সুদূর ফিজিতে ‘বাংলাদেশ’ নামে এক গ্রাম, যেখানে সবাই বাংলায় কথা বলে

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

ফিজিতে আমার যে ড্রাইভার ছিল, নাম তার কিষাণ, কিষাণ কুমার। ষাটোর্ধ্ব ভদ্রলোক নামে ও চেহারায় বাঙালী। সে যখন জানলো আমার বাড়ি বাংলাদেশে, তার প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো।

– খান, তুমি কি ব্ল্যাক ম্যাজিক জানো?
– কেন বলোতো?
– তোমার বাড়ি যে বাংলায়!
– বাংলার সাথে ব্ল্যাক ম্যাজিকের কী সম্পর্ক?
– আছে।
– দয়া করে আমাকে বলবে বাংলার সাথে ব্ল্যাক ম্যাজিকের সম্পর্কটা কী? এই একটা প্রশ্ন এখানে বহুবার শুনেছি। কিন্তু কেউ কারন বলেনি।

কিষাণ কিছু সময়ের জন্য যেন পাথর বনে গেল। চোখে মুখে ক্লান্তি। বয়সের ছাপ স্পষ্ট তার চেহারায়। বুক ভরে দম নিয়ে তিনি শুরু করলেন, “ছোটবেলায় আমি, আমার বাবা ও দাদাকে বাংলায় কথা বলতে দেখেছি। দুই একটা শব্দ আমিও বলতে পারতাম। তবে পরিবার থেকে আমাকে হিন্দিই শেখানো হয়েছিল। আমার দাদা বাংলা থেকেই এসেছিল। শুনেছিলাম তার বাড়ি ছিল কুচবিহার।”

– মানে তুমি বাঙালী?
– হ্যাঁ।
– তাহলে মায়ের ভাষা ছাড়লে কেন?
– বাংলা ভাষাভাষীদের ইংরেজ সাহেবরা কোন কাজ দিতেন না। আমরা তো আসলে দাস ছিলাম। কাজ না করলে খাবার পেতাম কীভাবে?
– কেন দিতেন না কাজ? আজব ব্যাপার!
– সে এক লম্বা ইতিহাস। শুনবে তুমি?
– আমি শুনব, বলো আমাকে।

– তুমি কি কখনও সিঙ্গাটোকা গিয়েছ?
– এইতো গত সপ্তাহে ঘুরে আসলাম পারমার সাথে।
– সেখানে বাংলাদেশ নামের একটা গ্রাম আছে। জানো?
– কী বলছ তুমি? জানা ছিল না আমার!
– যারা সেখানে বাস করে সবাই বাঙালী।
– কী অদ্ভুত! পারমা আমাকে এসব কিছুই বলেনি।

– হ্যাঁ, তাদের সাথে কেউ মেশে না।
– কেন মেশে না?
– বাঙালী বলে এবং ওরা অনেক গরীব।
– এর জন্য কি তোমার দাদা বাংলা শিখতে দেয়নি তোমাকে?
– হ্যাঁ।

কিষাণ বলেন, “দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচার জন্য সদ্য বিবাহিত বউকে নিয়ে ১৮৮৫ সালে সুরিয়া নামের জাহাজে চেপে বসেন আমার পিতামহ। ইংরেজ সাহেবরা বলেছিল ২ দিনের পথ। সেখানে অনেক খাবার আছে। কিন্তু ২ দিনের জায়গায় দুইসপ্তাহ যায়, ২ মাস যায়, এমন কি ৬ মাস চলে যায় সে পথ আর শেষ হয় না। চারিদিকে শুধু নীল আর নীল। জাহাজের মধ্যেই জন্ম হয় আমার বাবার।”

– তারপর?
– বাবা তখন ১৫ দিনের। সপ্তম মাসে প্রথম খালি চোখে ডাঙা দেখতে পায় তারা। দুইটা জাহাজ পাশাপাশি চলছিল। সুরিয়া হটাৎ খুব জোরে আঘাত করে নীচের রিফে। তলা ফেটে ডুবে যেতে থাকে জাহাজ। মোট ৫ হাজার ভারতীয় ছিল সে জাহাজে। তাদের মধ্যে মাত্র ১৫০০ জন সাঁতরে গিয়ে তীরে পৌঁছে। বাঁকি সবার সলিল সমাধি হয়।
– তোমার দাদী?
– সে মারা গিয়েছিল। দাদা খুব চেষ্টা করেছিলেন তাকে বাঁচানোর। পারেনি। শাড়ি পেঁচিয়ে যায় শরীরে। সদ্য সন্তান প্রসব করে তিনি খুব কাহিল ছিলেন। তীরও ছিল বেশ দূরে। আমার দাদা অবশ্য আর বিয়ে করেননি।
– তিনি তোমার দাদীকে ভীষণ ভালবাসতেন।
– হয়তো।
– দুঃখজনক।
– শুনেছি বাঙালীরা একটু অলস প্রকৃতির। যদিও তোমাকে দেখে তা মনে হয়নি।
– তুমি ঠিকই জানো। ইন্ডিয়ানরা এখানে কী করতো?
– কী আবার? আখের চাষ করতো।
– এবং সেই আখ অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে সুগার তৈরি করা হইত। রাইট?
– ঠিক ধরেছ।
– তারপর?
– তাহলে শোন সেই কাহিনী। কীভাবে বাঙালী কমিউনিটি ফিজির ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল।

কিষাণ বলতে শুরু করলো- একসাথে ৫টা জাহাজ এসেছে আখ নিতে। ১৯২০ সালের কথা। ইংরেজ সাহেবরা আলাদা আলাদা কমিউনিটির মানুষদের আলাদা আলাদা জাহাজ দিয়েছেন আখ বোঝাই করতে। কাজ করলে খাবার মিলত। মূলত তারা ছিল গিরমিট বা দাস। আর কাজ না করলে জুটতো বেত্রাঘাত।

গুজরাটি, তামিল, শিখ সবাই মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। একমাত্র বাঙালীরা সবাই গাছের ছায়ায় শুয়ে দিয়েছে ঘুম। সূর্য তখন মধ্যগগণ থেকে পশ্চিমে হেলে পড়েছে অনেকটা। ইংরেজ সাহেবরা সচারাচর সে সময় আসে না। সেদিন আসলেন। বাঙালীদের ঘুমন্ত দেখে তারা তো রেগে আগুন। কড়া ভাষায় নির্দেশ দিলেন বিকেল ৫টার মধ্যে জাহাজে আখ ভরতে হবে, নইলে ৩ দিনের খাবার বন্ধ।

বাঙালী সর্দারও রেগে গেলেন। ইংরেজ সাহেবকে ধমক দিয়ে বললেন, ৫টার সময় এসে কাজ বুঝে নিও।

৫টার সময় ইংরেজরা যখন ফিরে আসলেন জাহাজ তখন আখে পরিপূর্ণ! ইংরেজ সাহেব দেখে ভড়কে গেলেন! অন্যরা যে তখনও কাজ করছে। চারিদিকে রব পড়ে গেল। বাঙালীরা ব্ল্যাক ম্যাজিক জানে, নইলে এ জাহাজ এত অল্প সময়ে লোড দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব না!

ঐ ঘটনাটা যে তাদের জীবনে যে বিভীষিকা হয়ে নেমে আসবে তা তারা জানলো অল্প কিছুদিন পরেই। ব্ল্যাক ম্যাজিক জানে বলে কোন ইংরেজই আর তাদেরকে কাজ দেয় না। ফলে খাবার না খেতে পেয়ে একসময় তারা মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই ছেড়ে দিল নিজ ভাষা। তবে সিঙ্গাটোকার ওই একটা গ্রামের মানুষ গত প্রায় দেড়শত বছর ধরে এখনও বাংলায় কথা বলে। না খেয়ে থেকেছে তবুও মায়ের ভাষা ছাড়েনি। ভালবেসে গ্রামের নাম দিয়েছে বাংলাদেশ।

কিষাণের শেষের কটা লাইন যেন ছিল একেকটা বর্শা। আমার পাঁজরের হাড় ভেদ করে হৃৎপিণ্ডে গিয়ে সজোরে আঘাত করল। রক্তক্ষরণ আমি দেখিনি, তবে অনুভব করেছি। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

– খান, তুমি কাঁদছ?
– কিষাণ?
– বল।
– আমাকে নিয়ে যাবে সেখানে?
– যাব।

তার ঠিক ২ সপ্তাহ পর নিজ ভূখণ্ডের বাইরে এক নতুন বাংলাদেশ দেখলাম। যে বাংলাদেশে বাস করে এই বাংলারই পূর্বপুরুষ। যাদের নিজেদের কোন জমি নাই, মাথার উপরে ছাদ নাই, আছে খোলা আকাশ। যাদের পেটে ভাত নাই, তবে মুখে আছে ভাষা। বাংলা।

লেখক: আশানূর রহমান খান
কৃতজ্ঞতা: বিনয় ভদ্র

Spread the love
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।