শিশুরা মাঠে খেলুক- অভিভাবকরাই চান না!

0

ফিচার ডেস্ক:

শিশুদের সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অপরিহার্য। কিন্তু সমকালীন বাস্তবতায় সেই সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। যে বিদ্যালয়ে তারা পড়াশোনা করছে সেখানেই নেই খেলার মাঠ। আবার অভিভাবকরাও চান না পড়াশোনা বাদ দিয়ে শিশুরা খেলাধুলায় মেতে উঠুক। ফলে এসব শিশুরা পায় না মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। বঞ্চিত হয় শরীরচর্চার সুযোগ থেকেও।

চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্র আরেফিন হক (১২)। স্কুলে আসা যাওয়া আর বাসায় বিরামহীন পড়াশোনার মধ্যেই আপন ভুবন। খেলাধুলায় আগ্রহ নেই কোমলমতি এ শিক্ষার্থীর।

কিন্তু কেন- জানতে চাইলে আরেফিনের উত্তর- বাবা-মা পড়াশোনাতেই জোর দিতে বলেছেন। তারা চান না প্রতিবেশী শিশু-কিশোরদের সঙ্গে খেলে সময় ন-ষ্ট করি। তাছাড়া বাইরে খেলার কোনো পরিবেশও নেই। ফলে অবসর সময়ে স্মার্টফোনে গেমস খেলি। কম্পিউটারে গান শুনি। এভাবেই সময় কেটে যায়।

বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলার নাম ওরা পড়েছে কেবল পাঠ্যবইয়ে। কিন্তু বাস্তবে খেলাগুলো যেমন দেখা হয়নি তেমনি কখনো সমবয়সীদের সঙ্গে মেতে ওঠারও সুযোগ হয়নি।

একই বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্র রাসেল, দেবজিৎ ও মিজান। মাঠের খেলায় অভ্যস্ত নয় এ শিশুরাও। সকালে স্কুল শেষে বিকেলে বাসায় ফেরা। এরপর প্রাইভেট নয়তো কোচিং। সঙ্গে হোমওয়ার্কতো আছেই। আনন্দহীন যান্ত্রিক জীবন। শৈশবের স্বাভাবিক উচ্ছলতায় মেতে উঠতে ইচ্ছে করে না? প্রশ্ন শুনে ৩ কোমলমতির চোখ যেন ছানাবড়া! তাদের ভাষ্য- জীবনতো এটাই। এমন রুটিনই শিখিয়েছেন বাবা-মা।

এদের মতোই ছোট্ট খোপে বেড়ে উঠছে দেশের অধিকাংশ কোমলমতি শিক্ষার্থী। নাসিরাবাদ স্কুলে এক সময় বড় একটা খেলার মাঠ ছিল। এক সময় চট্টগ্রামের বড় বড় ফুটবল, ক্রিকেট টুর্ণামেন্টগুলো হতো সেখানে। কিন্তু এখন মসজিদসহ নানা স্থাপনার কারনে মাঠের আকার হয়ে গেছে একটুখানি। ওপরের ক্লাসের ছেলেরা খেললে ছোটরা আর জায়গা পায় না। নগরীর অনেক বিদ্যালয়ে তো খেলার মাঠই নেই।

খেলাধুলার প্রতি বীত-শ্রদ্ধ হতে হতে এখন আর এসব নিয়ে তারা ভাবে না, এমনকি বাসার সামনে খোলা জায়গাতেও ছুটোছুটির ইচ্ছে নেই। খেলাধুলা না থাকায় শরীরচর্চাও হচ্ছে না। অভিভাবকদের কঠিন বারণের মুখেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে শৈশব জীবন। তাদের এমন অ-সচেনতার কারণে শিশু-কিশোরদের আচরণেও নেতি-বাচক প্রভাব পড়ছে। মূল্য-বোধের অভাব থাকায় ভবিষ্যত জীবনে মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। অথচ একজন শিশুর দেহ-মন গঠনে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ।

দেখা গেছে, নগরীর অধিকাংশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নেই। এক সময় খেলার মাঠ ছিল এখন সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক ভবন। আর এ ভবনেই দিব্যি মুরগির খোপের মতো ছোট্ট পরিসরে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সাপ্তাহিক ছুটি বাদে ১ মাসের পুরো সময়ই ক্লাসরুমেই সময় কাটাতে হয় শিক্ষার্থীদের। ক্রীড়াচর্চার সুযোগ না থাকায় তাদের শারীরিক, মানসিক বিকাশ বাধা পায়।

বহুতল ভবনে গড়ে উঠেছে স্কুলগুলো। গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ নেই- এ নিয়ে শিক্ষক অভিভাবক এমনকি নগর পরিকল্পনাবিদদেরও কোনো চিন্তা নেই। শিশুদের প্রতিদিনের জীবন থেকে খেলাধুলা শব্দটি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।

চকবাজার এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মইনুল হোসেন বলে, আমরা এখানে আবাসিক থাকি। গ্রামে গিয়ে আমরা খেলি। প্রতিবার ছুটি শেষে ফেরার সময় অভিভাবকরাই বলে দেন শুধু পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতে। তাই শিক্ষকরাও খেলাধুলা করতে দেয় না। আর একাডেমিক পড়াশোনার চাপে খেলার সময়ও নেই।

খেলাধুলার মাধ্যমে একজন শিশু শৈশব থেকেই সৃজনশীল হয়ে উঠে বলে মন্তব্য করেন সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবু তালেব। তিনি বলেন, খেলাধুলা শারীরিক সক্ষমতা প্রমাণের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আচরণ ও বন্ধু তৈরি করতে শেখায় খেলাধুলা। কিন্তু অভিভাবকরা নিজ শিশুর খেলাধুলায় গুরুত্ব না দেওয়ায় তারা আত্ম-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।

অবশ্য সিলভিয়া নাসরিন নামে এক অভিভাবক বলেন, এটা ঠিক, ক্লাসে শিক্ষক আসার আগে কিছুটা হৈ-হুল্লোড় করা ছাড়া শিশুরা খেলায় মেতে ওঠার সময় পায় না। ঘরের বাইরের পরিবেশও ভালো না। বাসার সামনে খোলা জায়গা থাকলেও সেখানে মা-দকাসক্ত বা ব-খাটেরা আড্ডা দেয়। ফলে ভয় থেকেই কোন শিক্ষার্থীকেই বাইরে খেলতে দেন না অভিভাবকরা।

মোজাম্মেল হোসেন নামে আরেক অভিভাবক বলেন, নগরীর স্কুলের যে অবস্থা বাচ্চাদের ক্লাসে দিয়ে অভিভাবকদের রাস্তায় ঘুরে ফিরে সময় কাটাতে হয়। বেশিরভাগ স্কুলের ভেতর বা মাঠে বসার জায়গা নেই। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই অনেক শিশুদের খেলাধুলার অভিজ্ঞতা।

শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে জামাল উদ্দিন নামে এক অভিভাবক বলেন, আমাদের শৈশব স্মৃতিতে রয়েছে স্কুলপ্রাঙ্গণে খেলার আনন্দ। স্কুলের বিশাল মাঠগুলোতে বিরতির সময়, ছাত্র-ছাত্রীদের দৌড়োদৌড়ি, খেলাধুলা ছিল ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ যেমন দায়ী তেমনি দায়ী আমাদের সমকালীন বাস্তবতাও। খেলতে গিয়ে সন্তানের ব-খাটেদের সঙ্গে মেশার ভয়ে তটস্থ থাকেন এখানকার অভিভাবকরা।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।