ঢাকায় পাহাড়ি নারীদের পরিচালিত অনন্য রেস্তোরাঁ ‘হেবাং’

0

হেঁসেল ঘর:

যদিও রেস্তোরাঁটির অবস্থান এক কংক্রিটের ভবনে, তবে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে মনে হবে চলে এসেছেন এক ভিন্ন পরিবেশে। প্রথমেই চোখ আটকে যাবেবাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট ঘরটিতে। দেয়ালের গায়েও বাঁশের নানা কারুকাজ। বাঁশের এত ব্যবহার হবে নাইবা কেন? এ যে পাহাড়ি খাবারের রেস্তোরাঁ।

রাজধানী ঢাকার কংক্রিটের জঞ্জালের মাঝে আসল পাহাড়ের রূপ আনতেই বাঁশের এই প্রাধান্য, জানান রেস্তোরাঁর পরিচালনাকারীরা। এখানে যে ঘরের কথা বলা হচ্ছে, চাকমা ভাষায় এর নাম ইজর। এটা পাহাড়িদের প্রথাগত ঘরের বাইরের অংশ। যেখানে বসে মানুষ সময় কাটায়।

নগরবাসী যেন বসে পাহাড়ি খাবার খেতে খেতে সময় কাটতে পারে, সে ব্যবস্থাই আছে এখানে। রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ার এ রেস্তোরাঁর নাম ‘হেবাং’। কাজীপাড়ার পদচারী–সেতুটির উত্তর দিকের একটি ভবনের ৩ তলায় এর অবস্থান। হেবাং নারী পরিচালিত প্রথম পাহাড়ি খাবারের রেস্তোরাঁ। ৪ বোন এর পরিচালনায় আছেন। রেস্তোরাঁ চালুর আগে ২০১৬ সাল থেকে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে পাহাড়ি খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করত হেবাং।

৪ বোনের একজন সুচিন্তা চাকমা বললেন, ‘অনলাইনে এত সাড়া দেখেই এ রেস্তোরাঁ খোলা। এখনো ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’ গত ১৬ ডিসেম্বর চালু হয় হেবাং। অনলাইনে পাহাড়ি খাবার সরবরাহের বা আজকের রেস্তোরাঁ— দুটির চিন্তাই আসে ৪ বোনের মধ্যে ২য় প্রিয়াঙ্কা চাকমার মাথা থেকে। হেবাংয়ের জায়গায় মেজাং নামে পাহাড়ি খাবারের রেস্তোরাঁ ছিল। মেজাং বিক্রি করে দিলে কিনে নিয়ে হয় ‘হেবাং’— চাকমা ভাষায় যার অর্থ ভাপে রান্না করা খাবার। এ রান্নার একটি বৈশিষ্ট্যই হলো সেদ্ধ বা ভাপে রান্না।

বাঁশের ভেতরে মুরগি বা অন্য মাংস দিয়ে সেই বাঁশ পুড়িয়ে রান্না করা খাবার বেশ জনপ্রিয়। ‘সুমোত দি তোন’ নামের এ খাবার এখানে নিয়মিত মেলে। জুমের বিন্নি চালের ভাতের সঙ্গে নানা পাহাড়ি তরকারির মিশ্রণ ‘পাজন’ও পাওয়া যায় নিত্যদিন। পাহাড়িদের বর্ষবিদায় ও বরণের উৎসব বৈসাবিতে পাজন অপরিহার্য, এটি পাওয়া যায় প্রতিদিন। আছে শুঁটকির নানা আইটেম। ছোট শামুক বা শীতের সময়ে সেদ্ধ বাঁধাকপির সঙ্গে ঝালের মিশ্রণ।


ছবি: হেবাং-এর উদ্যোক্তা চার বোন

খাবারের মধ্যে দেখা গেল- হাঁস, বেলে মাছ, কাঁকড়ার নানা পদ। ব্রয়লার মুরগি আছে। তবে পাহাড়ের বনমোরগও পাওয়া যায়। বর্ষার দিনে বাঁশ কোড়ল দিয়ে তৈরি নানা পদ থাকে। কোড়লের মধ্যে মুরগির মাংস ঢুকিয়ে ‘বাচ্চুরিমালা’ তো বিখ্যাত। দুপুর ও রাতের খাবারের বিভিন্ন পদের সঙ্গে আছে নানা পাহাড়ি পিঠা।

বিন্নি চালের পিঠা, কলা পিঠা গরম-গরম পরিবেশিত হচ্ছে। আছে নানা ফলের জুস। তিন থেকে চার ধরনের চা আছে। এর মধ্যে তেঁতুল চা, পুদিনাপাতার চা, রোজেলা চা অন্যতম। ৪ বোনের মধ্যে বড় বিপলী চাকমা বললেন, ‘পাহাড়ের জুমে হওয়া টক ফল আমিল্যার পাতা শুকিয়ে তৈরি রোজেলা চা আমাদের নিজেদের আবিষ্কার।’ ৪ বোনের মাধ্যমে জানা গেল, জন্মদিন বা কোনো পার্টি করতে চাইলে দুপুরের জন্য বেলা ১১টার মধ্যে আর রাতের খাবারের জন্য বিকেল সাড়ে ৪ টার মধ্যে অর্ডার দিতে হবে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় হেবাং খোলে, চলে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। রেস্তোরাঁটি পাহাড়ি খাবারের হলেও এখানে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি বাঙালি। রেস্তোরাঁয় ঘণ্টা দেড়েক বসে দেখা গেল, ৮ জন ভোক্তার মধ্যে ৫ জনই বাঙালি। তাদের মধ্যে প্রথমবার আসা ডোনাল্ড এইচ খান আর তার বন্ধু ডেলা জানালেন, তেলহীন খাবার আর ভিন্ন পরিবেশ তাদের মুগ্ধ করেছে। হেবাংয়ে শব্দযন্ত্রে ধীরলয়ে বাজে পাহাড়ি নানা ভাষার গান। বিভিন্ন দিবসে এখানে গানের আসরও বসে।

৪ বোনের একজন প্রিয়াঙ্কা বলছিলেন, ‘এ রেস্তোরাঁ আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে। তবে খাবার, পরিবেশ, পরিবেশনা— সবকিছুর মধ্যে পাহাড়কে তুলে ধরতে চাই। নিজেদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি অন্যদের জানাতে চাই।’

Spread the love
  • 53
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    53
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।