বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা হ’ত্যাকাণ্ডে মাজেদের স্টেটমেন্টের ভিডিও ধারণ || ইতিহাসের অজানা অধ্যায়

0

সময় এখন ডেস্ক:

সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হ’ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খু’নি ক্যাপ্টেন (বরখা’স্ত) আবদুল মাজেদ রায় কার্যকরের আগে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। দীর্ঘ সময় গোয়েন্দাদের নিবিড় জিজ্ঞাসা’বাদে বেরিয়ে এসেছে ঘটনার আদ্যোপান্তসহ অনেক অজানা তথ্য। যেখানে এমন অনেক বিষয় আছে, যা আগে কোনোদিন কারও জানা ছিল না।

তাকে জিজ্ঞাসা’বাদের পুরো বক্তব্য অডিও-ভিডিও আকারে ধারণ করা হয়েছে; যার ওপর ভিত্তি করে বিশেষ ডকুমেন্টারি তৈরি করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে প্রথম থেকে যুক্ত থাকা সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা স্টেটমেন্ট নিয়ে বই লেখার কাজেও হাত দিয়েছেন।

এছাড়া মাজেদের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলমান রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রটি জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হলে এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে; যা হবে ইতিহাসের বড় একটি দলিল। ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়কে সবিস্তারে জানানো হয়েছে।

সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসা’বাদে মাজেদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হ’ত্যার পরিকল্পনা থেকে পরবর্তী সময়গুলোর ধারাবাহিক বর্ণনা দেন মাজেদ। এমনকি পলাতক জীবনে বাংলাদেশ থেকে কারা কীভাবে তাকে সহায়তা দেয়াসহ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, তাদের নাম-পরিচয়ও তিনি স্বীকার করেন। তবে মাজেদের স্বীকারো’ক্তি ও জিজ্ঞাসা’বাদ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অতি গোপনীয় এবং সেনসেটিভ হওয়ায় এখনই তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে না। অধিকতর যাচাই-বাছাইসহ আরও কিছু কাজ সম্পন্ন করার পর যথাসময়ে তা প্রকাশ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ১৫ আগস্টের সেই মিশন বাস্তবায়নের বহু আগে থেকেই আবদুল মাজেদ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। সেরনিয়াবাতের ছোট ছেলে নাসেরের সঙ্গে বাড়ির লনে নিয়মিত ব্যাডমিন্টন খেলতেন। এ কারণে মাস্টারমাইন্ডরা মাজেদকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি রেকি করার বিশেষ দায়িত্ব দেয়। ব্যাডমিন্টন খেলার ছলে তিনি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যসহ বাড়ির লোকজনের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতেন।

সূত্র জানায়, মাজেদ মূলত ভারতে আত্ম’গোপনে থাকলেও বছরের বড় একটা সময় থাকতেন ইউরোপ-আমেরিকায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যে ছেলের বাড়িতে তার দীর্ঘ সময় কাটে। আমেরিকায় বসবাসকারী মাজেদের ছেলের নাম রিফাত মোরশেদ চৌধুরী। তিনি সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। রিফাত চৌধুরী আমেরিকা যাওয়ার আগে বাংলাদেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (ইইই) স্নাতক ডিগ্রি নেন। কিন্তু বুয়েটে পড়াকালীন কেউই তার পিতার পরিচয় জানতে পারেননি। জার্মানি, ফ্রান্স ও লিবিয়াতেও তিনি আত্ম’গোপনে ছিলেন দীর্ঘদিন।

মাজেদের ৪ মেয়ের মধ্যে একজন পেশায় চিকিৎসক। তিনি বর্তমানে ঢাকাতেই থাকেন। চাকরি করেন মিরপুরে একটি বেসরকারি সংস্থায়। তার স্বামীও ডাক্তার। কর্মরত আছেন মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে। মাজেদের ডাক্তার জামাতার সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। এ সময় তিনি বলেন, প্রেম করে বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রীর বাবা যে বঙ্গবন্ধুর খু’নি ছিলেন তা তিনি আগে জানতেন না। পরে যখন জেনেছেন, তখন শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছি’ন্ন করেন।

মাজেদ শুধু বঙ্গবন্ধু হ’ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নয়, ৩ নভেম্বর চার নেতা হ’ত্যার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। এ দুটি ঘটনায় তিনি সঙ্গী হিসেবে পান আরেক পলাতক খু’নি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনকে। বিদেশে আত্ম’গোপনে থাকার সময় রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের সঙ্গেও মাজেদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। মাজেদের তথ্যের ভিত্তিতে মোসলেহ উদ্দিনের খোঁজে ব্যাপক অনুসন্ধান তৎপরতা চালাচ্ছেন গোয়েন্দারা। ইতোমধ্যে মোসলেহ উদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসা’বাদও করা হয়েছে। রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে সাজিদুল ইসলাম খান নরসিংদীতে বসবাস করেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে তার বাবার কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। তিনি বেঁচে আছেন কি না তাও তারা জানেন না।

মাজেদের সন্ধান ও পরবর্তী গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বিষয়টির সঙ্গে শুরু থেকে সংশ্লিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের জুন-জুলাইয়ের দিকে ইউরোপের একটি দেশে তার (মাজেদ) অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর আমেরিকায় ছেলের বাড়িতে মাজেদের অবস্থানের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা। মূলত তখন থেকেই তার ওপর নিবিড় নজরদারি শুরু হয়। একপর্যায়ে কলকাতায় তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরপরই তাকে গ্রেপ্তারের জন্য কঠোর গোপনীয়তায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু হয়। ভারতের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরই কলকাতায় হাজির হয় বাংলাদেশের একটি চৌকস গোয়েন্দা প্রতিনিধি দল। তারাই মাজেদকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

সূত্র বলছে, মাজেদের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসা’বাদ নিয়ে বই লেখা শেষ হলেই পুরো বিষয়টি প্রকাশ করা হবে। তখন বঙ্গবন্ধু হ’ত্যাকাণ্ডের অনেক অজানা চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা যাবে। মুখোশ উন্মোচিত হবে ইতিহাসের ব’র্বরতম হ’ত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ডদের।

Spread the love
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।