‘এতিম’ শেখ হাসিনার জন্য রিক্সা চালিয়ে জমি কিনে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন বঙ্গবন্ধুপ্রেমি হাসমত

0

ফিচার ডেস্ক:

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের রাওনা ইউনিয়নের রিক্সাচালক হাসমত আলীর স্ত্রী রমিজা খাতুন। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে হাসমত আলী মারা গেছেন ৭ বছর আগে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সেই হাসমতের ছিল বিরল ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার প্রকাশও তিনি করেছিলেন বিরল এক ভাষায়। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে হাসমত আলী পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। পরে রিক্সা-ভ্যান চালিয়ে তিলে তিলে জমানো টাকা দিয়ে মৃত্যুর ১ বছর আগে নিজের গ্রাম বাড়ইলে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি কেনেন শেখ হাসিনার নামে। হাসমত আলী বলতেন, ‘শেখ হাসিনা আমার মেয়ে। মেয়েটা এখন এতিম।’

বছরখানেক পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা না পেয়ে হাসমত আলী মারা যান। তবু সেই জমি তিনি বেচতে দেননি। স্বামীর মৃত্যুর পর হাসমত আলীর ছেলে তার মা রমিজা খাতুনকে ভরণপোষণ করেনি। তখন নিজের বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে তিনি বেছে নেন ভিক্ষাবৃত্তির পথ। রাজধানীর একটি বস্তিতে অসুস্থ রমিজা মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। এত কষ্টের মধ্যেও জমিটি বিক্রির কথা ভাবেননি তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি হাসমত আলীর এই বিরল ভালোবাসা ও রমিজা বেগমের জীবনযুদ্ধ নিয়ে ২০১০ সালের ৩ জুন পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সচিত্র প্রতিবেদনটি দেখে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে রমিজাকে নিয়ে আসার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। রমিজাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওই দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান রমিজা খাতুন।

সেখানে অবতারণা হয় একজন প্রধানমন্ত্রী ও একজন নিঃস্ব নারীর মধ্যে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যের। শেখ হাসিনা আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘হাসমত আলীর মতো আওয়ামী লীগের সমর্থক যত দিন বাংলাদেশের মাটিতে থাকবে, তত দিন আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। সারা দেশের এমন হাসমত আলীদের দোয়া আর ভালোবাসার কারণেই আমি সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে গেছি।’ রমিজাকে জড়িয়ে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার আর কষ্ট করতে হবে না। আমি আপনার সবকিছু দেখব।’ রমিজা বলেন, ‘মাগো, তুমারে একনজর দেখার জন্য অনেক ঘুরছি। তুমি আমার সামনে একটু বসো, তুমারে দুই চোখ ভইরা দেখি।’

রমিজা খাতুন জমির দলিলটি শেখ হাসিনার হাতে দিয়ে বলেন, ‘মাগো, জমির দলিল তোমার কাছে রাখো। আমি আর এই জিনিস রাখবার চাই না। আইজ যদি তিনি (হাসমত আলী) বাঁইচা থাকতেন, তাইলে কী খুশি হইতেন! মরার আগেও তোমার জন্য দোয়া করছে। তোমার কিছু হইব না, মা। আল্লাই তোমারে বাঁচাইয়া রাখব।’ প্রধানমন্ত্রীকে ধরে রমিজা খাতুন মৃত স্বামীর উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘তোমার মেয়ে হাসিনা আমাকে ডেকে খোঁজখবর নিয়েছে। তার জন্য তোমার কেনা জমিতে আমার থাকার ঘর আর খামার করে দিতে চেয়েছে। মেয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আমার আর চাওয়ার কিছু নাই।’

অসহায় রমিজা খাতুনের সব দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নির্দেশ দেন, গফরগাঁওয়ের ওই জমিটি দ্রুত উদ্ধার করে সেখানে হাসমত আলীর কবরটি পাকা করে বাঁধাই করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী সেখানে রমিজার জন্য একটি বাড়ি তৈরি এবং গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া রমিজা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন তাঁকে প্রতি মাসে ভাতা প্রদানের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন থেকে রমিজাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা হবে বলে তিনি জানান।

হাসমত আলীর কেনা জমি রমিজাকে ফিরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই জমিতে তৈরি করে দেন একটি একতলা টিনশেড বিল্ডিং। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে গফরগাঁওয়ে গিয়ে ওই বাড়ি রমিজা খাতুনের হাতে বুঝিয়ে দেন।

© মুহাম্মদ শাহরিয়ার খান

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।