আমার ছেলে জীবনে কোনো অন্যায় করেনি: ওসি মোয়াজ্জেমের মা

0

যশোর প্রতিনিধি:

সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ি যশোরে। শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় যৌথ পরিবারে বসবাস। ওয়ারেন্ট জারির পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই বলে দাবি করেছেন মা মনোয়ারা বেগম ও ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার। যদিও স্ত্রী ও সন্তান কুমিল্লায় বসবাস করেন।

মঙ্গলবার সকালে ওসি মোয়াজ্জেমের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্বিতল বাড়িটিতে ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বিবাহিত বোন বর্তমানে মায়ের সঙ্গে এখানে থাকছেন। মোয়াজ্জেমের স্ত্রী-সন্তান কেউ থাকেন না।

ওসি মোয়াজ্জেমের বাবার নাম খন্দকার আনসার আলী। ৫ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি বড়। তার এক ভাই সৌদি আরব ও আরেক ভাই আমেরিকা প্রবাসী। তাদের আদি বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা গ্রামে। বাবার চাকরি সুবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে যশোর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

১৯৯৭ সালে উপপরিদর্শক পদে পুলিশে যোগদান করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। ২০১০ সালের দিকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। প্রায় দেড় বছর সোনাগাজী থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওসি মোয়াজ্জেম কোথায়, জানে না পরিবারও: ওসি মোয়াজ্জেমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার ছেলে জীবনে কোনো অন্যায় কাজ করেননি। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমার ছেলে নিরাপদে ফিরে আসুক, এটিই আমার দাবি। নুসরাত হত্যার বিচার হোক। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আমার ছেলের জন্যই নুসরাত হত্যাকারীদের ধরা পড়েছে।

ওসি মোয়াজ্জেমের ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, ওয়ারেন্ট জারির (২৬ মে) পর আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি ভাই। আগে নিয়মিত কথা হতো। এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন- জানি না। নুসরাত হত্যার মূল মামলা বাদ দিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে করা সাইবার ক্রাইম মামলা নিয়ে বেশি তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মূল আসামিদের অনেকেই এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।

ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, নুসরাতের যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, সেটি ভাই প্রকাশ করেনি। অন্য একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েছে। এই অপরাধে সাইবার ক্রাইমের মামলা দেয়া হয়েছে। অথচ ওই ভিডিওটিই নুসরাতের দেয়া বড় ডকুমেন্ট। যার ভিত্তিতে ভাই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেপ্তার করেছিল। যার জন্য ভাইকে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল। সেটি না করে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এলাকার মানুষের কাছে খোঁজ নেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। কর্মজীবনেও কোনো অপরাধের তথ্য নেই। সাধারণ জীবনযাপন করেন। এ ঘটনার পর নানারকম কথা শুনতে হচ্ছে।

তবে ওসি মোয়াজ্জেমের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী উম্মে হানি দাবি করেন, নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনায় জড়িতদের আটক করা সহজ ছিল না। মোয়াজ্জেম ভাই সেটি করতে পেরেছিলেন নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিওর ভিত্তিতে। আমাদের ধারণা, তিনি সেফটি ডকুমেন্ট হিসেবে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেননি। টেবিলের ওপর ফোন রেখে বাথরুমে গিয়েছিলেন। এই ফাঁকে তার মোবাইল থেকে ভিডিওটি হস্তান্তর হয়েছিল।

যে অপরাধে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা: নুসরাত যখন চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখনও আসামিদের গ্রেপ্তার না করে মামলা দায়ের বিলম্বিত করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে।

১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় কোনো আসামি ছাড় পাবে না ঘোষণা দিলে ওসি মোয়াজ্জেমের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ সামনে চলে আসে। এর পর গত ১৫ এপ্রিল সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করেন। ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। একপর্যায়ে ফেনীর সোনাগাজী থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং রংপুর রেঞ্জে তাকে সংযুক্ত করা হয়।

রংপুর রেঞ্জে যোগ দিলেও ঈদের পর তাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। গত ২৬ মে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস সামস জগলুল হোসেন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ১৭ জুন পরোয়ানা তামিলসংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়।

যেভাবে নুসরাতের ভিডিও ভাইরাল হয়: পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোয়াজ্জেম হোসেন ওসি হিসেবে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও নিয়মবহির্ভূতভাবে নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩টি ধারায় (২৬, ২৯ ও ৩১) ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভিক্টিম নুসরাতকে ওসির কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার দুই বান্ধবী নাসরিন সুলতানা, নিশাত সুলতানা এবং সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

ভিক্টিমের পরিবারের সদস্যরা পাশের কক্ষে বসা ছিলেন। ভিক্টিমের দুই বান্ধবীর বক্তব্য অনুযায়ী ভিডিও ধারণ করার পূর্বে ওসি মোয়াজ্জেম মুখের নেকাব খুলতে নুসরাতকে বাধ্য এবং দফায় দফায় বিব্রতকর প্রশ্ন করেন। আপত্তি জানালে ওসি তাকে আশ্বাস্ত করে বলেন, এই ভিডিওটি সম্পর্কে কেউ জানবে না। নিপীড়নের শিকার একজন ভিক্টিমের সঙ্গে ওসির এ রকম অমানবিক আচরণ অপেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে।

ওসির এ পেশাগত অদক্ষ আচরণের ফলে নুসরাতকে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম জানান, মোবাইলটি অফিসের টেবিলে রেখে অজু করতে যান। এ সময় তার অজ্ঞাতে একটি বেসরকারি টিভির ফেনী প্রতিনিধি (সাংবাদিক) শেয়ারইট অ্যাপসের মাধ্যমে নিজের মোবাইলে নিয়ে নেন।

কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ওসির এ বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। ওসি নিজেই স্বেচ্ছায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল থেকে ওই ভিডিও ক্লিপটি তার মোবাইলে পাঠায়। এ ছাড়া ওসির হোয়াটসঅ্যাপ আইডি থেকে অন্য একটি আইডিতেও ভিডিওটি পাঠানো হয়।

Spread the love
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।