ডিআইজি মিজানকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না- দুদককে আপিল বিভাগের প্রশ্ন

0

সময় এখন ডেস্ক:

পুলিশের সেই বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমান এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেন- এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগ। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের কাছে জানতে চেয়েছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগ।

আজ রবিবার আপিল বিভাগে দুর্নীতির একটি মামলার শুনানিতে দুদকের আইনজীবীকে এ প্রশ্ন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ডিআইজি মিজানের ঘটনা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক’।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, ‘ডিআইজি মিজানকে কেন এখনও গ্রেপ্তার করছেন না? সে কি দুদকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী?’

অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় গত বছরের ২৫ এপ্রিল ডিআইজি মিজানকে তলব করে দুদক। তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ, তিনি ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ২৫ বছর বয়সী এক নারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিয়ে করেন। এছাড়া একই বছরের ডিসেম্বরে অস্ত্রের মুখে এক টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ পাঠককেও তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি দুদকের এক পরিচালকের সাথে ঘুষ লেনদেনের বিষয়েও আলোচনায় ডিআইজি মিজান। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা বলে বেড়াচ্ছেন ডিআইজি মিজান। টিভি চ্যানেল বা বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে আইনবিরুদ্ধ কাজের কথা স্বীকার করার পরেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, বারবার তাকে কেন এভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

হয়রানির আশঙ্কায় ডিআইজি মিজানের সেই স্ত্রী

পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান যে নারীকে পিস্তলের ভয় দেখিয়ে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, সেই নারী আরও হয়রানি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এই শঙ্কার কথা জানান তিনি।

ওই নারী গত ৭ জুন তার বিয়ের কাবিননামার আংশিক ছবি পোস্ট করেন। সেই পোস্টে তিনি লেখেন, তার জন্য কি কম হয়রানি হলাম! সামনে হয়তো আরও বাকি আছে। প্রবলেম নাই। আই এম রেডি টু ফেস ইট নাও।

ওই নারী এখন নিজেকে অনেকটাই আড়াল করে রেখেছেন। তিনি কোথায় আছেন এখন কেউ জানে না। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করছেন না। যে ফেসবুক আইডিটি তিনি ব্যবহার করেন, সেখানে ইনবক্সে ম্যাসেজ করা হলেও তিনি সাড়া দেন না।

২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় ডিআইজি মিজান ওই নারীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিয়ে করেন বলে অভিযোগ আছে। এ নিয়ে সে সময় ব্যাপক তোলপাড় হলেও পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে ওই বছরের ডিসেম্বরের শেষে ডিআইজি মিজানকে ঢাকা মহানগর পুলিশ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়, সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। পুলিশের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছিল একটি তদন্ত কমিটি। সে কমিটি তদন্ত করে মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগের প্রমাণ পায়। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সেই প্রতিবেদন জমাও পড়ে। কিন্তু মিজানের বিরুদ্ধে এর পর আর কোনো ব্যবস্থাই আর নেয়া হয়নি।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ডিআইজি মিজানের আরেক কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নারী সংবাদ পাঠিকার সঙ্গে টেলিফোনালাপ ফাঁস হয়। ডিআইজি ওই নারী এবং তার স্বামীকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন। ওই সংবাদ পাঠিকা সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু তার কোনো তদন্তই হয়নি।

এরপর ওই নারী জানতে পারেন, তার নামে ফেসবুক পেজ খুলে অশালীন ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি তখন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করেন। কিন্তু তারও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এর মধ্যে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে নামে দুদক। আর তদন্ত কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা গণমাধ্যমে বলে বেড়াচ্ছেন ডিআইজি। আইনবিরুদ্ধ কাজের কথা স্বীকার করার পরেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, বারবার তাকে কেন এভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

যেভাবে গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হন ডিআইজি মিজান:

তৎকালীন গণমাধ্যমে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, চাকরির জন্য চেষ্টা করতে গিয়ে এক বান্ধবীর মাধ্যমে সে সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় ওই নারীর। এর মধ্যে কানাডা প্রবাসী একজনের সঙ্গে তার বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক। কিন্তু সব জানতে পেরে ডিআইজি মিজান বাগড়া দেন। নানা ঘটনার পর ২০১৭ সালের ১৪ জুলাই পান্থপথের বাসা থেকে কৌশলে গাড়িতে তুলে জোরপূর্বক ৩০০ ফুট এলাকায় নিয়ে যান।

সেখানে নিয়ে মারধর করে রাতে ওই নারীকে তার বেইলি রোডের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে সুস্থ করার কথা বলে ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করেন। এ সময় সেখানে ডিজাইজির এক ডাক্তার বন্ধুও উপস্থিত ছিলেন। পরদিন দুপুর ১২টার দিকে ওই নারী ঘুম থেকে জেগে দেখেন তার গায়ে মিজানের স্লিপিং ড্রেস এবং তিনি তার বেডরুমে। এক পর্যায়ে তিনি আত্মহত্যা করবেন বলে দৌড়ে রান্নাঘর খুঁজতে থাকেন। তখন তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে মিজানের দুজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী ও গাড়িচালক।

এ সময় খবর পেয়ে ডিএমপি কার্যালয় থেকে ছুটে আসেন মিজানুর রহমান। ওই নারীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। আশ্বাস দেন তাকে দ্রুত তার বাসায় রেখে আসবেন। ওই নারীর প্রশ্নের মুখে তিনি আগের রাতের ঘটনায় ক্ষমা চান। কিন্তু তাকে শান্ত করতে না পেরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলেন। এভাবে ১৪ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত ৩ দিন মেয়েটিকে বাসায় আটকে রাখেন তিনি।

ওই মেয়ের বাবা বেঁচে নেই। খবর দেওয়া হলে বগুড়া থেকে তার মা ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় ডিআইজির বেইলি রোডের বাসায় উপস্থিত হন। মেয়েকে কেন আটকে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে ডিআইজি মিজান ধমক দিয়ে তাকে বসিয়ে রাখেন। এরপর বলেন, এখান থেকে মুক্তির একটাই পথ আছে। তা হলো আপনার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে।

মা-মেয়ে কেউ রাজি না হলে টেবিলে পিস্তল রেখে মা-মেয়েকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে ৫০ লাখ টাকা কাবিনে মেয়েকে বিয়ে দিতে মাকে বাধ্য করা হয়। বিয়ে পড়ানোর জন্য মগবাজার কাজী অফিসের কাজীকে ডেকে আনা হয়। বিয়েতে উকিল বাবা হন ডিআইজি ব্যক্তিগত গাড়িচালক গিয়াসউদ্দিন। সাক্ষী করা হয় দেহরক্ষী জাহাঙ্গীরকে। বিয়ের পর ওই রাতে মা-মেয়েকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরে লালমাটিয়ায় ভাড়া ফ্ল্যাটে গোপনে ২য় সংসার শুরু করেন ডিআইজি মিজান। ওই ফ্ল্যাটের নিচে সাদা পোশাকে পুলিশের ২ সদস্যকে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা হয়। সেখানে ওই নারীর জীবন কাটে অনেকটা বন্দি অবস্থায়। অনেক চেষ্টা করেও নিজের ভাইকে ফ্ল্যাটে রাখার অনুমতি পাননি।

এভাবেই কেটে যায় ৪ মাস। এক দিন তিনি মিজানকে স্বামী পরিচয় দিয়ে পুলিশের পোশাকে থাকা একটি ছবি ফেসবুকে আপ্লোড করেন। এতে ক্ষিপ্ত হন মিজানুর রহমান। ফেসবুক থেকে দ্রুত ছবিটি সরিয়ে ফেলতে তিনি লালমাটিয়ার বাসায় ছুটে আসেন।

সেপ্টেম্বরের এ ঘটনার পর দুজনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ওই নারী মিজানের স্ত্রী পরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অটল থাকেন। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় গোপন রেখে বাসা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলা করা হয়। এ মামলায় ওই নারীকে ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তার বিরুদ্ধে ভুয়া কাবিন করার অভিযোগ এনে আরও একটি মামলা করা হয়।

আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভুয়া কাবিননামার মামলাটি অনুসন্ধান করতে গেলে একে একে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার বিস্তারিত বেরিয়ে আসে। এরপর ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে মিজান জামিনের ব্যবস্থা করেন। ২১ দিন কারাভোগের পর ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর জামিন পান। কিন্তু গণমাধ্যমে খবরটি ফাঁস হয়ে যায়।

Spread the love
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।