ধর্মত্যাগী মাকে স্টেশনে ফেলে গেছে মুসলিম সন্তানেরা, খোঁজ নেয় না হিন্দু স্বজনরাও!

0

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:

১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারনের পর লালন-পালন করে বড় করে তোলা সন্তানরাই রেলওয়ে স্টেশনে ফেলে রেখে যায় ধর্মত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা মা শ্যামলী রানীকে (৫৫)।

বছর দু’য়েক আগে মারা যান বৃদ্ধার স্বামী। এরপর পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইসিস) রোগে আক্রন্ত হলে মাকে লালন-পালন ও চিকিৎসার পরিবর্তে স্টেশনের পাশে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তার ছেলে ও মেয়ে। ইতোমধ্যে ওই বৃদ্ধার আংশিক পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি বগুড়ার দুপচাচিয়া এলাকার বাসিন্দা। তার একমাত্র ছেলের নাম কালু যিনি যাত্রাদলের কংক (ঢোল) বাদক। দু’টি মেয়েও রয়েছে, যাদের নাম হাসি ও খুশি।

সোমবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে সিরাজগঞ্জ শহরের রেলওয়ে কলোনি মহল্লার সিংপাড়া এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বললে এসব তথ্য জানা যায়।

আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, ওই বৃদ্ধার নাম শ্যামলী রানী। তিনি সিরাজগঞ্জ শহরেরই মেয়ে ছিলেন। এরপর যাত্রাদলের শিল্পী হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রথমে তার বিয়ে হয় নিজ সম্প্রদায়ের (হিন্দু) ব্যক্তির সঙ্গে। কিছুদিন পর তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর যাত্রাদলের এক মুসলিম শিল্পীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এরপর থেকে শ্যামলীর সঙ্গে তার মায়ের বাড়ির আত্মীয়ের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

বিয়ারঘাট এলাকার বাসিন্দা তনু সিং বলেন, শ্যামলী আমার পিসতুতো (ফুপাতো) বোন। রেলওয়ে কলোনি মহল্লায় শ্যামলীর মাসি (খালা) কানন বালা ও মাধবী রানী এখনও জীবিত রয়েছেন। আমরা শুনেছি বগুড়া জেলার দুপচাচিয়া এলাকার কোনো এক মুসলিম যাত্রাশিল্পীর সঙ্গে শ্যামলীর বিয়ে হয়েছে। তার দুই মেয়ে ও একটি ছেলেও রয়েছে। তবে ধর্মত্যাগের কারণে তাদের সঙ্গে শ্যামলীর কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ নেই।

সত্তোর্ধ্ব বৃদ্ধা কানন বালা সিং বলেন, শ্যামলী আমার বড় বোন সোহাগীর মেয়ে। প্রায় ৪০ বছর আগে শ্যামলী নিজের ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে বিভিন্ন স্থানে যাত্রাগান করে বেড়াতেন। এরপর আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয় নাই।

বৃদ্ধা শ্যামলীর মাসতুতো (খালাতো) বোন রুপা রানী বলেন, প্রায় মাসখানেক আগে ঝড়ের সময় হঠাৎ করেই শ্যামলীর ছেলে কালু ও দুই মেয়ে হাসি এবং খুশি আসে। তারা রেলওয়ে স্টেশনে তাদের মাকে ফেলে রেখে বাড়িতে এসে বলে, তোমরা আমার মাকে দু’বেলা ভাত দিয়ে আসবে এবং মাঝে মধ্যে গোসল করাবে। এমন কথা বলেই তারা দ্রুত চলে যায়। তারপর থেকেই বৃদ্ধা শ্যামলী রেলওয়ে স্টেশনে পড়েছিল। কলোনির বিভিন্ন মানুষ তাকে মাঝে মধ্যে খাবার দিয়ে আসতো। সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে কেউ তাকে বাড়িতে স্থান দেয়নি।

এদিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা শ্যামলী বর্তমানে বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। কথা বলতে না পারলেও উঠে বসতে পারছেন এবং স্বাভাবিকভাবে খাবারও খাচ্ছেন। সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস তার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। পরিবারের কারো খোঁজ না পাওয়ায় তাকে বৃদ্ধাশ্রমে দেয়ার পরিকল্পনা চলছে।

মামুন বিশ্বাস বলেন, চরম নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে এই বৃদ্ধাকে প্রায় ৪ সপ্তাহ আগে স্টেশনে ফেলে রেখে যায় তার সন্তানরা। পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগে আক্রান্ত এই নারীর ডান হাত, ডান পা, মুখের ডান পাশ অকেজো হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করে কোনো কথা বলতে পারেন না। বৃদ্ধা মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে স্টেশনের পাশের খোলা জায়গায় অবস্থান করছিলেন। রোববার (২১ এপ্রিল) তাকে গোসল করিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করি। বর্তমানে তিনি বেশ সুস্থ। দু’একদিনের মধ্যে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফরিদুল ইসলাম জানান, ওই বৃদ্ধার সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে পরিবারের কাউকে পাশে থাকা প্রয়োজন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।