টিপস: মনোনয়ন না পেয়ে বা অভিমানে কেউ বিষ খেলে কী করবেন

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

নির্বাচনের সময় চলছে। অনেকেই আশা নিয়ে বিভিন্ন দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন। কেউ পেয়েছেন, কেউ পাননি। এতে রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে কেউ দল বদল করছেন, কারও বা বেঁচে থাকার ইচ্ছাও করছে না সমর্থকদের দুঃখে। এমন বিভিন্ন কারনে কেউ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে যে কেউ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। আবার কেউ মানসিকভাবে আঘাত পেয়ে রাগের বশবর্তী হয়ে জীবন ধ্বংসকারী কোন ওষুধ বা রাসায়নিক পান করে। এছাড়াও বড়দের অসতর্কতার কারণে বাচ্চারা ভুলবশত বিষ পান করে।

প্রায়ই বিষপানের রোগী পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কীটনাশক পান করা, অনেক পরিমাণে ঘুমের ঔষধ খাওয়া, কেরোসিন পান করা, ধুতরার বীজ খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া, কোনো ঔষধ ভুলক্রমে বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলা, বিষাক্ত মদ্যপান বা অতিরিক্ত মদ্যপান ইত্যাদি।

বিষপানের রোগী আসা মাত্র বিষপানের ধরন সম্পর্কে আন্দাজ করা সম্ভব। সাধারণভাবে বিষপানের পর দেরী না করে নিম্নরূপ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হাসপাতলে পাঠাতে হবে-

♣ রোগী শ্বাস নিতে না পারলে তাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিতে হবে

সজ্ঞান রোগীকে সর্বপ্রথম একগ্লাস পানি বা দুধ পান করানো ভালো। কারণ এতে বিষের ঘনত্ব কমে পাতলা হয়ে যায় ও বিষের ক্ষতির প্রভাব কমে আসে। শিশুদের ক্ষেত্রে আধা গ্লাসের মতো পানি বা দুধ রোগীকে পান করানো ভালো। অজ্ঞান রোগীকে অন্য কোনো তরল দেয়া যাবে না। তাকে সুবিধাজনক স্থানে শুইয়ে দিতে হবে।

রোগীকে বমি করানো উচিত কিনা- তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ সকল প্রকার বিষপানের পর বমি করানো উচিৎ নয়। রোগীর শরীরে খিঁচুনি থাকলে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রোগীকে বমি করানো যাবে না। কিছু বিষ যা প্রবেশের সময় মুখ, মুখগহ্বর ও অন্ননালীতে প্রদাহের বা দগ্ধতার সৃষ্টি করে অথবা ফুসফুসে প্রবেশ করে সংক্রমণের সৃষ্টি করে এরূপ বিষপানের রোগীকে কোনক্রমেই বমি করানো উচিত নয়। কারণ বমি করার সময় উল্লেখিত পদার্থগুলো পুনরায় পাকস্থলি থেকে উঠে আসার সময় দ্বিতীয়বার ক্ষতিসাধন করে ক্ষতের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।

♣ বিষের ধরণ:

  • পোড়া ও ক্ষত সৃষ্টিকারী বিষ
  • অম্ল বা এসিড
  • ক্ষার বা এলকালি
  • গৃহে ব্যবহৃত বিশোধক
  • গোসলখানা, পায়খানা, নর্দমা পরিষ্কারকারক বিশোধক (যেমন- হারপিক)
  • প্রদাহ সৃষ্টিকারী বিষ
  • কেরোসিন
  • তারপিন তেল
  • রঙ এবং রঙ পাতলাকারক দ্রব্য
  • পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি

♣ লক্ষণ:

রোগী কোন ধরনের বিষ পান করেছে তা রোগীর মুখ, মুখগহ্বর ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করলে অতি সহজেই অনুমান করা যায়। পোড়া ও ক্ষত সৃষ্টিকারী বিষপানে রোগীর মুখ ও মুখগহ্বরে পোড়া ক্ষত বা ফোসকা দেখা যাবে। কেরোসিন জাতীয় বিষপানে রোগীর শ্বাসে উক্ত দ্রব্যের গন্ধ পাওয়া যাবে।

♣ ৪ ঘণ্টার ভেতর বিষ খেয়ে থাকলে এবং জ্ঞান থাকলে রোগীকে নিম্নলিখিতভাবে বমি করানো যেতে পারে:

মুখের মধ্যে আঙুল প্রবেশ করিয়ে বমি করানো যায়। খারাপ স্বাদযুক্ত ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম স্বল্প গরম দুধসহ বা স্বল্প গরম লোনা পানি পান করালে অনেকেরই সহজে বমি হয়ে যায়। তিতা কোন দ্রব্য মুখের মধ্যে দিয়েও বমি করানো যেতে পারে।

বমি করানোর সময় বিশেষভাবে নজর দিতে হবে যেন বমিকৃত কোনো জিনিস বা পানীয় ফুসফুসে প্রবেশ না করে। এজন্য বমি করানোর সময় রোগীর মাথা নিচের দিকে ও মুখ পাশে কাত করিয়ে রাখতে হবে। হাসপাতালে রোগীকে বিষ অপসারণের ক্ষেত্রে রাইলস টিউবের (একটি বিশেষ নল) সাহায্যে করা যেতে পারে।

♣ বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর ঔষধ প্রয়োগ

কিছু বিষকে নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ রয়েছে। রোগী কোন বিষ দ্বারা আক্রান্ত তা জানতে পারলে সেই বিষকে নিষ্ক্রিয় করা ঔষধ প্রয়োগ করে রোগীর অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে।

♣ কেরোসিনের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে:

সাধারণত বাচ্চারা না বুঝে কেরোসিন তেল খেয়ে ফেলে। এ ধরনের রোগীর বমি, মুখ, শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রস্রাব ও কাপড় চোপড় থেকে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া যাবে। গলায় জ্বালাপোড়া ও ব্যথা থাকবে। পাতলা পায়খানা ও পেটে ব্যথা থাকবে। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন ঘন হবে। বুকের মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দ হতে পারে, জ্বর থাকতে পারে। নাড়ি দুর্বল ও অনিয়মিত হতে পারে।

এ ধরনের রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এই রোগীর স্টোমাক ওয়াশ দেয়া বা বমি করানো যাবে না। এ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে যাতে নিউমোনিয়া বা ফুসফুসে অন্য কোনো সংক্রমণ না হতে পারে।

♣ এসিড কিংবা ক্ষারের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে

রোগীকে বমি করানোর চেষ্টা করা যাবে না। ক্ষতের ওপর প্রলেপ সৃষ্টি করে এমন খাদ্যবস্তু যেমন- দুধ, ডিমের সাদা অংশ খাওয়ানো যেতে পারে। মুখ বা শরীরের কোনো অংশে এসিড অথবা ক্ষার পড়লে সেখানে প্রচুর পানি ঢেলে ধুয়ে ফেলতে হবে। এসিড খেলে এন্টাসিড সাসপেনশন দেয়া যেতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

♣ ঘুমের ঔষধে বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে বমি করানোর চেষ্টা করতে হবে

ঠিকমতো বমি করানো না গেলে স্টোমাক ওয়াশ করানোর জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

♣ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায়

আমাদের দেশের ক্ষেত-খামারে পোকা মারার জন্য অনেক ধরনের বিষ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া কেরোসিন, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি দিয়ে বিষক্রিয়া ঘটতে পারে। দুর্ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া বেশিরভাগ বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিষক্রিয়া চিকিত্সার চেয়ে এর প্রতিরোধ নিরাপদ এবং সহজ। নিজের ঘরবাড়ি, কর্মস্থলকে নিরাপদ রাখার জন্য কৃষক, কলকারখানায় ও মাঠে-খামারে নিয়োজিত কর্মী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, বাবা-মাসহ ছাত্র-ছাত্রী কিংবা ছেলেমেয়ে সবার ভূমিকা রয়েছে। যে কোনো ধরনের রাসায়নিক সামগ্রী নিরাপদভাবে ব্যবহার ও নাড়াচাড়া করুন। রাসায়নিক সামগ্রী নিরাপদে রাখুন। ব্যবহার করে তা সরিয়ে নিরাপদে রেখে দিন। কীটনাশক, ওষুধ ও পরিষ্কারকরণ সামগ্রী (ডেটল, স্যাভলন ইত্যাদি) শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।

আপনার প্রয়োজন নেই এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থ ঘরে রাখবেন না খাবার জিনিসের কোনো পাত্রে রাসায়নিক সামগ্রী রাখবেন না। ভুলবশত কেউ খাবার কিংবা পানীয় মনে করে খেতে বা পান করতে পারে। বর্ণহীন কোনো বিষাক্ত দ্রব্য বা রাসায়নিক নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। লেবেল না থাকলে প্রয়োজনে স্পষ্ট অক্ষরে মার্কিং করে রাখুন।

যথাযথ পরিমাণ ও যথাযথভাবে কীটনাশক, ওষুধ ও পরিষ্কারকরণ সামগ্রী ব্যবহার করুন। গায়ে আঁটা লেবেল পড়ে নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করুন। পড়তে না পারলে অন্য কারো সাহায্য নিন। লেবেলহীন পাত্র থেকে রাসায়নিক সামগ্রী ব্যবহার করা বিপজ্জনক। প্রয়োজনে দোকান থেকে লেবেলসহ সামগ্রী বদলিয়ে নিন।

ঔষুধ সেবন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত চিকিত্সকের পরামর্শ নিন।

লেখক: ক্বারী ইকরামুল্লাহ মেহেদী
পরিচিতি: শিক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মী
পেকুয়া, কক্সবাজার

Spread the love
  • 42
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    42
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।