অর্ধনগ্ন নর-নারী পরিবেষ্টিত সমুদ্রতীরে দুবাইয়ের মসজিদ- প্রবাসীর অভিজ্ঞতা

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

আমি যেখানে কাজ করি সে যায়গাটির নাম দুবাই মেরিনা। জুমেরাহ সি বিচের কাছেই। এই যায়গা দিয়েই অধিকাংশ পর্যটক এবং দুবাই বাসী সমুদ্র বীচে যায় লাইন ধরে। দুবাই সম্পর্কে যাদের নূন্যতম ধারণা আছে তারাও জানেন দুবাই কেমন শহর। হঠাৎ করে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কেউ আসলে সে ঠিক পার্থক্য করতে পারবে না এটা আমেরিকার লাসভেগাস নাকি আরব মুলুকের কোন শহর! পুরোপুরি না হলে ও অর্ধনগ্ন মানুষের চলাফেরা এই শহরে স্বাভাবিক ব্যাপার।

আর গরমের দিনে তো কথাই নাই। তাছাড়া বার, মদের ক্লাব বা নাইট ক্লাব, ম্যাসাজ পার্লারসহ বহু আবাসিক হোটেলের কলগার্ল ব্যবসা তো সেখানে ওপেন সিক্রেট! বিশেষ করে দুবাই মেরিনা আর JBR-এ এইসব কমন জিনিস।

সেই JBR এর রিমেল রেসিডেন্স এ একটা মস্ক (মসজিদ) আছে। রিমেল একদম ওপেন বিচের পাশেই। কয়েক তলা উপর থেকে তাকালে বিচে সূর্য স্নান করা শত শত অর্ধনগ্ন নারী দেখতে পাওয়া যায়! সেই রিমেল মসজিদে গত রমজানে ইফতার করতে গিয়েছিলাম। পুরো রমজান মাস সেখানেই ইফতার করেছি।

সেই মসজিদের ইমাম ইজিপশিয়ান (মিশরিয়)। সামান্য দাঁড়ি আছে মুখে। চমৎকার ব্যবহার। হাসিমাখা মায়াবী মুখ। কথা বলেন ইংরেজিতেই। কারন যে কমিউনিটিতে মসজিদ, সেখানকার অধিকাংশ রেসিডেন্ট ইউরোপ, আমেরিকা, পাকিস্থান বা ভারতের। অর্থাৎ মাল্টিন্যাশনাল। ডিউটির মাঝে নামাজ পড়তে যাই বলে কখনো বয়ান শোনা হয়না। একদিন শুক্রবারে আগেভাগেই বের হয়েছিলাম ইংরেজিতে বয়ান কীভাবে দেয় শুনতে। মাশাল্লাহ অভিভূত হয়ে রইলাম! চোস্ত ইংরেজিতে কোন জড়তা ছাড়াই অনর্গল বয়ান দিয়ে গেলেন ইমাম। কিন্তু কখনো বয়ানের মাঝে আমাদের দেশের হুজুরদের মতো উত্তেজিত হয়ে ইহুদি, খ্রিষ্টান ষড়যন্ত্র তথ্য অথবা এই উৎসব হালাল, ওই উৎসব হারাম তথ্য জাহির করেন নাই।

অথচ জুমেরাহ বিচে সারাদিন নগ্ন নারীদের আনাগোনা থাকে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একেকবার হাজার হাজার দিরহামের হাউশ বাজি এই বিচেই পোড়ানো হয়! তারপরও হুজুর বদদোয়া দেন না। দোয়া করেন শেখ মোহাম্মদ এবং শেখ জায়েদের নাম ধরে। দোয়া করেন সারাবিশ্বের উম্মাহর শান্তির জন্য।

একদিন নিরিবিলিতে আলাপকালে জানলাম উনি মিশরের বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। উনার স্ত্রী সরকারি হাসপাতালের নার্স। ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে থাকেন। অথচ নামাজের সময় ছাড়া হুজুরের পরনে থাকে জিন্স প্যান্ট, টি-শার্ট! ওহ বলতে ভুলে গেছি, সেই মসজিদে পুরুষ এবং মহিলার জন্য আলাদা আলাদা নামাজের কক্ষ এবং অজুখানা আছে। শুধু পার্থক্য হলো- নামাজের সময় মহিলাদের আলাদা কোন ইমাম লাগে না।

আরেকদিনের ঘটনা। ইফতারির জন্য অপেক্ষা করছি। মসজিদের সামনে ইফতারি করার জন্য চাটাই বিছানো হয়। হঠাৎ এক মহিলা (ইউরোপিয় মনে হলো) ঢোলা টি-শার্ট আর প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত! থতমত খেয়ে ফিরে যাবেন এমন সময় হুজুর সামনেই ছিলেন, ইংরেজিতেই বললেন, ‘কোনো সমস্যা নাই, আপনি আসুন।’ দেখলাম সবাই এক পাশে গিয়ে জায়গা ছেড়ে দিলো।

মহিলা যে বিল্ডিং এ থাকেন, তা মসজিদের অপোজিটে। নিচ দিয়ে ঘুরে গেলে সময় লাগবে বিধায় এইখানে দিয়ে যাওয়া। এভাবে বেশ কিছুদিন পর আরেক মহিলাকে দেখলাম লম্বা ঢিলেঢালা আপাদমস্তক ঢাকা কাপড়ে। মাথায়ও এক টুকরো ওড়না সদৃশ কাপড়! দেখে মনে হলো ইউরোপিয়। কিন্তু ওই একই মহিলা কি না শিউর না। হতেও পারে, নাও হতে পারে। তবে যেই হোক, তাকে কেউ বলেনি পর্দা করার কথা। তিনি নিজ থেকেই বুঝে গেছেন।

অথচ আমাদের দেশে মসজিদের বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে- “এই রাস্তায় মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ”! (সম্ভবত সিলেটের কোনো এক মসজিদের পাশে এমন সাইনবোর্ড আছে!)

মহিলাদের মসজিদে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা তো দূরে থাকুক, এরা দিনরাত নারীদের জাহান্নামি ট্যাগ দিতে ব্যস্ত থাকে। যদিও আমাদের দেশে এইরকম নগ্ন সি-বিচ নাই, তারপরও দিনরাত মাইকে পর্দা নিয়ে চরম উত্তেজিত কথাবার্তা বলতে শোনা যায়। মেয়েদের বাইরে বেরুনো পাপ, চাকুরী করা পাপ, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া পাপ তো কমন ফতোয়া! সেই সাথে ভিন্নধর্মী বা অমুসলিমদের সাথে মেলামেশা হারাম, এই সেই.. নিন্দাবাদ তো আছেই! আছে সরকারকেও বদদোয়া দেয়ার অসংখ্য নজির! অথচ একজন মুসলমানের চরিত্র হওয়া উচিত অমায়িক, মিতভাষী, চরিত্রবান, সত্যনিষ্ঠ এবং নীতিবান!

আমাদের দেশের হুজুরদের কি এমন কোনো গুণ আছে? একে ওকে নাস্তিক ট্যাগ দেয়া, সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলা, নারীদের অবমাননা করা, রাষ্ট্রের আইন উপেক্ষা করে যখন তখন ভাঙচুর করা, হুমকি ধমকি দিতেই উনাদের দেখা যায়!

তারওপর প্রায় প্রতিদিনই ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বলাৎকার, ধর্ষণ তো আছেই! আছে অনৈতিক সম্পর্ক এবং মাদক ইয়াবা ব্যবসার খবর। তারপরও উনাদের কোন লজ্জাবোধ হয় না। উনারা অপেক্ষায় থাকেন কখন পহেলা বৈশাখ, ২১শে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস আসবে। আর সেদিন উনাদের ধর্মীয় বিধিনিষেধ অনলাইনে, অফলাইনে, মসজিদে মসজিদে প্রচার হবে।

কিন্তু ঘুণাক্ষরেও প্রচার হবে না- ঘুষ খাওয়া হারাম, বলাৎকার করা পাপ, ধর্ষণ করা পাপ, নারীদের দিকে কুদৃষ্টিতে তাকানো, ইভটিজিং করা পাপ! এর নাম তো ইসলাম না। এটা হিপোক্রেসি।

আপনি ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডের অমুসলিমদের মুসলিম হওয়া নিয়ে উৎসাহ বোধ করে স্ট্যাটাস শেয়ার দেন। অথচ নিজ দেশে মন্দির ভাঙলে, মূর্তি ভেঙে দিলে দাঁত বের করে হাসেন! কখনও কি জানতে চেয়েছেন, ওইসব দেশের মুসলিমরা কীভাবে অমুসলিমদের মন জয় করে নিয়েছে?

হ্যাঁ, মানুষের মতো ব্যবহার করে, অমায়িক বন্ধুবৎসল কর্মবীর হয়ে। এইসব ইউরোপ, আমেরিকায় যেসব মুসলিম ইমিগ্রান্ট হয়ে যায়, তারা সারাদিন বিধর্মীদের পিছনে কুৎসা রটায় না। তাদের সে সময় নেই। নামাজের সময় নামাজ পড়ে, বাকি সময় কাজ করে। বিধর্মীরা তা দেখে মুগ্ধ হয়েছে। আমাদের দেশের মতো বিধর্মীদের গালি দিয়ে ওয়াজ মাহফিল করে, মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে চাঁদা উঠিয়ে সংসার চালায় না তারা। কাজ করে।

সে দেখছে তার খ্রিস্টান বন্ধুটি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে থাকে, অন্যদিকে মুসলিম বন্ধুটি পুরো ৩৬০ ডিগ্রি বিপরীত। একটা সিগারেটও খায় না, অমায়িক ব্যবহার তো আছেই। এইভাবেই এরা আকৃষ্ট হয়েছে, হয়।

আজ থেকে ঠিক ৮/৯ শত বছর পূর্বে এইদেশও ছিলো সনাতনী হিন্দু, বৌদ্ধদের বাসস্থান। আমাদের পূর্ব পুরুষের কেউ সরাসরি আরব থেকে আসেনি। এদের থেকেই কনভার্ট হয়েছে। বখতিয়ারের ঘোড়ার টানে এইদেশে কিছু মুসলিম এসেছিলো বটে, কিন্তু তাদের জোরাজুরিতে এত বিশাল জনপদ মুসলিম হয়নি। হয়েছে ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখদের অমায়িক ব্যবহারে। তারা এইরকম সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। সবাইকেই বুকে টেনে নিতেন। মানুষকে মানুষই মনে করতেন।

ভাবুন তো, আমরা তাদের থেকে কত শত সহস্র মাইল দূরে আছি! আমাদের ইসলাম আর তাদের ইসলামের মাঝে কত পার্থক্য? হ্যাঁ পার্থক্যটা এইখানেই!

লেখক: আল বাকী আল মিজান
পরিচিতি: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

Spread the love
  • 864
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    864
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।