দেবিদ্বার উপ-নির্বাচন: বিএনপির প্রার্থীকে জেতাতে মরিয়া সরকারদলীয় এমপি ফখরুল

0

সময় এখন ডেস্ক:

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার উপ-নির্বাচনে প্রকাশ্যে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সরকারদলীয় এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। এমনকি এমপির লোকজনের ভয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায়ও নামতে পারছেন না।

আওয়ামী লীগ নেতার বিএনপি প্রীতির কারণ হিসেবে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী তারেক মুন্সী আওয়ামী লীগের এমপি ফখরুলের আপন চাচা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বিশেষ দল এমপি ফখরুলের বিরুদ্ধে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগের তদন্ত করতে সরেজমিন কুমিল্লার দেবিদ্বারে যাচ্ছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গোয়েন্দা তালিকায় এমপি ফখরুলের নাম থাকায় তাকে নিয়ে বেশ বিব্রত আওয়ামী লীগ। এর মধ্যেই কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আবারো বিতর্কের জন্ম দেন এই এমপি। সর্বশেষ নিজের আপন চাচা- বিএনপি নেতা তারেক মুন্সীকে উপজেলা নির্বাচনে জেতানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন তিনি।

২৭ মে, ২০১৮ সালে এমপি ফখরুলের বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্টতা এবং মাদক ব্যবসা প্রসঙ্গে দৈনিক প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এমপি ফখরুলের বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় ইউনিয়ন কার্যালয় ভাঙচুর, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুর এবং অবমাননাসহ বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ নিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ৩ ডিসেম্বরে দেবিদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন (৮১) করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরে ওই আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। গত ১৭ জানুয়ারি শূন্য আসনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি এই উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে।

অভিযোগ রয়েছে, উপ-নির্বাচনের জন্য সাবেক এক জামায়াত নেতাকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করতে ব্যর্থ হন এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। তৃণমূল এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের দাবির মুখে কুমিল্লা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদকে দেবিদ্বার উপজেলায় নৌকার প্রার্থী ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। দলের এমন সিদ্ধান্ত মনঃপুত হয়নি এমপির। পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আপন চাচা তারেক মুন্সীকে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী করিয়ে আনেন তিনি।

জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক ত্যাগী নেতা অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতাকর্মীদের দলের পক্ষে মাঠে নামতে দিচ্ছেন না এমপি ফখরুল। নৌকার পক্ষে কোনো নির্বাচনী অফিস করতে দিচ্ছেন না। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কখনও নিজের বাড়িতে আবার কখনও নদীর ওপাড়ে বিশেষ একটি বাড়িতে ডেকে তার চাচা বিএনপির প্রার্থী তারেক মুন্সীকে ভোট দিতে বলছেন। ভোট না দিলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দিচ্ছেন এই এমপি, দাবি করেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার দাবি, এমপি ফখরুলের বিভিন্ন ধরণের অবৈধ ব্যবসা, প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর প্রধান সহযোগী থানার ওসি। নির্বাচনেও এমপির পক্ষে কাজ করছেন তিনি। কিছুদিন পূর্বে ওসিকে বাড়িতে ডেকে বৈঠক করেছেন এমপি। বৈঠকে চাচাকে জয়ী করার প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। ধানের শীষের পক্ষে আগাম ব্যালট কেটে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তিনি।

এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ নিয়ে ইতিপূর্বে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যাতে উঠে এসেছে তার সম্পর্কে অনেক তথ্য। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছিল- দেবীদ্বারের এমপি ফখরুলের নানান অপকর্মের খবর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ২০১৪ সালে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাতেও এমপি ফখরুল এবং তার চাচা বিএনপি নেতাকে প্রার্থী করার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে হংকং বিএনপির সভাপতি তারেক মুন্সীকে প্রার্থী করার জন্য ভাতিজা ফখরুলের (তৎকালীন স্বতন্ত্র এমপি) দৌড়ঝাঁপের কথা উঠে এসেছিল। এবারের উপ-নির্বাচনেও দেখা যাচ্ছে একই ঘটনা।

এদিকে এমপি ফখরুলের কারণেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হতে পারেন, এমন আশংকা প্রকাশ করে দেবিদ্বারের কয়েকজন্য আওয়ামী লীগ নেতা অভিযোগ করেন, হঠাৎ করেই এমপি ফখরুল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পান। তার আগে এলাকায় তাকে কেউ চিনতো না। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ অনেক পুরোন। ব্যবসায়ী এই নেতা বিএনপি ও জামায়াতের লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করেন সবসময়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তাকে জেতানোর জন্য কাজ করেছেন। কিন্ত এমপি হবার পর তিনি বদলে যান। ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাদের মূল্যায়ন তো দুরের কথা, উল্টো দলের বহু নেতা তার এবং তার নিজস্ব লোকজনের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার মতের বাইরে গেলে তিনি হত্যার হুমকি দেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠান।

উপজেলা নির্বাচনে আপন চাচাকে জেতাতে প্রকাশ্যে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানো এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করে রাখার ঘটনায় কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভপাতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মনোনয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদেরকে এমপি ফখরুলের কর্মকান্ড এবং দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়।

গুরুতর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দলের আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের ৫ সদস্যের একটি দল দু-একদিনের মধ্যেই দেবিদ্বার সফর করবেন। জেলা-উপজেলা পর্যয়ের নেতারা ছাড়াও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তদন্তকারীদের কাছে এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিবরণ দেবেন বলে জানা গেছে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।