পিপিই কী এবং কাদের জন্য প্রযোজ্য?

0

স্বাস্থ্য বার্তা ডেস্ক:

নভেল করোনা ভাইরাসকে চেনে না বা তার সম্পর্কে জানে না এই বিশ্বে এমন বোধকরি আর কেউ নেই। ভূমিকম্পের ভ’য়াবহতাকেও ছাড়িয়ে গেছে তার এই পৃথিবী কাঁপানো।

বাংলাদেশ এক ভ’য়াবহ, অ’স্থির এবং অ’নিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমরা যখন ঘরে বসে আছি, তখন সাহসী কিছু মানুষ করোনাকে উ’পেক্ষা করে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ল’ড়ছে। বাইরে আছে পুলিশের সদস্য, সেনাবাহিনীও। কিন্তু তারা আছে এই সমাজের কিছু অ’বাধ্য মানুষকে পথে আনার জন্য। যাদের জন্য আজ ভাইরাস কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে চলে গিয়ে জনজীবনকে এক প্রচণ্ড হুম’কির মুখে ফেলেছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এই সাহসী সৈনিকরা বাইরে।

চিকিত্সক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ান, ক্লিনাররা হলো সেসব মানুষ, যারা ঝুঁ’কি নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করছে এই করোনাযু’দ্ধে। আইসিইউর চিকিৎসক ও নার্সেরা রয়েছে মৃ’ত্যুঝুঁ’কিতে। এই বৈশ্বিক দু’র্যোগে আপনার অর্থবিত্ত, ক্ষমতা সব তুচ্ছ। আর কোনো এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স নেই, কোনো ক্রস বর্ডার চিকিৎসা নেই। সবার এ দেশের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হবে। নির্ভর করতে হবে যেমন স্বাস্থ্যসুবিধা আমাদের দেশ এযাবত্কাল তৈরি করে রেখেছে তার ওপর। অন্তত সে জন্য হলেও চিকিত্সকদের ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তারা না বাঁচলে আমাদের বাঁচাবে কে?

তাই পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) প্রথমেই দরকার তাদের জন্য, যারা সরাসরি রোগীর পরিচর্যা করেন। এ প্রয়োজন তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এবং অন্য রোগীদের নিরাপত্তার জন্য।

তবে কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা পেতে হলে পিপিইর আগে অনেক প্রতিরোধ রয়ে গেছে। আমরা যদি সচেতন হই, প্রত্যেকে যদি নিয়ম-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই তাহলে এই রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে। আপনার সহযোগিতা রক্ষা করবে আপনাকে এবং সঙ্গে আরো হাজার জনকে। কমিউনিটির সবার মঙ্গলের জন্য এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপ কমাবার জন্য ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সুপারিশ অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব এবং হাতের পরিচ্ছন্নতা মেনে চলুন।

সারা পৃথিবীতে চলছে পিপিই সং’কট। অগণিত মানুষ রোগী হয়ে যাচ্ছে। তাদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে অসংখ্য সেবাদানকারীর। এমতাবস্থায় পিপিইর অ’প্রয়োজনীয় ব্যবহার রো’ধে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন সুপারিশ করেছে Rational use of personal protective equipment for coronavirus disease 2019 (COVID-19).
সেই সুপারিশ অনুযায়ী কার কার পিপিই ব্যবহার করা দরকার সেটা লিখছি। তবে ব্যবহারের আগে একটু জেনে নিই পিপিই কী? পিপিই হলো অনেক জিনিসের সমন্বিত একটি বিশেষ বেশভূষা, যা পরিধেয় ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের সংক্র’মণ থেকে রক্ষা করে। সেই সমন্বিত জিনিসের অংশবিশেষই পিপিই।

জিনিসগুলো হলো— ১। গাউন, এটি শুধু ফুলহাতা গাউন হতে পারে বা ফুল কভার (কভার অল) গাউন হতে পারে, ২। ক্যাপ, ৩। গ্লাভস, ৪। ফেস শিল্ড, ৫। গগলস, ৬। ফেস মাস্ক ও ৭। শু কভার।

এই পূর্ণাঙ্গ সেট সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। মাস্কটি গুরুত্বপূর্ণ বলে এটি সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত বলি।

ফেস মাস্ক:

এটি দুই রকমের হয়। ১. মেডিক্যাল মাস্ক ও ২. রেসপিরেটর।

মেডিক্যাল মাস্ক: ব্যক্তির নাক ও মুখ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি নাকে-মুখে শক্ত হয়ে সেঁটে থাকে না, একটু ফাঁকা থাকে এবং যে ফাঁকা থাকে তাতে সব রকম কণা ও ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস চলাচল বন্ধ করতে পারে না।

ব্যবহার মাত্রা: শুধু একবারই ব্যবহারযোগ্য।

রেসপিরেটর: এটি একটি ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রবিশেষ, যা পরিধান করলে নাক-মুখ এমনভাবে ঢাকা থাকে, যে কোনো বায়ুবাহিত ক্ষ’তিকর জীবাণু এবং কণা প্রবেশ রো’ধ করতে পারে। এটি এমনভাবে মুখের সঙ্গে শক্ত হয়ে লেগে থাকে যে কোনো ফাঁকা থাকে না। এটিতে একটি ফিল্টার থাকে যা ৯৫ শতাংশ কণা ও সংক্রা’মক জীবাণু শোষণ বা ফিল্টার করতে পারে।

এন-৯৫ মাস্ক এমনই একটি মাস্ক। এটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে একটি সনদ দেওয়া হয়। এটির আকারের তারতম্য আছে। তাই যে পরিধান করবে তারও ঠিকভাবে সেঁটে থাকে কি না সেটা প্রথমে পরীক্ষা করে নিতে হয়।

ব্যবহার মাত্রা: এটিও পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়। তবে কোনো ছেঁড়া বা ফুটা না হলে এবং ফিল্টারের ক্ষমতা ন’ষ্ট না হলে ৮ ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে।

কোভিড-১৯ সংক্র’মণ রো’ধের জন্য কে কখন কী সুরক্ষা ব্যবস্থা নেবেন

১। স্বাস্থ্যকর্মী: চিকিৎসক, নার্স, তাদের সাহায্যকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী যারা আইসিইউতে কাজ করেন এবং যারা ওয়ার্ডে, বহির্বিভাগে, ট্রায়াজে কাজ করেন, ল্যাব টেকনোলজিস্ট যারা পরীক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ করেন এবং পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত, অ’স্থায়ী সঙ্গনিরো’ধ জায়গায়, স্ক্রিনিংয়ের জায়গায়, সর্বত্র তাদের সবারই পিপিই দরকার। তবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ধরণ ভিন্ন হবে সেটি তারা ভালো করে জানেন।

২। রোগীর দর্শনার্থী: যদিও দর্শন নিষি’দ্ধ, যদি কেউ নিতান্তই দেখতে চান, শুধু রোগীর কক্ষে প্রবেশ করবেন এবং স্পর্শ করবেন না। আর তা মেডিক্যাল মাস্ক, গাউন এবং গ্লাভস পরে।

৩। রোগী নিজে: শ্বাসক’ষ্ট থাকলে যানবাহনে চলাচলে, বহির্বিভাগে অপেক্ষমাণ অবস্থায়, ট্রায়াজে মেডিক্যাল মাস্ক পরবে। না সহ্য করতে পারলে অন্যের সঙ্গে কমপক্ষে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখবে। যদি শ্বাসক’ষ্ট না থাকে মাস্কের দরকার নেই, কমপক্ষে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখবে।

৪। অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার: যদি কোভিড রোগী বা সন্দেহজনক রোগী নিয়ে ড্রাইভিং করে এবং ড্রাইভারের সিটের সঙ্গে রোগীর জায়গার মধ্যে পার্টিশন থাকে তাহলে কমপক্ষে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখলেই চলবে। কিন্তু পার্টিশন না থাকলে মেডিক্যাল মাস্ক পরতে হবে। ড্রাইভার যদি রোগী উঠানো-নামানোতে সাহায্য করেন তাহলে তাকে মেডিক্যাল মাস্ক, গাউন, গ্লাভস, গগলস পরতে হবে।

৫। কিছু কর্মচারী: যেসব কর্মচারী রোগ শনাক্তের সঙ্গে জড়িত তাদের কমপক্ষে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখলেই চলবে। তবে রোগীর জ্বর এবং অন্য লক্ষণাদি থাকলে মেডিক্যাল মাস্ক ও গ্লাভস পরতে হবে।

৬। বাড়িতে রোগীর সেবাদানকারী: শুধু রুমে ঢুকল, কোনো সংস্পর্শ নেই, তাহলে শুধু মাস্ক পরবে। যদি সংস্পর্শ থাকে এবং মলমূত্র পরিষ্কার করে, তাহলে গ্লাভস, মেডিক্যাল মাস্ক এবং অ্যাপ্রন পরবে।

৭। প্রশাসনিক কর্মকর্তা: প্রশাসনিক কর্মকর্তা যদি চিকিৎসকও হন তাদের কোনো পিপিইর দরকার নেই। কারণ রোগীর সঙ্গে তাদের কোনো সংস্রব নেই।

এই করোনা সমস্যাকে আমরা বিশ্বযু’দ্ধ বললেও ভুল হবে না। যেখানে সারা পৃথিবীর মানুষ একদিকে আর অদৃশ্য ভাইরাসটি আরেক দিকে। উন্নত-অনুন্নত সব দেশ হিমশিম খাচ্ছে। আর এই যু’দ্ধের সম্মুখ সমরে আছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। যারা সরাসরি আক্রা’ন্ত রোগীকে নিয়ে বাঁচা-মরার যু’দ্ধ করেন। এই সৈনিকদের সারা বিশ্ব সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে যু’দ্ধক্ষেত্রে পাঠায়। তাদের যু’দ্ধকালীন ভাতা দেয়। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাদের বীমা বা ক্ষ’তিপূরণের ব্যবস্থা করে।

করোনার মতো একটি অতি উচ্চ সংক্রা’মক ব্যাধি, যা এখন প্যানডেমিক, তার স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রেরই নয়, জনগণেরও। কারণ একেকটি পূর্ণাঙ্গ সেটের দাম প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিদিন টানা ২৪ ঘণ্টা ডিউটিকালে ৩টি সেটের দরকার। এই জনগণের অংশ হিসেবে অনেক মহান সমাজকর্মী এরই মধ্যে এগিয়ে এসেছেন।

রাজনীতিবিদ গোলাম মওলা রনি চিকিৎসককে পিপিই কিনে পরতে বলেছেন; যেহেতু চিকিত্সক ১ হাজার ২০০ টাকা করে ভিজিট নেন। ভিজিট ১ হাজার ২০০ নিন বা ১ হাজার ৫০০ নিন সেটি তার প্রজ্ঞার দাম। আপনি যখন আইসিইউতে আসবেন তখন যে জ্ঞান এবং দক্ষতা দিয়ে তিনি আপনাকে পরিচর্যা করবেন সে জন্য তার একটা পারিশ্রমিক আছে। কিন্তু আপনার আইসিইউএর বিছানা ভাড়া থেকে শুরু করে আপনার জন্য যা ব্যবহার করা হবে তার পাই পাই খরচ আপনাকে দিতে হবে। পিপিই আপনার জন্যই চিকিত্সককে পরতে হচ্ছে। আপনি না দিলে চিকিত্সক আপনার কাছে যাবেন কেমন করে? আর এগুলো আপনাদের জন্য সরকারই বহন করছে। আপনার চিকিৎসার জন্য বিছানা যেমন সরকার দিচ্ছে তেমনি পিপিইও সরকারই দেবে। চিকিৎসক সরকারের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা। তিনি শুধু তার প্রজ্ঞা ও শ্রমই দেবেন। তা ১ হাজার ২০০ টাকা ভিজিটের চিকিৎসকই হোন আর মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতনের চিকিৎসকই হোন। কোথায় আপনারা বলবেন যেন প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে সরকারি জিনিসগুলো ঠিকমতো পৌঁছায়, তা না বলে তাদের নিজেদের কিনে নিতে বলছেন।

সাধারণ মানুষের জন্য পিপিই নয়। শুধু মাস্ক ব্যবহার করলে ক্ষ’তি নেই। তবে করোনা প্রতিরোধে কোনো উপকারেও লাগে না, যদি আপনি নিজে রোগী হন তাহলে মাস্ক ব্যবহার করুন ছড়ানো বন্ধ করার জন্য। স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই আপনারা ব্যবহার করে অ’পচয় করবেন না। মনে রাখবেন, পিপিইর অভাবে কোনো চিকিত্সক যদি আপনার অ’সুস্থতার সময় আপনার কাছে যেতে না পারেন তাকে দায়ী করতে পারবেন না। চিকিত্সককে বাঁচিয়ে রাখুন, আপনি বাঁচুন। আপনি যদি সুস্থ থাকেন, আপনার যদি একটি অ’ব্যবহৃত মাস্ক থাকে সেটা স্বাস্থ্যকর্মীদের দান করুন। সরকারের সঙ্গে আপনিও এগিয়ে আসুন দেশ ও দশের কল্যাণে।

লেখক: রাশিদা বেগম
পরিচিতি: অধ্যাপক ও ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ, চিফ কনসাল্ট্যান্ট, ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ট্রেজারার, ওবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলোজিক্যাল সোসাইটি, বাংলাদেশ বোর্ড মেম্বার, এশিয়া প্যাসিফিক ইনিশিয়েটিভ অ্যান্ড রিপ্রোডাকশন

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।