মিজানের এবারের উদ্ভাবন- পোড়া মবিল থেকে তেল ও গ্যাস

0

যশোর প্রতিনিধি:

যশোরের শার্শা উপজেলার মোটরসাইকেল মেকানিক মিজান এখন দেশ সেরা গবেষক ও উদ্ভাবক। মিজানের একাডেমিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও আজ তিনি নিজের আলোয় আলোকিত। নতুন গবেষণায় তার উদ্ভাবনের সংখ্যা ১১টি। তার গবেষণা উদ্ভাবন নিয়ে দেশ, জাতি এখন গর্বিত।

অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস যেগুলো পুনঃব্যবহারের চিন্তা থেকে এবার মিজান পোড়া মবিল থেকে গ্যাস ও জ্বালানি তেল তৈরি করেছেন। মোটরসাইকেল কিংবা কল কারখানায় ব্যবহৃত অপ্রয়োজনীয় পোড়া মবিল পরিবেশ দুষণ করে থাকে। পরিবেশ দুষণমুক্ত করতে মিজান এ উদ্যোগ নিয়েছেন।

মিজান বলেন, ‘ভেবে দেখলাম আমাদের দেশে লাখ লাখ কলকারখানা, যানবাহন এবং মোটরসাইকেল গ্যারেজ রয়েছে। এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ বাতিল বা বাদপড়া মবিল। যে মবিল নষ্ট করছে আমাদের পরিবেশ, স্বাস্থ্যহানী হচ্ছে মানবদেহের। এমন চিন্তা ভাবনায় আমি গবেষণা করি এসব মবিল কীভাবে কাজে লাগানো যায়। একদিন কিছু পোড়া মবিল আমি খোলা মাঠে ঘাসের উপর ফেলে আসি। কিছু দিন পর দেখি ঘাসগুলো মারা গেছে। এমনিভাবে পানিতে ফেললেও মারা যাচ্ছে মাছ। পোড়া মবিল কাজে লাগাতে যেয়ে দেখি তা থেকে উৎপাদন হচ্ছে গ্যাস ও জ্বালানি তেল। একটি কন্টেইনারে পোড়া মবিল জ্বালিয়ে গ্যাস তৈরি করেছি। রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে এই গ্যাস ব্যবহার করা যায়। আর অবশিষ্ট অংশ রিসাইক্লিং করে ডিজেল, মবিল ও কেরোসিন তেল তৈরি করা যায়। এখন শুধু দরকার সরকারের সহায়তা।’

শার্শা উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের আমতলা গাতিপাড়ার অজপাড়া গাঁয়ে ১৯৭১ সালের ৫ মে জন্মগ্রহণ করেন মিজান। তার ভাল নাম মিজানুর রহমান। পিতা আক্কাস আলী ও মাতা খোদেজা খাতুন কেউ বেঁচে নেই। ৬ সন্তানের মধ্যে মিজান ৫ম। বর্তমান শার্শা উপজেলা সদরের শ্যামলাগাছি গ্রামে তার বসবাস। দারিদ্রতার কারণে লেখাপড়া শিখতে পারেনি মিজান। ৮/৯ বছর বয়সেই বেঁচে থাকার তাগিদে নেমে পড়েন কর্মে। মাঠে মাঠে ইরি ধানের ক্ষেতে শ্যালো মেশিন চালানো এবং মেরামতের কাজ করেন মিজান।

পরবর্তীতে নাভারন বাজারে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ করেন মিজান। সেখান থেকেই তার মোটর মেকানিক পেশা হিসেবে কর্মজীবন শুরু। বর্তমানে শার্শা বাজারে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজ রয়েছে তার। এটাই তার জীবিকার পথ। তবে ছোটবেলা থেকেই তার শখ ছিল নতুন কিছু করা, নতুন কিছু জানা। মেকানিক হিসেবে ইঞ্জিন তৈরি করতে প্রবল আগ্রহ ছিল। বারবার চেষ্টার পর মিজান তৈরি করেন ইঞ্জিন।

মিজান প্রথমে উদ্ভাবন করেন হাফ ক্র্যাংকশ্যাফট দিয়ে তৈরী একটি ইঞ্জিন। যার সমস্ত যন্ত্রপাতি দেখা যেত বাহির থেকে। এ ইঞ্জিনটি একবার জ্বালানি তেল দিয়ে চালু করলে পরবর্তীতে আর তেল লাগতো না। সৃষ্ট ধোঁয়া থেকে জ্বালানি তৈরি করে নিজে নিজে চলতো ইঞ্জিনটি।

ঢাকার তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানীর পর মিজান উদ্ভাবন করেন স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র। বাসা-বাড়ি, কলকারখানা, অফিস, আদালতে আগুন লাগলে যন্ত্রটি আগুন নিভাতে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে নিজে নিজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে আগুন নিভাতে শুরু করে। এটি বিদ্যুৎ না থাকলেও চলে। এ যন্ত্রটি স্বল্প জায়গায় রাখা যায়। যখনই কোনো জায়গায় আগুন লাগে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা নির্ণায়ক যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনের অবস্থান নিশ্চিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম ও রেড লাইট চালু করে দেয়। তারপর একই সঙ্গে সংযুক্ত মোবাইল হতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ফোন দেয় এবং পাশাপাশি যন্ত্রটি পানির পাম্পের সুইচ অন করে দেয়। যা আগুনের অবস্থান নিশ্চিতের ৫/৭ সেকেন্ডের মধ্যেই সম্ভব হয়। তারপর পানির পাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত পাইপের মাধ্যমে আগুনের অবস্থানে পৌঁছে অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ফাঁপা বলের মাধ্যমে পানি আগুনে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগুনটি নিভে যায়।

এটি উদ্ভাবনের পর ২০১৫ সালে যশোর জেলা স্কুলের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় মিজান এটি প্রদর্শণ করে ১ম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে এটি বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় ১ম ও ২য় স্থান অধিকার করেন। দেশে পেট্রল বোমায় যখন মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল ঠিক সেই সময় মিজান উদ্ভাবন করেন তার ৩য় উদ্ভাবন অগ্নিনিরোধক জ্যাকেট। এ জ্যাকেট গায়ে ব্যবহার করে ড্রাইভার বা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন। আগুনের মাঝে গিয়ে জানমাল রক্ষা করার সময় তার শরীরে আগুন স্পর্শ করবে না। ৪র্থ উদ্ভাবন ছিল অগ্নিনিরোধক হেলমেট। এটি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় আগুনে গলার শ্বাসনালী পুড়বে না। তার ৫ম উদ্ভাবনা ছিল প্রতিবন্ধীদের জীবন মান উন্নয়নে মোটরকার উদ্ভাবন। এটা বিদ্যুৎ বা পেট্রোল চালিত।

কৃষকদের স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র উদ্ভাবন ছিল তার ৬ষ্ঠ উদ্ভাবন। কৃষকরা দূর-দূরান্তের মাঠে জমিতে পানি দিতে আর ক্ষেতে যেতে হবে না। বাড়িতে বসেই সেচ যন্ত্রটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বন্ধ বা চালু করতে পারবেন। তাছাড়া এ যন্ত্রটি জমিতে পানির প্রয়োজন হলে নিজে নিজেই চালু হয় এবং পানির প্রয়োজন না থাকলে এটি নিজেই বন্ধ হয়ে যায়। দেশীয় প্রযুক্তিতে মিজান তার ৭ম উদ্ভাবন করেন ফ্যামিলি মোটরযান। ব্যবহারযোগ্য এ যানটি এলাকার মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। মিজানের ৮ম উদ্ভাবন পরিবেশ সেফটি যন্ত্র। এটি পরিবেশ রক্ষার্থে বহুমুখী কাজ করে থাকে। বাসা-বাড়ি, অফিস বা কলকারখানায় এটি ময়লা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। হাতের স্পর্শ ছাড়াই এ যন্ত্রটি পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার হয়। এ যন্ত্রটি উদ্ভাবনের পর ২০১৬ সালের ৫ জুন মিজান পরিবেশ পদক লাভ করেন। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে মিজান এ পর্যন্ত ৩৮টি সাফল্য সনদ ছাড়াও পেয়েছেন অসংখ্যা ক্রেস্ট ও সাফল্য পুরষ্কার।

ইতিমধ্যে মিজানের উদ্ভাবিত আবিষ্কৃত দেশীয় প্রযুক্তির মোটরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নে ছোট ছোট অ্যাম্বুলেন্স তৈরির পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে পরিবেশবান্ধব যন্ত্র আবিষ্কারে বিশ্ব পরিবেশ পদক নির্ধারিত হওয়ায় ৫ জুন-২০১৭ মিজানকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক দিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর।

মিজান জানান, তার স্বপ্ন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা এবং আরো নতুন নতুন উদ্ভাবন করা। এরই ধারাবাহিতকায় ২০১৯ সালে তিনি তৈরি করলেন পোড়া মবিল থেকে গ্যাস ও জ্বালানি তেল।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।