বাবার পিটুনির ভয়ে পলাতক ফয়সালের ৩ মাসের দুঃসাহসিক অভিযান

0

সময় এখন ডেস্ক:

শুধুমাত্র বাবার হাত পিটুনি খেতে হবে- এই ভয়ে ঘর থেকে পালিয়ে চাঁদপুর, ভোলা, ঢাকা ঘুরে নীলফামারী পর্যন্ত চলে যাওয়া ১০ বছর বয়সী ফয়সালের খোঁজ মিলেছে। আহার জোটাতে সাড়ে ৩ মাস সময়ের পলাতক জীবনে করতে হয়েছে দোকানে দোকানে পানির টানার কাজ। শেষ পর্যন্ত বাবা-মার মৃত্যুর মিথ্যে গল্প সাজিয়ে নীলফামারীর এক পরিবারে আশ্রয়ও জুটিয়ে নিয়েছিল শিশু ফয়সাল হোসেন।

এত কিছু করেও শেষ রক্ষা হয়নি। ঠিকই তাকে খুঁজে বের করে বাবার হাতে তুলে দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পিরোজপুর জেলার কলাখালী ইউনিয়নের উদয়কাঠি গ্রামের হাফিজুর রহমানের ছেলে ফয়সাল চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার অন্তর্গত কাজীর হাট মুন্সি বাড়ি এলাকাতে নিজ পরিবারের সাথেই থাকত। চান্দগাঁও থানার চররাঙামাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে পড়ত সে।

ফয়সালের বরাত দিয়ে পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, গত ২৫ এপ্রিল তার ইংরেজি পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা দুপুরে হবে মনে করে ওইদিন বেলা সোয়া ১১টায় সে বাসা থেকে স্কুলের বের হয়। স্কুলে গিয়ে জানতে পারে সকালেই পরীক্ষা হয়ে গেছে। পরীক্ষা দেয়নি শুনলে বাবা অনেক মারবে এই ভয়ে সে আর বাসায় ফেরেনি। এদিকে ছেলের খোঁজ না পেয়ে গত ২ মে ফয়সালের বাবা প্রতিবেশী এক দম্পতিকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাও করেছিলেন।

আরও পড়ুন  ১ বছর ১০ মাসের শিশুও রক্ষা পেলো না ধর্ষকের লালসা থেকে!

সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই মো. জাহেদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডেও নিয়েছিলেন। কোনো তথ্যই তখন পাননি। মামলার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি ফেসবুকে ছেলেটার ছবিসহ একটি নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিই। সেটি নীলফামারীতে ফয়সালকে আশ্রয় দেওয়া বাড়ির মালিকের চোখে পড়ে। ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে গত বৃহস্পতিবার ফয়সালকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শনিবার আদালতে হাজির হয়ে ১০ হাজার টাকা বন্ডের বিনিময়ে ছেলেকে বুঝে পান হাফিজুর রহমান। এর আগে মহানগর হাকিম আল ইমরান খানের আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয় ফয়সাল।

পলাতক জীবন: দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে বেঁচে থাকার চেষ্টা

জবানবন্দিতে ফয়সাল শুনিয়েছে তার দুঃসাহসিক সাড়ে তিন মাসের গল্প। ফয়সালের জবানবন্দিতে জানা যায়, বাবার পিটুনির ভয়ে বাসায় না গিয়ে পালিয়ে টেম্পোতে চড়ে নগরীর লালদীঘির পাড়ে মেলায় যায় সে। সেখান থেকে বাসে করে নিউ মার্কেট, তারপর হেঁটে চট্টগ্রাম রেল স্টেশন। স্টেশনে স্কুলের পোশাক খুলে ২০ টাকায় একটি টি-শার্ট কিনে নেয় যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে। তারপর স্টেশনের বিভিন্ন দোকানে পানি টানার কাজ নেয় সে। ওই কাজে দিনে তার ২০০ টাকা করে উপার্জন হত।

আরও পড়ুন  বন্ধুকে হত্যা করে লাশের নিয়ে একই ঘরে ৫৬ দিন!

১ মাস পর পানি টানার কাজ করতে আর ভালো না লাগায় নানা বাড়ি ভোলা যাওয়ার পরিকল্পনা করে ফয়সাল। কিন্তু নগরীর অলঙ্কার মোড়ে গিয়ে ভোলার কোনো গাড়ি না পেয়ে আবার রেল স্টেশনে ফেরে সে। এরপর ট্রেনে চড়ে চাঁদপুর এবং সেখান থেকে বাসে করে ভোলা গেলেও নানা বাড়ির বিস্তারিত ঠিকানা না জানায় সেখানে পৌঁছাতে পারেনি ফয়সাল।

সেখান থেকে ফয়সাল ঢাকা চলে যায়। ৮ম রোজার দিন ঢাকা থেকে নীলফামারী যাওয়ার বাসের ছাদে চড়ে বসে সে। এরপর নীলফামারী পৌঁছে ট্রাফিক মোড়ে রাত ১২টা পর্যন্ত বসে থাকে, কোথায় যাবে ভেবে না পেয়ে। তারপর সেখান থেকে কহিদুল ইসলাম নামের একজন তাকে নীলফামারীর (সদর থানা) ওসির কাছে নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রামে 'পাঠাও' চালক কর্তৃক চিকিৎসককে ধর্ষণচেষ্টা, গ্রেফতার

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই মো. জাহেদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, থানায় ফয়সাল বলে তার মা বাসাবাড়ির কাজ করত এবং বাবা ট্রাক্টর চালাত, দুর্ঘটনায় তারা মারা গেছে। এ তথ্য পেয়ে নীলফামারী ওসি তাকে কহিদুল ইসলামের আশ্রয়েই রাখেন। ওই বাড়ি থেকেই পরে আমরা তাকে উদ্ধার করি।

উল্লেখ্য, ফয়সাল এর আগে আরও ৩ বার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল বলে জানান এসআই জাহেদুজ্জামান।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।