রক্তমাখা পোশাকেই জুমার নামাজ পড়েন আহত মুসল্লিরা

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৫ মার্চ) দুপুরে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা হয়। শহরের হাগলি পার্কমুখী সড়ক ডিনস এভিনিউতে আল নুর মসজিদ এবং লিনউডের আরেকটি মসজিদের কাছ থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। হামলায় ৪৯ জনের প্রাণহানি হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে নিউ জিল্যান্ড পুলিশ। এরইমধ্যে এ ঘটনায় ৪ সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে ৩ জন বাংলাদেশী রয়েছে বলে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে। এছাড়া হামলায় গুরুতর আহত হয়েছে ২০ জনের বেশি। আহতদের মধ্যেও ৫ বাংলাদেশী রয়েছে যাদের দুই জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে নারীসহ ৪ জনকে। এদিকে হামলার সময় আটকে পড়া দুজনকে রক্তমাখা কাপড় পরে মসজিদের পাশের রাস্তায় নামাজ পড়তে দেখা গেছে।

নিউজিল্যান্ড ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্টাফ এর প্রতিবেদনে হামলার পরবর্তী মুহূর্তের একাধিক ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানকার একটি ছবিতে দুই মুসলিম ব্যক্তিকে রক্তমাখা পোশাকে নামাজ পড়তে দেখে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘তিনি (বন্দুকধারী) ভিতরে ঢুকলেন এবং মসজিদের সবাইকে শ্যুট করা শুরু করলেন। তিনি আরও জানান, কমপক্ষে ৫০ বার গুলি ছুঁড়েছেন তিনি। তার সঙ্গে একাধিক ম্যাগজিন ছিলো। কয়েকশ রাউন্ড হতে পারে।

হামলাকারীর কাছে একটি বড় বন্দুক ও কয়েকশ রাউন্ড গুলি ছিলো। তিনি গায়ে মিলিটারিদের মতো পোশাক পরে ছিলেন বলে জানিয়েছেন হামলার সময় আটকে পড়া অপর এক ব্যক্তি। তার মাথায় হেলমেট থাকায় তার সম্পূর্ণ চেহারা দেখতে পারেননি তিনি। হাতের রক্ত কাপড় দিয়ে আটকে তিনি আরও জানান, হামলার সময় মসজিদের একটি গ্লাস হাত দিয়ে ভেঙ্গে তিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ সময় গ্লাসের সঙ্গে লেগে তার হাত কেটে যায়।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরও বলেন, ‘আমার জানালা ও দরজার গ্লাস ভেঙ্গে সবাইকে বের করতে হয়েছিলো। আমরা চেষ্টা করছিলাম, যেভাবেই হোক সবাইকে এই এলাকা থেকে দৌড়ে দূরে পাঠানোর। কিন্তু আমরা সবার জন্য দরজা খুলতে পারিনি।’

নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় সময় শুক্রবার দেড়টার দিকে মসজিদে হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভও করেন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী ওই শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী। ক্রাইস্টচার্চে ভিডিওটি অনলাইনে না ছড়াতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে পুলিশ।

দেশটির পুলিশ কমিশনার মাইক পুশ বলেছেন, এই ঘটনায় ৪ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এরমধ্যে একজন নারী রয়েছে। তবে আরো একজন বন্দুকধারী ‘সক্রিয়’ থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ।

আটক হামলাকারীদের একজন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। এছাড়া পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে বের হতে এবং রাস্তায় নামতে নিষেধ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত স্কুলও বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, ডানেডিনে সন্ত্রাসীরা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে শহরটিও ঘিরে রেখেছে পুলিশ। এছাড়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ক্রইস্টচার্চে সকল ধরণের বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ।

গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, অকল্যান্ডের ব্রিটমোর্ট ট্রান্সপোর্ট সেন্টার রেলস্টেশনে দুইটি পরিত্যক্ত ব্যাগ পাওয়া যায়। পুলিশ ও বোমা নিস্ক্রিয়কারী দল দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ‘নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ’ ঘটিয়ে বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয় বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্রাইস্টচার্চ শহর কর্তৃপক্ষ। এর আগে, ডানেডিন-ক্রাইস্টচার্চ বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ডানেডিনে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা রয়েছে এমন খবরের ভিত্তিতে সেখানে নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ।

কথা ছিল, সংবাদ সম্মেলনটা শেষ করে জুমা আদায় করতে ঠিক দেড়টা নাগাদ পার্শ্ববর্তী আল নুর মসজিদে যাবেন বাংলাদেশী ক্রিকেটাররা। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনটা দীর্ঘায়িত হয়েছিল বেলা ১টা ৪০ পর্যন্ত। হয়তো সেটাই রক্ষা করেছে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলকে।

সংবাদ সম্মেলন শেষ করেই জুমা ধরতে বাসে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বাসটি পৌঁছে গিয়েছিল যথাসময়েই। টিম টাইগারের সদস্যরা তখন মসজিদের সামনে পৌঁছেও গিয়েছিলেন। মসজিদে প্রবেশ করবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মসজিদের ভিতর থেকে মধ্য বয়সের এক নারী রক্তাক্ত অবস্থায় টলোমলো পায়ে বেরিয়ে এসে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান। তামিমরা তখনো বুঝতে পারেননি, আসলে কী ঘটছে ভিতরে। এরপরই ভেসে আসে সতর্কবাণী। একজন চিৎকার করে বলে ওঠেন, মসজিদের ভিতর গুলি চলছে।

অবস্থা দেখে তামিম, তাইজুল, মিরাজরা দ্রুত হেঁটে এসে বাসে উঠে পড়েন। এ সময় পুলিশ ওই রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ফলে বেশ কিছুক্ষণ বাসেই বসে থাকতে হয় তামিম, মুশফিকদের। তবে গুলির শব্দ ও আতঙ্কে তারা অনেকটা সময় বাসের ভেতর মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। এ ভাবে বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর নিরাপদে মাঠে ফিরে আসেন তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলন অনেক ক্রিকেটারের কাছেই একটি অস্বস্তিকর একটি বিষয়। বিশেষ করে দল হারতে থাকলে অস্বস্তি আরো বাড়িয়ে তোলে এসব অনুষ্ঠান। ফলে অনেকে এসব সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে যেতে পারলে বা তাড়াতাড়ি তা শেষ করে দিয়ে আসতে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কিন্তু শুক্রবার এ ঘটনার পর তামিমদের কাছে ওই সংবাদ সম্মেলনটি অনেক নিশ্চয়ই অনেক মধুর বলে মনে হচ্ছে। কারণ ওই সংবাদ সম্মেলন না থাকলে হয়তো তারা আরো আগেই মসজিদে পৌঁছে যেতেন। এমনকি ঠিক সময়মতো শেষ হলেও হয়তো হামলার মুখে পড়তে হতো বাংলাদেশ টিমকে।

দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুক্রবার সকালে লিটন দাস ও নাঈম হাসান ছাড়া দলের সবাই ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলে ওভাল মাঠে অনুশীলনে করেন। সেখান থেকেই আল নুর মসজিদে যাচ্ছিলেন জুমার নামাজে যোগ দিতে। এ দিনের হামলার পরই টুইট করেন তামিম ইকবাল। এ ঘটনাকে ‘ভয়ের অভিজ্ঞতা’ বলে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, পুরো দলই বন্দুকধারীর হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। সবাই আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।

চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখে কেঁদে ফেলেন দলের অন্যতম সদস্য মুশফিকুর রহিম। মাঠে ফিরেও আতঙ্ক কাটছিল না তাঁর। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মুখপাত্র জালাল ইউনুস জানিয়েছেন, দলের বেশির ভাগ সদস্য মসজিদে যাওয়ার জন্য বাসে ছিলেন। মসজিদে ঢোকার মুহূর্তে হামলার ঘটনাটি ঘটে। আল্লাহর রহমতে সবাই ভাল আছেন।

Spread the love
  • 927
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    927
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।