সাক্ষাৎকার: জন্মদিনে মুখোমুখি সাহিত্যিক সাইফুল বাতেন টিটোর সাথে

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

আজ ১২ জুন, বিদগ্ধ সাহিত্যিক ও মুক্তমনা লেখক সাইফুল বাতের টিটোর জন্মদিন। এ উপলক্ষ্যে লেখকের সাথে এক মুখোমুখি আড্ডায় আছেন সময় এখন ডটকম এর জ্যোষ্ঠ প্রতিবেদক হেকিম আলী খামারী। লেখকের সাথে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও।

নিজের সম্পর্কে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। লেখালেখির শুরুটা কীভাবে?

অনেক ছোট বেলায় যখন গল্পের বই পড়তাম তখন মনে হতো আমিও এমন লিখতে পারি। খাতা কলম নিয়ে বসে চেষ্টাও করতাম। কিন্তু কোনদিন ছাপাতে ইচ্ছে করেনি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পড়ার পরিমান বাড়লো। মাঝে মধ্যে নিজের লেখা পড়ে হাসতাম, কাউকে দেখাতাম না। কিন্তু লেখা থামালাম না। ক্লাস নাইনে থাকতেই একটা রহস্য উপন্যাসের ৫০% লিখে ফেললাম। কলেজে উঠে সেই লেখা পড়ে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেলো। কিন্তু লেখা কখনও থামাইনি।

অনেকে তো কবিতা দিয়ে শুরু করেন। আপনি সেদিকে যাননি?

ছোট ছোট কবিতাও লিখেছিলাম কয়েকটা। প্রথম লেখা ছাপা হলো ‘মঠবাড়িয়া সমাচার’ নামে একটি লোকাল সাপ্তাহিক পত্রিকায়। সম্ভবত ১৯৯৯ সালে। নিজের নাম, লেখা কবিতা ছাপার অক্ষরে দেখার ঐ আনন্দ ছিলো প্রেমিকার সাথে প্রথম সাক্ষাতের মতো আনন্দের। লেখার উৎসাহ বেড়ে গেলো। কিন্তু কোথাও ছাপতে দেয়ার কথা তেমন করে ভাবিনি কখনও।

ছোট গল্প তো আপনার পছন্দের ঘরানা। শুরুটা কখন?

সম্ভবত ২০০৫/০৬ এ আর্মিতে থাকাকালিন ‘অশ্রু’ নামে একটা ছোট গল্প লিখলাম। এক সহকর্মীকে দিলাম টাইপ করতে। সে টাইপ করে প্রিন্ট করে আমার কাছে নিয়ে এসে বলল লেখাটা যায়যায় দিনে পাঠাতে। আমি গাঁইগুই করতে লাগলাম। কেমন, কী হয়েছে, ওসব সম্পাদক পড়ে বিরক্ত হবেন হয়তো! লেখাটা ছিলো সোলজারদের ফোনে কথা বলার অব্যবস্থাপনা নিয়ে। সহকর্মী সোহেলের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত লেখাটা পাঠালাম। তবে ছদ্মনামে। ওমা সেই লেখা যায়যায় দিন ছাপলো তাও সবার প্রথমে! আমি তো অবাক! সন্ধ্যার মধ্যে ব্যাটলিয়নের সবার পড়া শেষ! পনের দিনের মধ্যে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাড়াছড়িতে মোবাইল ফোনের ব্যববস্থা করলেন সেনা প্রধান।

বাহ! লেখার মাধ্যমে রীতিমত বিপ্লব! বই বের করার কথা ভাবলেন কখন?

যায়যায় দিনে লেখা পাঠাচ্ছিলাম। একদিন সম্পাদক মহোদয় ফোন দিলেন, দেখা করতে বললেন। তার পর লিখেই চলেছি…। সবাই বই ছাপাতে বলেন। আমি বছর তিনেক আগ পর্যন্ত বইয়ের কথা ওভাবে ভাবিনি। কিন্তু দেখতে দেখতে লেখা বেড়েই চলেছে। ২০১৭’র বই মেলায় যখন বই বের করব ভাবলাম, ততদিনে সময় পেরিয়ে গেছে। এবার মনে হলো একটু আগেভাগে চেষ্টা করে দেখি। এগিয়ে এলেন অগ্রজ শতাব্দী কাদের ভাই। বললেন আমি প্রুফ দেখে দিচ্ছি। সাহস পেলাম। শেষ করে বললেন এবার প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ কর। আমি বললাম আমি তো কোন প্রকাশককে ওভাবে চিনি না। তিনি ঐতিহ্য প্রকাশনীর নাইম ভাইয়ের কথা বললেন। যিনি নবীন লেখকদের জন্য এক বাতিওয়ালা। কেন জানিনা প্রকাশক এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।

প্রথম বইটা সম্পর্কে কিছু বলুন।

‘ক্লিনিক্যাল লায়ার’- আমার প্রথম বই আমার প্রথম সন্তানের মতোই। বইটি একটি ছোট গল্প সংকলন। এখানে প্রায় আমার এক দশক ধরে লেখা বিভিন্ন ধরনের দশটি ছোট বড় গল্প রয়েছে। ১০টি গল্পের ৭টি গল্পই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ৩টি গল্প একেবারেই নতুন। বইটি আমি উৎসর্গ করেছি নিশাত জাহান নিশা নামের একজনকে, যে কিনা আমাকে সবচেয়ে বেশী মূল্যায়ণ এবং একইসাথে সবচেয়ে বেশী অবমূল্যায়ণ করেছে। ৯ ফর্মার বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ, প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী।

এক সন্তানেই তো থেমে যাননি-

গত বইমেলায় বেরিয়েছে দ্বিতীয় বই ‘জাতের নামে বজ্জাতি’- প্রকাশ করেছে অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পনি। আগের বইয়ের মতো এ বইতেও আছে ছোট বড় মিলেয়ে ভিন্ন স্বাদের মোট ১০টি ছোট গল্প। হাউ টু বাই এ বেটার সেক্স টয়, ক্লিপ্টোম্যানিয়া, সমীকরণ, জাতের নামে বজ্জাতি, হেডফোনসহ বেশ সাড়া জাগানো গল্প স্থান পেয়েছে বইটিতে।

নিজের লেখনী সম্পর্কে বলুন।

আমি চেষ্টা করি আমার প্রতিটি লেখায় সমাজকে এক ধরনের ট্রিটমেন্ট দিতে। আমি মনে করি একজন লেখকের দায়িত্ব একজন মনোচিকিৎককের মতোই। প্রকারন্তরে লেখকও একজন সমাজ কর্মী, একজন সমাজ বিজ্ঞানী, সমাজের একজন চিকিৎসক। আমি আমার প্রত্যেকটি লেখায় সে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকি। আমি মনে করি অন্য কেউ কোন কারণে দয়িত্ব এড়িয়ে গেলেও এজন লেখকের তার দায়িত্ব এড়ানোর কোন সুযোগই থাকে না। কারণ তার কাজের জাবাদিহিতা একমাত্র তার কাছেই করতে হয়।

সাহিত্যচর্চার ছোঁয়া কি পরিবার থেকেই পাওয়া?

বাবা শিক্ষক হওয়ার কারণে ছোট বেলা থেকেই বাড়িতে অনেক বই পেয়েছি। জীবনে প্রথম পড়া বাই শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’। বাবার সংগ্রহ থেকে চুরি করে পড়া। কিশোর বয়সে বাম রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়ার ফলে রাশিয়ান অনুবাদ পড়ার সুযোগ হয়। একই সময় মানিক, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতি, তারা এসব পড়ার সৌভাগ্য হয় কলেজ জীবনেই। বুভুক্ষের মতো গিলতাম কাজী আনোয়ার হোসেন, রকিব হাসান, হুমায়ূন আহমেদ, শীর্ষেন্দু, সুনীল, সমরেশ, সত্যজিৎ, বুদ্ধদেব, বনফুল, নারায়ণ, সঞ্জীব, বুদ্ধদেব এসব। ফলে আমার লেখায় এদের সবার প্রভাব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তার পরও আমি চেষ্টা করি আমার নিজস্ব স্টাইলে লিখতে। জানি না কতটা পারি।

লেখালেখি নিয়ে আপনার কোনো স্মরণীয় ঘটনা?

‘ক্লিনিক্যাল লায়ার’ বইয়ের লেখাগুলো যখন কম্পোজ করাচ্ছিলাম তখন আমার প্রয়াত বাবা খুব অসুস্থ, ঢাকায় এসেছেন চিকিৎকসা করাতে। অল্প সুস্থ হয়ে যেদিন বাড়িতে যাচ্ছিলেন সেদিন আমি কম্পোজ করাতে যাওয়ার সময় বাবা-মাকে বললাম ‘আমার বইয়ের কাজ চলছে। আমার লেখাগুলো আপনারা একটু ছুঁয়ে দিন। আমার প্রথম বই তো…।’ স্মিত হেসে মা বললেন, ‘তুই তো এসবে বিশ্বাস করিস না।’ আমি বললাম ‘আপনারা তো বিশ্বাস করেন, আমি আপনাদের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে চাই।’ মা-বাবা দুজনেই আমার লেখা ছুঁয়ে দিলেন। বাবা বললেন ‘তোর লেখার হাত ভালো। মানুষ তোর লেখা পড়বে। তুই লিখে যা।’ এটাই ছিলো বাবার সাথে আমার শেষ কথা। আফসোস একটাই, আমার প্রথম বইটি আমার প্রথম শিক্ষক, আমার দৃষ্টিতে দেখা এই গ্রহের অন্যতম সৎ মানুষ আমার মরহুম বাবা আব্দুল লতীফের হাতে দিতে পারলাম না।

পরিবার আর সংসার সম্পর্কে?

হা হা হা…। গুপোন কথা থাউক না গুপোন। এ প্রসঙ্গে অন্য আরেকদিন এসে আলাপ করা যাবে। আপাতত চা দিতে বলুন।

(চা পান করার ফাঁকে) আপনার জন্মদিনে সময় এখন ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে অসংখ্য শুভ কামনা।

হেকিম আলী খামারী ভাই আপনাকে এবং আপনাদের সকল কর্মী, পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ীদেরও আমার ভালোবাসা।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।