করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজি

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা স্ট্র্যাটেজি বা মডেল ফলো করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একেকটি মডেলকে একেক রকম উপযোগীতার কথা বলছে। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর মডেল মনে করা হচ্ছে চীনের স্ট্র্যাটেজিকে। চীন সামাজিক বিচ্ছি’ন্নতাকে কঠোরভাবে অনুসরণ করে করোনার সংক্র’মণ ঠেকিয়েছে। উহান প্রদেশকে লকডাউন করে করোনাকে চীনজুড়ে বিস্তৃত হতে দেয়নি। এবং এই মডেলকেই অনেকগুলো দেশ অনুসরণের চেষ্টা করছে।

করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে আরেকটি মডেল তৈরি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়া সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ওপর জোর না দিয়ে করোনা পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। যত সন্দেহভাজন রোগী পেয়েছে তাদেরকে পরীক্ষা করে সবার থেকে আলাদা করেছে। এখন সামাজিক সংক্র’মণ যত কমেছে, রোগ ততই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে সিঙ্গাপুরও।

তবে বাংলাদেশের জন্য এই দুটি স্ট্র্যাটেজি কার্যকরভাবে অনুসরণ করা সম্ভব নয় বিভিন্ন বাস্তবতার কারণেই। কারণ-

প্রথমত, লকডাউন করে রাখার বিধিনিষে’ধ মানুষ মানছে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত। তারা দিন আনে দিন খায়। কাজেই তাদের জন্য ঘরে আটকে থাকা যেমন অ’সম্ভব, তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সন্ধানে তাদের বের হতেই হয়।

দ্বিতীয়ত, সরকারি যে খাদ্যসামগ্রী সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেটিও বাংলাদেশে শতভাগ নিরবিচ্ছি’ন্নভাবে সরবরাহ করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই বাস্তবতায় কমপ্লিট লকডাউন বা পুরোপুরি সবকিছু থেকে বিচ্ছি’ন্ন হয়ে ঘরব’ন্দি হওয়া, সেটা বাংলাদেশের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। তারপরেও বাংলাদেশ ১ মাসের জন্য সরকারি ছুটি এবং লকডাউনের ব্যবস্থা করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শতকরা ৫০-৬০ ভাগ সামাজিক বিচ্ছি’ন্নতা কার্যকর হয়েছে।

তৃতীয়ত, ব্যাপক পরীক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আক্রা’ন্তদের আলাদা করার যে প্রক্রিয়া দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর অনুসরণ করেছে, সেই পদ্ধতিও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। কারণ আমাদের পরীক্ষার সীমাব’দ্ধতা রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা সর্বোচ্চ ১১শ’ এর কিছু বেশি পরীক্ষা করতে পেরেছি। আর এ কারণেই বাংলাদেশের চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করছেন, দেশে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ’ মডেল তৈরি করা। এই মডেলের কিছু রূপকল্পও এখন পাওয়া যাচ্ছে।

গত ২৬ মার্চ থেকে যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হয়েছে, সেই ছুটির মধ্যে দিয়েই আমরা দেখছি যে বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব বাস্তবতা এবং সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে একটি কৌশল গ্রহণ করেছে। এই কৌশলের আবার ৫টি দিক রয়েছে।

প্রথমত, সামাজিক সংক্র’মণের বিস্তার বন্ধ করা হচ্ছে। দেশের যেখানে যেখানে সামাজিক সংক্র’মণ হচ্ছে, যেখানে সংক্র’মিত রোগী পাওয়া যাচ্ছে, সেই রোগীকে চিহ্নিত করে ওই এলাকা লকডাউন করে দেওয়া হচ্ছে। এভাবেই সামাজিক সংক্র’মণ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক সংক্র’মণ পুরো দেশ বা এলাকার মধ্যে সংক্র’মিত হচ্ছে না। ঢালাওভাবে লকডাউন না করে বিশেষ বিশেষ এলাকা অর্থাৎ ক্লাষ্টারগুলোকে চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ।

দ্বিতীয়ত, মৃদু সংক্র’মিতদের ঘরেই চিকিৎসা। বাংলাদেশ হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার বদলে যারা মৃদু সংক্র’মণে আক্রা’ন্ত, যেমন সামান্য জ্বর, সর্দি হলে তাদের ঘরেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সফল হয়েছে। দেখা গেছে যে, ৯০ ভাগের বেশি রোগীই মৃদু সংক্র’মণের শি’কার হয় এবং তারা ২/৩ সপ্তাহের মধ্যে আপনা-আপনিই সুস্থ হয়ে যায়। এজন্যই মৃদু সংক্র’মিতদের ঘরেই চিকিৎসা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসাকে নিরুৎসাহিত করা। যদিও সরকার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার পরিধি বাড়াচ্ছে। আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর বাড়ানোসহ করোনা চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন উপকরণে সজ্জিত করে হাসপাতালগুলোর পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। তবুও হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ সরকার তার সীমাব’দ্ধতাগুলোর কথা জানে। হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা নিতে গিয়ে সংক্র’মন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

চতুর্থত, সচেতনতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেনের মতো দেশগুলো যখন হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েছে, তখন তারা আর এই পথে হাঁটছে না। তারা সচেতনতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের পদ্ধতিও হচ্ছে সচেতনতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখা, পরিচ্ছন্ন জীবনাচার, সবসময় মাস্ক পরাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ইতিবাচক ফলও বাংলাদেশ পেতে শুরু করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা নিজেই সচেতনতার জন্য হাঁচি-কাশি দেওয়ার রীতি, নিয়মিত হাত ধোয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করার মতো বিষয়গুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সারা দেশব্যাপী পরীক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। করোনা রোগীদের সবার আগে চিহ্নিত করতে হবে। এ কারণেই সারা দেশব্যাপী করোনা পরীক্ষার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দিনে অন্তত যে এক হাজার পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তার ফলে করোনা রোগীরা চিহ্নিত হচ্ছে। তাদের উপসর্গ এবং রোগের মাত্রা দেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা এবং সীমাব’দ্ধতাকে মাথায় রেখে যে এই ৫ পদ্ধতি অনুসরণ করে চিকিৎসা করা হচ্ছে, তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা। তবে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ঠিক কোনদিকে যাবে তার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।