নারায়ণগঞ্জে ব্যাটারি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত পরিবেশ, স্থানীয়রা আক্রান্ত নানা রোগে

0

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ডংজিং লংজিভিটি নামে একটি ব্যাটারি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য মুছাপুর ইউনিয়নের ৩টি গ্রামে ভয়াবহ দূষণ ছড়া্চ্ছে। কারখানা থেকে নির্গত এসিড মিশ্রিত তরল বর্জ্য, সিসাযুক্ত ছাই ও ধোঁয়া দুর্বিষহ করে তুলেছে গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবন। জীববৈচিত্রের ওপরও পড়ছে ক্ষতিকর ও বিরূপ প্রভাব।

এলাকাবাসী জানায়, বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে কারখানার আশপাশের জমিতে ফসল হয়না। গাছে ফল ধরে না। পুকুরে মাছ ও বাঁচতে পারেনা। উড়ন্ত ছাই ও ধোঁয়ার কারণে পাতাকাটা, লক্ষণখোলা ও দাসেরগাঁ গ্রামের প্রতি ঘরে চোখের অসুখ, হাপানী ও শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বালাই লেগেই আছে। নারী ও শিশুরা এ সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। দূষণের কবল থেকে রেহাই পেতে এলাকাবাসী সম্প্রতি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

এ দিকে কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, সামান্য পরিবেশ দূষণ হলেও হতে পারে। কিছু লোক সুবিধা না পেয়ে কারখানার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বর্জ্য পরিশোধনে ফ্যাক্টরিতে রয়েছে ৪টি ইটিপি প্ল্যান্ট। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ সব ধরণের কাগজপত্র রয়েছে বলে দাবি তাদের।

এলাকাবাসী জানায়, ২ বছর আগে বন্দরের লক্ষণখোলা ও পাতাকাটা আবাসিক এলাকায় কৃষি জমির উপর ডংজিং লংজিভিটি লিমিটেড নামে একটি চীনা ব্যাটারি কারখানা গড়ে উঠে। কারখানাটি ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার জন্য ব্যাটারি তৈরি করে। শুরুতেই কারখানার তরল ও উড়ন্ত বর্জ্যে দূষিত হতে থাকে পরিবেশ। ৩ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখন নানা রোগে ভুগছেন। কারখানায় কোন ইটিপি প্ল্যান্ট নেই। তরল এসিড মিশ্রিত বর্জ্য সরাসরি পুকুরে এবং খালে ফেলা হচ্ছে। এতে পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে মরে গেছে অনেক পুকুরের মাছ।

সূত্র জানায়, আগে বর্জ্য ফেলা হতো পুকুর ও খালে। পুকুর ও খালের পানি অতি মাত্রায় দূষিত হয়ে পড়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষ এখন এসিডের পানি শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলার জন্য রাতের আঁধারে পাইপ লাইন স্থাপন করছে। এতে আরো দূষিত হবে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি।

লক্ষণখোলা এলাকার গণি মিয়া জানান, লক্ষণখোলা মাদ্রাসা পুকুরে আগে এলাকার লোকজন গোসল করতো। পানি নষ্ট হওয়ায় পুকুরটি আর ব্যবহার করা যাচ্ছেনা। এ ছাড়া সিসাযুক্ত ছাই ও ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। আলহাজ্ব ফজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় ও লক্ষণখোলা মাদ্রাসার কাছে কারখানাটি গড়ে উঠায় শিক্ষার্থীদের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। কারখানার ছাইয়ের কারণে ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ। এ সময় শিক্ষার্থীদের মাথা ঘোরাসহ বমি ভাব হয়। চোখে ঝাপসা দেখে শিক্ষার্থীরা।

পাতাকাটা ও লক্ষণখোলা এলাকার দোকানদার শাহ আলম ও মুসলেহউদ্দিন জানান, সব সময় বাতাসে ছাই উড়ে। যখন বর্জ্য অপসারণ হতে থাকে তখন নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। দোকানদারী করা যায়না। ক্রেতারাও দোকানে আসতে চান না।

পাতাকাটা এলাকার শফিউদ্দিন জানান, সিসাযুক্ত বায়ুর কারণে পাতাকাটা ও দাসেরগাঁ এলাকার মানুষ কবরস্থান রোড দিয়ে চলাচল করতে পারেনা। এ সড়ক দিয়ে গেলেই বিষাক্ত বর্জ্যসহ বায়ু চোখে প্রবেশ করে। এতে চোখের ক্ষতি হয়। একই কারণে লক্ষণখোলা কবরস্থানে লাশ দাফনে সমস্যায় পড়তে হয় বলে তিনি জানান।

পাতাকাটা গ্রামের ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আবদুস সোবহান মিয়া জানান, তার চোখে কোন সমস্যা ছিলনা। কিছু দিন আগে চোখে ব্যাটারি কারখানার উড়ন্ত ছাই ঢুকে পড়ে। এতে চোখে সমস্যা দেখা দেয়। তারপর আরও ২ বার ছাই ঢুকে যাওয়ায় তিনি এখন অন্ধত্ব বরণ করতে চলেছেন বলে জানান।

একই এলাকার নাজির হোসেনের ছেলে গার্মেন্টস কর্মী রাকিবের (১৮) চোখে ছাই প্রবেশের ফলে চোখ নষ্ট হয়ে যায়। পরে অপারেশনের মাধ্যমে চোখের দুষ্টি শক্তি ফিরে পান তিনি। এ জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাকিবকে ২ হাজার ৫শ’ টাকা দেয়।

এ ছাড়া পাতাকাটা গ্রামের গৃহবধূ হোসনেয়ারা, দিনমজুর জামান, আলাউদ্দিনের ছেলে সানি, মৃত আবদুল খালেকের ছেলে মনির হোসেনসহ অর্ধশত নারী-পুরুষ ও শিশু কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে দৃষ্টি শক্তি হারাতে বসেছেন বলে এলাকাবাসী জানান।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।