবিক সৈনিক সংস্থা”।

যে কোনও দেশের সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে “বৈপ্লবিক সৈনিক সংস্থা” গড়ে তোলাই ছিলো সেনা আইনের সুস্পষ্ট লংঘণ। কর্ণেল তাহের চরম মুজিব বিদ্বেষী ছিলেন। আর জাসদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লষণ করলে মুজিব সরকারকে উৎখাত করা ছাড়া আর কোন লক্ষ্য আছে বলে প্রতীয়মান হয়না। পাকিস্তানপন্থী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে হাতে রাখার উদ্দেশ্যে তারা সরকার বিদ্বেষের পাশাপাশি ভারত বিদ্বেষের জুজুও ব্যবহার করে প্রপাগণ্ডা হিসেবে।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনের ছয় মাস পরে ১ সেপ্টেম্বর ৭৩ এক প্রচারপত্রে জাসদ বলে, “ভারতের ৭৫টি বিড়লা টাটাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও বর্তমান সোভিয়েতের ব্রেজনেভ কোসিগিন প্রতিক্রিয়শীল চক্রে’র প্রতিনিধি শেখ মুজিবের ‘ফ্যাসিস্ট জাতীয় বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উৎখাত করার জন্য, ঘুণে ধরা এই সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে নূতন সমাজের ভিত রচনা করার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করবো।”

এ জাতীয় বিবৃতির ভাষায় সরকারের প্রতি যেমন সাধারণ মানুষের ঘৃণার সৃষ্টি হতো, তেমনি বোকা সরল গোছের অনেক তরুণ মনে করত, রুশ বিপ্লব ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেয়ে বড় কোনো বিপ্লব এল বলে এবং মুজিবের পতন আসন্ন।

ফ্যাসিস্ট মুজিব সরকারের উৎখাত দাবি করে ১৯৭৪-এ জাসদ এক প্রচার পত্রে ঘোষণা করে, “ফারাক্কা বাঁধ প্রশ্নে শেখ মুজিবচক্রের ‘মেনিমুখো’ নীতি বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্নে এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। আগামী অক্টোবরে কিংবা নভেম্বরে ফারাক্কা বাঁধ চালু হলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্রমেই মরুভূমিতে পরিণত হবে।” {সৈয়দ আবুল মাকসুদ। ‘জাসদ ও গণবাহিনীর ঠিকুজি’}

কর্ণেল তাহেরের মুজিব বিদ্বেষ এতটাই প্রবল ছিলো যে, বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফনের সংবাদ পেয়ে তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ‘ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের পর গণবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি লিফলেটও প্রচার করা হয়। লিফলেটের শিরোনাম ছিল, ‘খুনি মুজিব খুন হয়েছে— অত্যাচারীর পতন অনিবার্য।’

সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে “দেশ গড়ার সংগ্রামের” বদলে তারা শুরু করে দেয় খুন ধর্ষণ, থানা আর পুলিশ ফাঁড়ি লুটের মহোৎসব। যাতে যোগ দেয়, “মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই” ফতোয়া দেয়া হক, তোয়াহা, দেবেন সিকদার, শান্তি সেন, অমল সেন, সিরাজ সিকদারদের বাহিনীগুলোও। শ্রেণীশত্রু খতম করার শ্লোগান দিয়ে হত্যা করা হয় শতাধিক জন প্রতিনিধিকে।

এই কমব্যাট ট্রেইনড মারসিনারিদের সশস্ত্র তান্ডবের মুখে পুলিশ বাহিনী হয়ে পড়ে অসহায়। ফলে তলব করা হয় রক্ষীবাহিনীর প্যারামিলিশিয়াদের। ফলাফল, আরেকটি ব্লাডবাথ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামাত, মুসলিম লীগ, পিডিবির কর্মীরাও জাসদ সেজে যায় রাতারাতি। এই কারণে ৭ই নভেম্বরের মিছিলে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” শ্লোগান ওঠার দাবীও করেছেন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী।

৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ আর শাফায়াত জামিলের সামরিক অভ্যুত্থান বঙ্গবন্ধুর খুনীদের উৎখাত করলে, কর্ণেল তাহের একদিকে ওই অভ্যুত্থানকে ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সৈনিকদের সংগঠিত করার প্রয়াস গ্রহণ করেন। ৫ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টগুলো হাজার হাজার লিফলেটে ছেয়ে যায়। কিছু কিছু লিফলেটের শিরোনাম ছিল এ রকম:

সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই।

হায়দার আকবর খান রনো তাঁর “শতাব্দী পেরিয়ে” বইতে লিখেছেন, “এসব সৈন্য ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল অসহায়। এরাও সক্রিয় হয়ে উঠে ৭ নভেম্বর। পাকিস্তান ফেরতরাও যোগ দেয় বিপ্লবীদের সাথে। সৈনিক-জনতার বিপ্লব, সেই সময় করা ছিল? সৈনিকদের পদভারে টু-ফিল্ড রেজিমেন্ট তখন প্রকম্পিত। এদের মধ্যে বহু সৈনিক দেখা গেল এলোমেলো খাকি ড্রেসে। পায়ে ছিল বুটের বদলে সাধারণ জুতা, অনেকের মাথায় টুপিও নাই। জাসদের বিপ্লবী সংস্থার সদস্যবৃন্দ সিপাহী বিদ্রোহের রাতে খাকি উর্দি পরে তারা মিশে গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের সাধারন জোয়ানদের সাথে।

কে বিপ্লবী সৈনিক, কে আসল সৈনিক বুঝা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তারাই অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছিল। সিপাহীদের সাথে তাহলে জনতাও ছিল। কিন্তু ওরা কারা? জাসদতো ছিলই। আরও অনেকে যুক্ত হয়েছিল। যেহেতু এই মূল পরিকল্পনায় ছিল সাম্রাজ্যবাদ সেহেতু ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের লোকেরাও প্রতিবিপ্লবের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিল। বামপন্থী অন্যান্য দল আগে কিছু না জানলেও খবর পেয়ে ৭ নভেম্বর মাঠে নেমেছিল।”

রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রায় ৪ দশক সময়ে অন্তত ৫ বারের মতো ভাঙনের মুখে পড়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের ঘোরবিরোধী এ দলটি। জাসদ ভেঙে বাসদ হয়। সেই বাসদও হয় চারটুকরা। আর ভোটের রাজনীতিতে এদের প্রভাব যে কতটুকু তা ভালোই বোঝা যায়, একলা করা নির্বাচনে এই জাসদ বাসদের প্রার্থীদের নিয়মিত জামানত হারানোর ট্রেইলারের মাঝেই।পরবর্তীকালে জাসদ নেতাদের ভূমিকা প্রমাণ করে দেয় জাসদের নেতাদের নৈতিকতার দৌড় আসলে কতটুকু।

আসম আব্দুর রবের কথাই ধরুন। ভদ্রলোক একবার হন এরশাদ সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দলীয় নেতা, একবার হন আওয়ামী লীগের তথাকথিত ঐক্যমতের সরকারের মন্ত্রী, আর বর্তমানে… থাক, নাইবা বললাম। শাহজাহান সিরাজ পল্টি দেন বিএনপিতে, আর সেখানে কোণঠাসা হয়ে এখন অবসরে। আর তাদের প্রকাশিত পত্রিকা “গণকন্ঠের” সম্পাদক কবি আল মাহমুদ এখন গোলাম আজমের চেয়েও বড় জামায়াতী সমর্থক। আর “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের” বুলি ফুটিয়ে “সমাজতন্ত্রী বাংলাদেশ” থিউরীর প্রবক্তা সিরাজুল আলম খান এখন ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকার বাসিন্দা।

কাজেই যখন তখন সবক দেয়ার অভ্যাস ছাড়ুন স্যার। পাবলিক কিন্তু আপনাদের ভালোমতোই চিনে গেছে…

লেখক: রাজেশ পাল
আইনজীবি, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।