সাইফউদ্দিন কি মাশরাফির বিকল্প হতে পারবে?

0

স্পোর্টস ডেস্ক:

খুব আহামরি ধরনের গতি নেই, কিন্তু নিশানা নিখুঁত। বল হাতে তিনি কতটা কার্যকর, সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্যাটিংয়েও ঝলসে উঠতে সক্ষম। আর নেতৃত্বগুণে তো তিনি অনন্যই। চোটে-চাপেও নত হন না। টাইগার বাহিনীতে ‘ভয়ডরহীন’ ক্রিকেটের বাণী দারুণভাবে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। সব মিলে তার কোনো বিকল্প নেই। বিকল্পহীন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

তবু বয়সের কারণে একটা সময় তাকে জাতীয় দল থেকে বিদায় নিতে হবে। তাই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য পেস অলরাউন্ডার খুঁজছেন নির্বাচকরা। অনেককে দিয়ে চেষ্টাও করিয়েছেন তারা। কিন্তু ফল হয়নি। তবে এবার হয়তো কাঙ্খিত সেই পেস অলরাউন্ডার পেয়ে গেছেন নির্বাচকরা। তিনি হচ্ছেন ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। যিনি একজন ডান-হাতি বোলার। কিন্তু বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান। সদ্য সমাপ্ত জিম্বাবুয়ে সিরিজের প্রথম দুই ওয়ানডে ম্যাচে দুর্দান্ত খেলেছেন তিনি। প্রথম ম্যাচে ব্যাট হাতে ঝলক দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে বল হাতে নজর কেড়েছেন। হয়েছেন ম্যাচসেরা।

বাংলাদেশ দলে বর্তমানে মাশরাফি বিন মর্তুজা অধিনায়ক হিসাবে বেশি সমাদৃত হলেও অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার আগে একজন পেস অলরাউন্ডার হিসাবে খ্যাতি ছিল তার। বর্তমানেও তিনি বল ও ব্যাট হাতে দলের জন্য ভূমিকা রাখেন। ব্যাটিংয়ের শেষ দিকে নেমে দলের রানটা দ্রুত বাড়িয়ে দেন। মাশরাফির হাতে শট আছে। চার-ছক্কা মারতে পারেন। দলের জন্য মাশরাফির ব্যাটিং অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। লোয়ার মিডল অর্ডার এবং টেলএন্ডারে যারা থাকেন অনেক সময় তাদের ঘাড়েই দায়িত্ব পড়ে ম্যাচ বের করে আনা। মাশরাফি অনেকবার এমন দায়িত্ব পালন করেছেন।

টাইগার বাহিনী কি এবার মাশরাফির উত্তরসূরি হিসাবে পেয়ে গেল মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে? গত ২১ অক্টোবর ছিল বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচ। এই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। ব্যাটিংয়ে নেমে দলীয় ১৩৯ রানে ৬ উইকেট হারায় টাইগাররা। এমন সময় ৭ম উইকেট জুটিতে ইমরুল কায়েসের সঙ্গী হন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। এই ম্যাচে তিনি দারুণ ব্যাটিং নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। দুজনে মিলে ১২৭ রানের জুটি গড়েন। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ওয়ানডেতে ৭ম উইকেট জুটিতে তাদের এই পার্টনারশিপই এখন সেরা। এদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো হাফ সেঞ্চুরি করেন সাইফউদ্দিন। ৫০ রান করে আউট হন তিনি। পরে বল হাতে ৭ ওভার বল করে ২৯ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকেন তিনি। ম্যাচটিতে বাংলাদেশ জয় পায় ২৮ রানে।

এরপর ২৪ অক্টোবর দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে বল হাতে ১০ ওভার বল করে ৪৫ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ১০ ওভারের মধ্যে একটি ওভার মেডেন ছিল। এদিনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো দুইয়ের অধিক উইকেট শিকার করেন তিনি। ম্যাচটিতে বাংলাদেশ জয় পায় ৭ উইকেটে। এদিন সাইফউদ্দিনের আর ব্যাটিংয়ে নামার প্রয়োজন হয়নি। তারপরও দুর্দান্ত বোলিংয়ের কারণে তিনি ম্যাচ সেরা হন। এই জয়ের মাধ্যমে সিরিজ জয় নিশ্চিত করে টাইগাররা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এদিনই প্রথমবারের মতো তিনি ম্যাচসেরার পুরস্কার পান।

গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের মাধ্যমে ওয়ানডেতে অভিষেক হয় সাইফউদ্দিনের। ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচে ব্যাট হাতে ১৬ রান করে বল হাতে কোনো উইকেট পাননি। গত জানুয়ারিতে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলেন এই তরুণ ক্রিকেটার। সেই ম্যাচেও খুব একটা ভালো করতে পারেননি। এরপর নিদাহাস ট্রফি, আফগান সিরিজ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ ও এশিয়া কাপ আর ডাক আসেনি তার।

কিন্তু সামনে বিশ্বকাপ। এখন থেকেই দল গোছানোর পরিকল্পনা করছে নির্বাচকরা। দলে একজন নির্ভরযোগ্য পেস অলরাউন্ডার খুঁজছেন নির্বাচকরা। যিনি বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে দলের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন। যার জন্য সাইফউদ্দিনকে পরখ করে দেখতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দলে নেন নির্বাচকরা। আর দলে সুযোগ পেয়ে ভালো করতে পেরে খুশি মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন।

গত ২৪ অক্টোবর ম্যাচসেরা হওয়ার পর সাইফউদ্দিন বলেন, ‘অনেক ভালো লাগছে। আসলে ক্রিকেট খেলাটা এমনই। বাইরে থাকব, আবার ফিরব, ভালো খেলব। ইনজুরির কারণে বা অফ ফর্মের কারণে বাইরে চলে যাব। এসব মাথায় নিয়েই খেলতে হয়। যেহেতু আমাকে বোলিং অলরাউন্ডার হিসাবে কাউন্ট করা হয় তাই আমার প্রথম স্কিল অবশ্যই বোলিং। বলে উইকেট পেলে বা ইকোনোমি বল করলে ভালো লাগে। পাশাপাশি ব্যাটিংটা। চেষ্টা করি দুইটা ভালো করার।’

দীর্ঘদিন পর দলে ফিরলেন। দলে সুযোগ পেয়ে ভালো করলেন। বোলিং নিয়ে কী ধরনের কাজ করেন। এমন প্রশ্নের উত্তরে সাইফউদ্দিন বলেন, ‘অবশ্যই কাজ করতে হয় প্রতিদিন। কিছুটা মেন্টালি কাজ করতে হয় সিনিয়রদের সঙ্গে। যেহেতু আগের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে ভালো করিনি, অনেক খরুচে ছিলাম। এগুলো নিয়ে কথা বলছি।’

ম্যাচ সেরা হওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে চেষ্টা ছিল দলের জন্য কিছু দিব। ম্যান অব দ্য ম্যাচ ভাবনায় ছিল না। ম্যাচ সেরা হওয়ায় কিছুটা অবাক হয়েছি। কিন্তু দল জিতেছে এটাই খুশি। প্রতিটি সিরিজ জেতাই আনন্দের। এর পাশাপাশি সবচেয়ে ভালো লাগছে আমাদের জেতার পেছনে সবসময় সিনিয়র প্লেয়ারদের অবদান থাকে। প্রথম দুই ম্যাচ জুনিয়র প্লেয়াররা অবদান রাখতে পারছে। সুযোগ পেলে ইনশাল্লাহ সবাই আরো ভালো করবে।’

সাইফউদ্দিনকে নিয়ে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেছেন, ‘ওকে দলে নেওয়ার পেছনে তো নিশ্চয়ই কারণ আছে। আমরা দুই জায়গায় পিছিয়ে ছিলাম। পেস বোলিং অলরাউন্ডার এবং রিস্ট স্পিনার। ও যদি এভাবে খেলতে পারে তাহলে আমরা রিকভার করতে পারব। আমরা তাহলে একধাপ উপরে যাওয়ার সুযোগ পাব। সুতরাং খুব ভালো যে, ও পারফর্ম করেছে। ওর নিজের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। আর যারা খেলেছে সবাই ভালো খেলেছে। এখন সেটা ধরে রাখতে হবে।’

মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন মূলত আলোচনায় আসেন ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের পর। সেবার বাংলাদেশ সেমিফাইনালে খেলেছিল। সাইফউদ্দিন ৬ ম্যাচ খেলে ১৩টি উইকেট শিকার করেছিলেন। এরপর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) সহ ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্য আসরগুলোতেও তিনি ভালো করে আসছেন।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি এখন পর্যন্ত ৩১ ম্যাচ খেলে ৩৮টি উইকেট শিকার করেছেন। লিস্ট এ ক্রিকেটে ৪৩ ম্যাচে তার উইকেট সংখ্যা ৬০টি। ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে ৩২ ম্যাচে ৩৮টি উইকেট শিকার করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি এখন পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে ফরম্যাটে খেললেও সাদা পোশাকের ক্রিকেটে এখনো খেলা হয়নি তার। নিয়মিত ভালো করতে থাকলে তিনি লংগার ভার্সনের ক্রিকেটেও হয়তো দ্রুত খেলার সুযোগ পাবেন। টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা হয়তো আগামী বছরের আইসিসি বিশ্বকাপ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরে যেতে পারেন। তিনি চলে গেলে অধিনায়কের দায়িত্ব হয়তো সিনিয়রদের মধ্যে কেউ একজন নিবেন। কিন্তু পেস অলরাউন্ডারের ভূমিকা কে পালন করবেন? হয়তো মাশরাফির উত্তরসূরি সাইফউদ্দিনই এই দায়িত্বটা সামলাবেন?

Spread the love
  • 108
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    108
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।