বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

0

ফিচার ডেস্ক:

সমুদ্রের তীর ঘেঁষে সবুজ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ফ্রান্সের একটি শহর। নাম ‘তুলন’। ছোটখাটো, ছিমছাম এই তুলন শহরটি বিখ্যাত মূলত তার বন্দরের জন্য। বহু আগে থেকেই ফ্রেঞ্চ নেভী এই তুলন শহরে গড়ে তুলেছিল একটি শক্তি নৌঘাঁটি। ২য় বিশ্বযু’দ্ধের সময় জার্মানি ফ্রান্স দখলের পর এই নৌঘাঁটির আরো উন্নতি ঘটিয়ে শক্ত সাবমেরিন ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলে।

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। তুলনের এই নৌঘাঁটিতে অবস্থান করছে একটি পাকিস্থানি সাবমেরিন, নাম- ‘পিএনএস ম্যাংগ্রো। সামরিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফ্রান্সের কাছ থেকে পাকিস্থান ৩টি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ কেনে। দুটো আগেই পৌঁছে গেলেও পিএনএস ম্যাংগ্রো এবং তার ৫৮ জন ক্রু অপেক্ষা করছে এই সাবমেরিন নিয়ে পাকিস্থান ফিরে যাবার উদ্দেশ্যে।

পাকিস্থান যাত্রার কয়েকদিন আগে ২৬ মার্চ হঠাৎ সাবমেরিনের ক্রুরা নিয়মিত বিবিসি শোনার সময় পুরো সাবমেরিন জুড়ে নেমে আসে পিনপতন নিস্ত’ব্ধতা। সংবাদে বলা হয় পাকিস্থানী বাহিনী ঝাঁ’পিয়ে পড়েছে নির’স্ত্র বাঙালি জনগণের উপর। সাবমেরিনের ৫৮ জন ক্রুর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি। তাদের মধ্যে জেগে ওঠে দেশের প্রতি মমত্ববোধ। সেই ১৩ জনের মধ্যে ৯ জন বসেন গোপন মিটিংয়ে। সিদ্ধান্ত নেন আর নয় এই পশুদের সাথে থাকা, যোগ দিতে হবে আমাদের মুক্তির সংগ্রামে। সুদূর ফ্রান্সে বসেই তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন দেশ-মাতৃকার তরে জীবন বিলিয়ে দিতে।

তারপর? সে এক লম্বা ইতিহাস। প্রায় দীর্ঘ ২ সপ্তাহ পুরো ইউরোপের ফ্রান্স, ইটালি, জেনেভা পুলিশ এবং পাকিস্থানী স্পাইদের সাথে লুকোচুরি করে এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে, ছদ্মবেশে ঘুরে ৯ এপ্রিল ১৯৭১, এই ৯ জন থেকে ৮ জন নৌসেনা এসে পৌঁছান ভারতে।

আমাদের মুক্তিযু’দ্ধের জন্য এই ঘটনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নৌসেনাদের পালিয়ে আসার ঘটনা আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায় শিরোনাম তোলে এবং বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে আমাদের সহায়তা করে। সবচেয়ে চমকপ্রদ হল এই ৮ জন নৌসেনার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গড়ে উঠে আমাদের ৩শ জন নৌ-কমান্ডোর একটি দুর্ধর্ষ বাহিনী।

এই ৮ জন দেশপ্রেমিক সেনার পরিচয় হল:

১. মোঃ রহমতউল্লাহ বীর প্রতীক, ২. মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন, ৩. মোঃ শেখ আমানউল্লাহ বীর বিক্রম, ৪. মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী (বীর উত্তম এবং বীর বিক্রম), ৫. মোঃ আহসানউল্লাহ বীর প্রতীক, ৬. শহীদ মোঃ আবদুর রকিব মিয়া বীর বিক্রম, ৭. মো আবদুর রহমান আবেদ বীর বিক্রম এবং ৮. মোঃ বদিউল আলম বীর উত্তম।

নামের পাশে এত অলংকরণ দেখেই নিশ্চয় বুঝতে পারছেন দেশের জন্য শুধু তারা জীবন বিপ’ন্ন করে পালিয়েই আসেননি দেশে এসে আমাদের মুক্তিযু’দ্ধে রেখেছিলেন অ’সমান্য অবদান।

সালাম জানাই এই বীর নৌসেনাদের যাদের অসীম সাহসিকতায় আজ মুক্ত স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক আমরা।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে লিমপেট মাইন বুকে নিয়ে আক্র’মনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আমাদের নৌসেনারা।

© মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো

Spread the love
  • 352
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    352
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।