প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘আকাশবীণা’ নামের ড্রিমলাইনার আসছে ১৯ আগস্ট

0

অর্থনীতি ডেস্ক:

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে বিশ্বখ্যাত উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের তৈরি ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। আগামী ১৯ আগস্ট বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে এই আকাশযান। দেশে ফেরার পর প্রথম ড্রিমলাইনারকে ওয়াটার ক্যানন স্যালুটের মাধ্যমে স্বাগত জানানোর উদ্যোগও নিয়েছে এয়ারলাইন্সটি। এটি গ্রহণ করতে সোমবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) এনামুল বারীসহ একটি প্রতিনিধি দল সিয়াটলে বোয়িং কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে গেছেন।

জানা গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০০৮ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ১০টি বিমান ক্রয়ের জন্য ২.১ বিলিয়ন ইউএস ডলারের চুক্তি করে। এর মধ্যে ৪টি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর ও ২টি ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ ইতোমধ্যে বহরে যুক্ত হয়েছে। ৪টি ড্রিমলাইনারের ১টি আসছে ১৯ আগস্ট। বাকি ৩টির ১টি এ বছরে ও অন্য ২টি আসবে ২০১৯ সালে।

বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ জানিয়েছেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর ড্রিমলাইনারের প্রথম ফ্লাইট উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিন রাতে ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর যাবে বিমানটি। ড্রিমলাইনার দিয়ে ঢাকা-সিঙ্গাপুর ও ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।

বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হতে যাওয়া ৪টি ড্রিমলাইনারের নাম পছন্দ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো— আকাশবীণা, হংসবলাকা, গাঙচিল ও রাজহংস। ১৯ আগস্ট বহরে যুক্ত হতে যাওয়া ড্রিমলাইনারটি হলো আকাশবীণা। ইতোমধ্যে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি থেকে নেওয়া হয়েছে এর নিবন্ধন (এস২-এজেএস)।

আকাশবীণায় আসন সংখ্যা থাকছে ২৭১টি। এর মধ্যে বিজনেস ক্লাস ২৪টি আর ২৪৭টি ইকোনমি ক্লাস। দুটি ক্লাসেই একই সারিতে রয়েছে ৬টি আসন। বিজনেস ক্লাসের আসনগুলো ৬৫ ইঞ্চি পিচ, ইকোনমি ক্লাসেরগুলো ৩১ ইঞ্চি পিচ। বিজনেস ক্লাসে ২৪টি আসন ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত সম্পূর্ণ ফ্ল্যাটবেড হওয়ায় যাত্রীরা আরমদায়কভাবে বিশ্রাম নিতে পারবেন। দু’পাশের প্রত্যেক আসনের পাশে রয়েছে বড় আকারের জানালা। একইসঙ্গে জানালার শাটার বন্ধ করা ও খোলা যাবে বোতাম টিপে। জানালা থেকে শুরু করে কেবিনেও রয়েছে মুড লাইট সিস্টেম। ফলে যাত্রীরা সহজেই পরিবর্তন করতে পারবেন লাইটিং মুড।

শুধু আরামদায়ক নয়, ভ্রমণকে নিরাপদ করতে ড্রিমলাইনারের অবকাঠামোতে থাকছে নতুনত্বের ছোঁয়া। কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি হওয়ায় এই বিমান ওজনে হালকা। ভূমি থেকে বিমানটির উচ্চতা ৫৬ ফুট। দুটি পাখার আয়তন ১৯৭ ফুট। এর মোট ওজন ১ লাখ ১৭ হাজার ৬১৭ কিলোগ্রাম, যা ২৯টি হাতির সমান! এর ককপিট থেকে টেল (লেজ) পর্যন্ত ২৩ লাখ যন্ত্রাংশ রয়েছে।

টানা ১৬ ঘণ্টা উড়তে সক্ষম এই ড্রিমলাইনার আকাশে ওড়াতে অন্যান্য বিমানের তুলনায় ২০ শতাংশ কম জ্বালানি লাগবে। এটি ঘণ্টায় ৬৫০ কিলোমিটার বেগে উড়তে সক্ষম। বিমানের শব্দ কমাতে ইঞ্জিনের সঙ্গে শেভরন যুক্ত রয়েছে। বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হবে ইলেট্রিক ফ্লাইট সিস্টেমে।

ড্রিমলাইনারের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট (আইএফই) সেবা দিতে প্যানাসনিক এভিওনিক্স কর্পোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিমান। প্রতিটি আসনের সামনে প্যানাসনিকের এলইডি এস-মনিটর রয়েছে। মনিটিরে বিবিসি, সিএনএনসহ ৯টি টিভি চ্যানেল দেখা যাবে। একইসঙ্গে ড্রিমলাইনারের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেমে (আইএফই) থাকবে ১০০টির বেশি ক্ল্যাসিক থেকে ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র। এছাড়া রয়েছে বিমানের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত গেমস।

অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৩ হাজার ফুট দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময়ও ওয়াইফাই সুবিধা পাবেন যাত্রীরা। বিমানে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে প্রত্যেক যাত্রী ১৫ মিনিটের জন্য বিনামূল্যে ১০ মেগাবাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। এরপরও কোনও যাত্রী ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে চার্জ দিতে হবে। ১০০ মেগাবাইটের জন্য ৮ ডলার, ৩০০ মেগাবাইটের ১৬ ডলার আর ৬০০ মেগাবাইটের জন্য ৩২ ডলার হারে চার্জ দিতে হবে যাত্রীদের।

এছাড়া মোবাইল ফোনে রোমিং সুবিধা থাকলে আকাশে উড্ডয়নের সময় কল করতে পারবেন যাত্রীরা। এজন্য ২৫টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে করা হয়েছে চুক্তি। বিমানটি যে স্থানের ওপর দিয়েই যাবে, যাত্রীদের সামনে তখন স্ক্রিনে দেখা যাবে থ্রিডি ম্যাপ। একইসঙ্গে উঠে আসবে সেই স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

ড্রিমলাইনারে ভ্রমণকালীন যাত্রীরা চাইলে আকাশে কেনাকাটাও করতে পারবেন। এই উড়োজাহাজে অলঙ্কার ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন পণ্য কেনা যাবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়। যাত্রীদের পছন্দমতো খাবারও থাকবে ড্রিমলাইনারে। দীর্ঘ সময় ভ্রমণেও যাত্রীরা যেন ক্লান্তি অনুভব না করেন সেজন্য এর ভেতরে এয়ার কম্প্রেসার সিস্টেম অন্যান্য বিমানের তুলনায় উন্নত।

বিমানটির ককপিটেও রয়েছে নতুনত্ব। সেখানে থাকছে হেডআপ ডিসপ্লে। এর মাধ্যমে চোখের সামনের প্রয়োজনীয় তথ্য দেখতে পারবেন পাইলটরা। সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঢাকায় বিমানের ফ্লাইট অপারেশন রুমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এটি। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, ককপিট, ফুয়েল, নেভিগিয়েশনসহ সব তথ্য জানতে পারবেন ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তারা। যেকোনও সমস্যা সৃষ্টি হলে তারা অপারেশন রুম থেকে পাইলটকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারবেন।

ফ্লাইট শেষে দেশে ফেরার আগেই ড্রিমলাইনারের কোনও সমস্যা আছে কিনা তা জানতে পারবেন প্রকৌশলীরা। তাই ত্রুটি পেলে বিমানটি দেশে পৌঁছানোর আগেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন তারা। ফলে যেকোনও সময় ককপিট থেকে ফ্লাইট অপারেশন রুমের সহায়তা নিতে পারবেন পাইলটরা। একইসঙ্গে আকাশে ওড়ার সময় আইপ্যাড ও ট্যাব ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য নিতে পারবেন তারা।

ড্রিমলাইনার পরিচালনার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বিমানের ১৪ জন পাইলট। এছাড়া ড্রিমলাইনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে প্রকৌশল বিভাগের ১১২ জনকে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।