টিকা দিলে এইডস হয়, শিশুদের টিকা দেবেন না: মুফতি ইব্রাহিম (ভিডিও)

0

সময় এখন ডেস্ক:

শিশু জন্মের পর ১০টি মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষায় টিকা দিতে হয়। টিকাদান কর্মসূচিতে অবিস্মরণীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। রুবেলা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পাওয়ায় গত বছর বাংলাদেশকে জাতিসংঘ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। শিশুর টিকাদানে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

এমন পরিস্থিতিতে এই সাফল্য যেখানে ধরে রাখার প্রয়োজন, সেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জাতিকে বিভ্রান্ত করার একটা অপপ্রয়াস চলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারন, দেখা গেছে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে টিকাদান কর্মসূচির বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়া হচ্ছে। পাকিস্থানে যেমন টিকাদান কর্মসূচিকে ভণ্ডুল এবং নিরুৎসাহিত করতে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয় নিয়মিত, ঠিক তেমনি ওয়াজ মাহফিলে চালানো হচ্ছে অপপ্রচার।

মুফতি কাজী ইব্রাহিম নামের একজন বিতর্কিত ধর্মীয় বক্তার ওয়াজের ভিডিওতে দেখা যায় তিনি টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে এর মাধ্যমে এইডস ছড়ানো হচ্ছে বলে সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মনগড়া বক্তব্য দেন। এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক বক্তব্য টিকাদান কর্মসূচির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে আশংকা সুধীজনের।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে- মুফতি কাজী ইব্রাহিমের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়- গর্ভবতী নারী ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেয়া জায়েজ কি না? তিনি জবাব দেন, আমি আমার ১১টা সন্তানের একজনকেও টিকা দিইনি। আমার সন্দেহ হয়, কী না কী আছে এই টিকার মধ্যে! আফ্রিকান জাতির এইডসের জন্য টিকা দায়ী। কোটি কোটি আফ্রিকান মুসলমানকে এইডসে আক্রান্ত করে দেয়া হয়েছে এই টিকার মাধ্যমে।

তিনি আরও জানান, মুসলমানের সন্তানদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা হলো আকিকা (নাম রাখার জন্য পশু জবাই প্রক্রিয়া)। আকিকা দিলে শিশু থাকবে নিরাপদ। তিনি সহি হাদিস থেকে ব্যাখ্যা করেন, আকিকার জবাইকৃত পশুর শরীরের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আল্লাহ শিশুর নিরাপত্তা দেন।

ইতিপূর্বেও তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন জনম্মুখে। সেই বিষয়টি নিয়েও প্রচুর সমালোচনা হয়। যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি আজ অব্দি। সে সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন: জন্মনিয়ন্ত্রণ হারাম, অধিক সন্তান জন্ম দিয়ে কাফেরদের আতঙ্কিত করুন: মুফতি ইব্রাহিম (ভিডিও)

টিকাদান সংক্রান্ত ভিডিওটি সংবাদের নিচে দেয়া হলো।

কে এই মুফতি কাজী ইব্রাহিম?

ধর্মীয় জঙ্গীবাদে অর্থায়ন, উস্কানি, অর্থ পাচারসহ কয়েকটি অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হওয়া চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামী এবং ইসলামিক বক্তা জাকির নায়েকের মালিকানাধীন পিস টিভি ও তার সংস্থার পরিচালনাধীন বাংলাদেশের পিস স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ‘উগ্র সালাফি মতবাদে’র চর্চায় দীক্ষিত করার অভিযোগ পুরনো। বাংলাদেশে এই চর্চা শুরু হয় মুফতি কাজী ইব্রাহিমের হাত ধরে। ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনার পর হামলাকারী জঙ্গিদের অনেকেই জাকির নায়েকের লেকচারে অনুপ্রাণিত- এই তথ্য পাওয়ার পর তৎপর হয়ে উঠেছিলেন গোয়েন্দারা। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশে পিস টিভি ও পিস স্কুলের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজী ইব্রাহিমের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলমান আছে বলে জানা যায়।

সালাফি মতবাদের ৮টি গ্রুপের অন্যতম- উগ্রবাদ; যারা সিরিয়াকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু করে কয়েক বছর আগে। জাকির নায়েকও ওই মতবাদের অনুসারী। উগ্র সালাফি মতবাদের অন্যতম প্রচারক আইএস’কে জাকির নায়েক কর্তৃক অর্থায়নের প্রমাণ পেয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। কাজী ইব্রাহিম, মাওলানা জসিম উদ্দীন রাহমানী (গ্রেফতারকৃত), আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (পলাতক)ও এই চিন্তাধারায় বিশ্বাসী বলে জানা যায়।

জাকির নায়েকের অনুসারীদের মতে, ৫ ওয়াক্ত নামাজের পর মোনাজাত করা যাবে না। ইসলামে টাই পরা জায়েজ। শবে বরাত পালন করা হারাম। তারাবির নামাজ সাধারণত ২০ রাকাত পড়া হলেও তারা ৮ রাকাত মনে করেন। পীর-মাশায়েখদের মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ হারাম ইত্যাদি। আলেমদের অভিযোগ, জাকির নায়েক ও তার অনুসারীরা এই বিষয়গুলো নিয়ে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে পিস টিভিকে ব্যবহার করতো। ইসলামী ছাত্র মজলিসের সাবেক সভাপতি মাওলানা রুহুল আমীন সাদী জানান, দারুল উলুম দেওবন্দসহ বাংলাদেশের আলেমরাও জাকির নায়েকের এসব চিন্তাধারার বিরোধী।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব ও লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, জাকির নায়েক ও তার অনুসারীরা ৪ ইমামের মাজহাব মানেন না। এমনকি জেএমবি নেতা জসিম উদ্দীন রাহমানী, ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাই; তারাও সালাফি মতবাদের অনুসারী ছিল।

গোয়েন্দা নজরে কাজী ইব্রাহিম!

‘আমরা আপনাদের দলে নেই। জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন না। এসব আমরা গাই না। এগুলো ইসলামবিরোধী কাফেররা গায়, আমরা না। আর ইসলাম হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম।’ এটি উগ্রবাদী জঙ্গিনেতাদের বক্তব্য বলে মনে হলেও আদতে তা নয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য উগ্র ও ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে রীতিমতো আক্রমণাত্মকভাবে কথাগুলো বলেছিল প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি শিশু! ২০১৬’র শেষের দিকে লালমাটিয়ায় বি ব্লকে অবস্থিত ‘পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’- এর এক শিশুর সাথে গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের সাথে কথোপকথনে উঠে এসেছিলো এই ভয়ংকর পরিস্থিতি।

লালমাটিয়ার পিস স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন কাজী ইব্রাহিম। তিনি পিস টিভিতে বক্তব্য রাখতেন এবং নিয়মিত দেশের বিভিন্নস্থানে নিজেদের মতাদর্শভিত্তিক প্রচার চালান। ধর্মভিত্তিক একটি ইসলামী সংগঠনের সাবেক শীর্ষনেতা দাবি করেন, মুফতি কাজী ইব্রাহিম প্রথমে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ছিলেন। তবে দলটিতে তারা সাংগঠনিক পদমর্যাদা ছিল কি না, এ নিয়ে সুনিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত নেতা ও চ্যানেল আই’র জনপ্রিয় উপস্থাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার ঘটনায় ৪টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ৬ জন উপস্থাপককে আসামি করে পিটিশন মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় মূল আসামিদের মধ্যে পিস টিভির উপস্থাপক কাজী ইব্রাহিমও রয়েছেন। এই ৬ জনকে ফারুকী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার আর্জিতে। বর্তমানে ওই মামলাটি তদন্তাধীন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।