কিশোর রোনালদিনহোকে লেখা বড় রোনালদিনহোর সেই বিখ্যাত চিঠিটা!

0

।। মানিক চন্দ্র দাস ।।

প্রিয় আট বছর বয়সী রোনালদো,

কাল যখন তুই মাঠ থেকে বাড়িতে ফিরবি, দেখবি বাড়িতে অনেক লোক। ভাই, চাচা, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন। কেউ আবার বসে আছে কিচেনে, ওদের তুই চিনিসই না। প্রথমে দেখে মনে হবে কচুর পার্টিটাতে দেরীই হয়ে গেলো আজকে। রবার্তোর জন্মদিনে সবাই এসে পার্টিও শেষ! আজ ভাইয়ার ১৮ তম জন্মদিন ছিলো।

সাধারণত বাড়ি আসলে তো দেখিস মা খুব হাসাহাসি করছে, গান গাইছে…আজকে দেখবি মা কাঁদছে। তোর জন্যে দৃশ্যটা খুব অপরিচিত, তাই না?

হঠাৎ করেই দেখবি রবার্তো আসছে তোর দিকে। তোকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাবে বাথরুমে। ওখানে কেউ নেই। রবার্তো তোর সাথে আসলে একটু আলাদা করে, একা কথা বলতে চাইছে।

“একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আমাদের বাবা নেই।”

এইসব কথার কোন অর্থ আছে? তোর মনে হবে, এইসব কী কথা! কোন মানে আছে? আসবে কখন বাবা? নেই হয় কীভাবে একটা মানুষ?

মাঠে এই একজন মানুষই তো খুব সৃষ্টিশীল ফুটবল খেলে, এই মানুষটাই বলেছে একেবারে ফ্রি স্টাইলে খেলতে—বলটার সাথে শুধু খেলতে। এই একটা মানুষেরই তো তোর উপর খুব বিশ্বাস। রবার্তো গতবছর যখন গ্রেমিওতে পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করলো, তখন বাবা-ই তো সবাইকে ডেকে ডেকে বলছিলো, রবার্তো ভালো খেলে কিন্তু চোখ রেখো ওর ছোটটার দিকে। ঐ ব্যাটা আসছে।

বাবা ছিলেন সুপারহিরো। ফুটবলটাকে মানুষটা এত ভালোবাসতেন যে, সারা সপ্তাহ শিপইয়ার্ডে কাজের পরেও সাপ্তাহিক ছুটিটা গ্রেমিওর স্টেডিয়ামের সিকিউরিটি হিসেবে কাজ করতেন। এই মানুষটা কীভাবে এরকম নেই হয়ে যায়! রবার্তোর কথা কিন্তু তোর মাথাতেই ঢুকবেনা। একেবারেই না।

তখন কোন গাঢ় বিষাদ তোকে ছুঁতে পারবে না। ওরা আসবে পরে। এর কয়েকবছর পর তুই সত্যি বুঝে ফেলবি বাবা আর আসবেনা। এই পৃথিবীতে মৃতেরা ফিরে আসেনা। কিন্তু একটা জিনিস তোকে বুঝতে হবে, যখনই তোর পায়ে বল আসবে, বুঝবি বাবা তোর সাথেই আছেন, পাশেই আছেন। আমি চাই তুই এই সত্যটা বুঝে নিবি।

তোর পায়ে যখন ফুটবল, তখন তুই মুক্ত। সুখী। অনেকটা গান শুনলে যে অনুভূতিটা আসে, ওরকম। এই অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে একসময় চাইবি অপার্থিব আনন্দটুকু সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে।

তোর তো কপাল ভালো। তোর জন্যে রবার্তো আছে। তোর চেয়ে বছর দশেকের বড়, গ্রেমিওতে খেলছে, তাও মানুষটা তোর পাশে থাকবে। সবসময়। রবার্তো শুধু তোর ভাই না, রবার্তো একসময় হবে তোর বাবার মতো। কিংবা তার চাইতে বেশি কিছু, ওই হবে তোর হিরো।

তুই চাইবি ওর মতো খেলতে, হতে চাইবি ওর মতোন। প্রতিদিন সকালে গ্রেমিও ক্লাবে যখন লকার রুমটায় ঢুকবি, রবার্তোর সাথে খুব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইবি ওর দিকে। তোর হিরো, আইডল। রবার্তো যখন গ্রেমিও সিনিয়র টিমে তুই জুনিয়র টীমে। এই স্টারের সাথে যখন যখন হাঁটবি, মাথায় শুধু একটাই থাকবে চিন্তা, আমি ওর মতো হবো। কবে আমার আইডলের সাথে লকার রুম শেয়ার করবো?

তোর বেডরুমের দেয়ালে কোন পোষ্টার নেই, কোন খেলোয়াড়ের পোষ্টার নেই। আছে একটা ছোট্ট টেলিভিশন। টিভি থাকা না থাকাতে অবশ্য কিছু যায় আসেনা, কারন ও বস্তু দেখার কোন সময় তোর হাতে নেই। রবার্তোর সাথে বসে একসাথে খেলা দেখা হয়না। রবার্তো এমনিতেই নিজের খেলা নিয়ে খুব ব্যস্ত। আর যখন খেলা না থাকে তখন তোকে ধরে নিয়ে যায় মাঠে, খেলার জন্যে। বেশি বেশি খেলতে হবে।

তুই যেখানে থাকিস, জায়গাটার নাম পোর্তো অ্যালেগ্রে। গ্যাং আর ড্রাগ দিয়ে সয়লাব। ওখানে থাকাটা খুব কঠিন। কিন্তু যখন তুই ফুটবল নিয়ে থাকবি, যতক্ষণ নিয়ে থাকবি—সেটা হোক রাস্তায় বা পার্কে কিংবা তোর কুকুরের সাথে-নিরাপদ বোধ করবি একেবারে বুকের ভেতর থেকে।

আরে হ্যাঁ, তোর কুকুরের কথাই বলেছি। তোর কুকুর হচ্ছে ক্লান্তিহীন এক ডিফেন্ডার।

রবার্তোর সাথে খেলবি। অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলবি, পার্কে খেলবি বুড়োদের সাথে। সবাইতো একটা সময় ক্লান্ত হয়, ক্লান্তি ভর করে সবারই—কিন্তু তোর তো তখনও খেলতে হবে। তাই তো সাথে সবসময় আছে কুকুর বমবম। বমবম একটা স্মার্ট, সত্যি সত্যি ব্রাজিলিয়ান কুকুর। ব্রাজিলিয়ান কুকুররাও ফুটবল ভালোবাসে। তোর ড্রিবলিং মকশো করার জন্যে বমবম খুব সাহায্য করবে তখন…এবং সম্ভবত “ইলাস্টিকো”র প্রথম শিকার।

কয়েকবছর পর যখন ইওরোপে খেলতে যাবি, তখন কয়েকজন ডিফেন্ডার আবার তোর বমবমের কথা মনে করিয়ে দেবে।

তোর শৈশবটা হবে একেবারে আলাদা রকমের। যখন তোর বয়স ১৩, ততদিনে লোকে তোকে নিয়ে কথাটথা বলা শুরু করে দিয়েছে। বলে তুই কত স্কিলড, কী রকম কারিকুরি করতে পারিস!

ওগুলো নিয়ে সবাই কথা বলবে। তখনও পর্যন্ত কিন্তু ফুটবলটা তোর কাছে নিছক একটা খেলা। কিন্তু ১৯৯৪ সাল? এই সালটার বিশ্বকাপ তোকে দেখিয়ে দেবে ফুটবলটা নিছকই একটা খেলা না। আরো বেশি কিছু।

১৭ই জুলাই, ১৯৯৪। প্রতিটা ব্রাজিলিয়ানের মনে আছে তারিখটা। ঐদিনটায় তুই গ্রেমিও ইয়ুথ টীমের সাথে বেলো হোরিজন্টেতে ম্যাচ খেলতে গেছিস। বিশ্বকাপ ফাইনাল টিভিতে দেখাচ্ছে। ফাইনালে ব্রাজিল বনাম ইতালী। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস, ক্যানারিনহোরা ২৪ বছর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে। গোটা দেশ থমকে গেছে। সব চুপচাপ, পিনপতন নীরবতা চারদিকে।

বেলো হোরিজন্টের চারদিকে শুধু ব্রাজিলের পতাকা। হলুদ-সবুজ ছাড়া আর কোন রঙ নেই কোনদিকে। শহরের প্রতিটা কোনায় ম্যাচ চলছে, লোকে লোকারণ্য চারিদিক।

তুই খেলাটা দেখছিস তোর টিমমেইটদের সাথে। খেলাটা শেষ হলো শুন্য শুন্য গোলে। খেলা গড়ালো পেনাল্টি শ্যুট আউটে।

প্রথম শটটা ইতালির, মিস। ব্রাজিলেরও মিস হলো। এরপর ইতালীর গোল…এরপর এলেন রোমারিও। তার শটটা বাঁ দিকে বাঁক খেয়ে লাগলো পোষ্টে…বল কীভাবে যেন ঢুকেও গেলো জালে। দলের সবার চিৎকারে কান পাতা দায় হলো।

ইতালির গোল…চারিদিক আবার শুনশান।

ব্রাঙ্কো গোল দিলেন…তাফারেল একটা সেইভ করে ফেললো…এরপর দুঙ্গা গোল করে ফেললেন…

এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! সোনাঝরা এই সময়টা বদলে দেবে তোর জীবনটা, সাথে মিলিয়ন ব্রাজিলিয়ানের…

শট নিতে এলেন ব্যাজ্জিও। ইতালির সুপারস্টার…

মিস করলেন ব্যাজ্জিও…

ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

ঐ যে পাগলের মতো উদযাপন, ওতেই পরিস্কার হয়ে যাবে তোর কাছে যে বাকী জীবনটা তুই কী করতে চাচ্ছিস। এতদিনে তোর মাথাতে ঢুকবে ফুটবল ব্রাজিলিয়ানদের জন্যে কী, কোন জায়গায় ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবলটাকে ধরে রেখেছে। খেলার শক্তিটা তোকে ছুঁয়ে যাবে এই প্রথম। সবচে জরুরী যে বিষয়টা তোর চোখে লেগে থাকবে তা হচ্ছে তুই দেখে ফেলবি আমজনতাকে কত সহজে এই ফুটবলটা দিয়েই খুশি করে ফেলা যায়!

নিজেই নিজেকে বলে ফেলবি স্বগোতোক্তির মতোন, “আমি ব্রাজিলের হয়ে খেলবো”।

সবাই যে তোর কথাটা বিশ্বাস করবে তা না, তুই যেভাবে খেলিস তাতে তাই হবার কথা কিন্তু।

কিছু কোচ থাকবে—আসলে একজন-উনি তোকে বলবেন যেভাবে খেলিস এভাবে খেলা যাবেনা। উনি ভাববেন তোকে আরো সিরিয়াস হতে হবে, এত বেশি যে ড্রিবলিং করিস, এটাকে কমাতে হবে। উনি তোকে বলেও দেবেন, “তোকে দিয়ে ফুটবলটা হবেনা রে।”

এই শব্দগুলোকেই প্রেরণার উৎস করে নিবি তুই। এই শব্দগুলোকে মাথার মধ্যে গেঁথে লক্ষ্যটাতে স্থির থাকবি। এরপর ভাববি আসলে এই ফুটবল খেলাটা খুব সুন্দর করে কারা খেলেছেন—দেনের, ম্যারাডোনা, রোনালদো।

বাবা কী বলতেন, সেটা আসবে মাথার ভেতর আবার, মুক্ত হয়ে খেল।

বলটাকে দিয়ে খেল।

আনন্দ নিয়ে খেল।

এ এক অন্য দর্শন, অনেক কোচ কথাগুলোকে বুঝবেই না। কিন্তু মজাটা হচ্ছে, মাঠেতো তুই নিজে খেলবি, উনারা এসে খেলে দেবেন না, তোর এত হিসেব করার দরকার নেই। সব এমনিতেই আসবে। তুই মাথা দিয়ে ভাবার আগেই তোর পা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে।

এই যে সৃজনশীলতা, এটাই তোকে হিসেব নিকেশের চাইতে নিয়ে যাবে অনেকদূর।

রোমারিও ওই যে ‘৯৪ এ কাপটা মাথার উপর উঁচু করে ধরলেন, তার ঠিক কয়েক মাস পরেই, গ্রেমিওর কোচ ট্রেনিং শেষে তোকে বগলদাবা করে নিয়ে যাবে তাঁর অফিসে। উনি বলবেন, তুই ব্রাজিলিয়ান আন্ডার সেভেনটিন দলে ডাক পেয়েছিস।

টেরেসপোলিসে ট্রেনিং ক্যাম্প। ক্যাম্পে ঢুকতে গিয়ে হুট করে ঢুকে পড়বি ক্যাফেটোরিয়ায়। সেখানকার দৃশ্যটা তুই ভুলতে পারবিনা কোনদিনই…দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে আছে খেলোয়াড়দের ছবি…যেমনটা ঘরে ঝোলে ঈশ্বরের ছবি…পেলে, জিকো, বেবেতো।

সেই একই হলে তুই হাঁটবি যে হলে হেঁটে গিয়েছেন সব কিংবদন্তীরা। এই সেইসব টেবিল, এখানে রোমারিও, রোনালদো, রিভালদোরা বসে নাস্তা করেছেন। একই খাবার…এই খাবার খেয়েই এখানে ছিলেন এইসব কিংবদন্তীরা। সেই একই ডর্ম, এখানে উনারাও ছিলেন, ঘুমিয়েছিলেন এই একই বিছানায়, বালিশে। শুতে গিয়ে বালিশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাববি, এই বালিশটায় কোন কিংবদন্তী মাথা রেখেছিলেন!

এর পরের চারটা বছর আর কিছু না, শুধু ফুটবল। জীবনটা কাটবে শুধু বাসে আর মাঠে। সেভাবে চিন্তা করলে আসলে ১৯৯৫ থেকে ২০০৩। এর মাঝে তোর কোন ছুটি বলে কিছু থাকবেনা। খুব কঠিন একটা সময় ধরে নিতে পারিস।

তোর বয়স যখন ১৮ হবে, এমন একটা কাজ তুই করে ফেলবি যেটা দেখে যেতে পারলে বাবা খুব খুশি হতো। খুব খুশি বললে আসলে কম বলা হবে। বাবা খবরটা জনে জনে ডেকে শোনাতেন।

তুই গ্রেমিওর সিনিয়র দলে ঢুকে যাবি। এই আনন্দের সাথে ছোট্ট একটা দুঃখও থাকবে। রবার্তোও তখন গ্রেমিওতে নেই। হাঁটুর এক ইনজুরিতে পড়ে রবার্তো বেশিদিন গ্রেমিওতে খেলতে পারেনি, খেলতে চলে গেছে সুইজারল্যান্ড। নিজের হিরোর সাথে একই মাঠে, একই দলে খেলা হবেনা। কিন্তু এতটা দিন, এতদিন ধরে হিরোকে দেখে দেখে শিখে গেছিস সব। জানিস এখন কোথায় কী করতে হবে, কী করা দরকার আর কী করা যাবেনা।

ম্যাচের দিনগুলোতে কারপার্কিং দিয়ে হেঁটে যাবার সময় বাবার কথা আলাদাভাবে মনে পড়বে। বেচারা সারাটা সপ্তাহ শিপইয়ার্ডে খেটেখুটে ছুটির দিনটায় এখানেই ডিউটি করতো। ড্রেসিংরুমে ঢুকে মনে পড়বে এখানেই একসময় রবার্তোর সাথে এসে বসে থাকতি। নীল কালো গ্রেমিও শার্ট শরীরে চাপালেই মনে হবে, জীবন এর চেয়ে ভালো আর কীভাবে হয়! মনে হবে আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি। আমি এখন নিজের শহরের ক্লাবে খেলি।

মজাটা হচ্ছে গল্পটা এখানেই কিন্তু শেষ না।

পরের বছর তুই খেলে ফেলবি ব্রাজিল জাতীয় দলে। মানে সিনিয়র দলে। এখানেও ঘটবে একটা মজার ঘটনা । ক্যাম্পে বাকি সিনিয়রদের চেয়ে তুই গিয়ে পৌঁছাবি ঠিক একদিন পর। ঘটনা কী? তোর গ্রেমিও ক্লাবের চ্যাম্পিওনাতো গাউচো টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ছিলো ইন্তারন্যাশিওনালের বিপক্ষে।

সেই ইন্তারন্যাশিওনালের কাপ্তেন আবার থাকবেন দুঙ্গা।

ম্যাচটায় তুই খুব ভালো খেলে ফেলবি। তাই যখন তুই ক্যাম্পে এসে গেছিস, ব্রাজিল দলের সাথে ট্রেনিং এর জন্যে, তখন তারা গ্রেমিওর ১০ নাম্বার জার্সির ছেলেটিকে নিয়েই কথা বলবে। তো, এই দলে কারা আছেন? সেই ‘৯৪ এর টিভিতে দেখা ব্রাজিল দলটার বেশিরভাগ…

তো তারা কী নিয়ে কথা বলবে?

বলবে কীভাবে তুই ড্রিবল করে দুঙ্গাকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেছিস।

তারা তোরই দেয়া উইনিং গোলটা নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু বেশি আত্মবিশ্বাসী হবার কিছু নেই-এই লোকগুলো খুব কঠিন মানুষ। প্রথম ক্যাম্পে ঢোকার এই মুহুর্তটাই তোর জীবনে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকবে। খুব চাহিদা এই মানুষগুলোর। ওদেরও দোষ নেই। ফুটবলের এই লেভেলে যখন কেউ পৌঁছায় তখন তার কাছে চাওয়ার পরিমাণটাও বেশি থাকে।

এই চাহিদা দেখে ভড়কে যাবি? নাকি নিজের মুক্ত খেলাটাই খেলবি?

বা হিসেব করতে শুরু করবি? সেইফ খেলতে চাইবি?

এই পর্যায়ে তোর জন্যে আমার একটাই উপদেশঃ নিজের মতো কর। মুক্ত থাকার চেষ্টা কর। জীবনের সুরটা শোন। জীবনে বাঁচার এই একটাই উপায় আছে।

ব্রাজিলের জন্যে খেলাটা তোর জীবনটাই বদলে দেবে। হঠাৎ করেই দেখতে পাবি যেসব দরজার কথা তুই জানতিইনা, সেগুলোও খুলে গেছে অবারিত।

একসময় ইওরোপে খেলার কথাও মাথায় আসবে। নিজেকে প্রমাণ করার জন্যে তোর অনেক হিরোরাই খেলতে গেছে ওখানে। রোনালদো জানাবে বার্সেলোনার জীবন। রোনালদোর সব পুরস্কার দেখতে পাবি চোখের সামনে। ব্যালন ডি অর, ক্লাব ট্রফি…হঠাৎ করেই মনে হবে একটা ইতিহাস তৈরী করে ফেলা দরকার। স্বপ্নটা তখন গ্রেমিও ছেড়ে বের হয়ে আসবে রাস্তায়। ২০০১ সালে তোর চুক্তি হবে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই এর সাথে।

যে বাচ্চাটা ফাভেলায় একটা কাঠের ঘরে জন্মেছে, তাকে ইওরোপ কী করে বোঝাবো? অসম্ভব। যদি বলিও, বুঝবিনা। প্যারিস থেকে বার্সেলোনা, তারপর মিলান…সব সব খুব দ্রুত চলে যেতে থাকবে। ইওরোপের মিডিয়ার একটা অংশ তোর খেলার স্টাইলটা বুঝতেই পারবেনা। ওরা জানবেনা কেন তুই সবসময় হাসিস।

তুই হাসিস কারন, ফুটবল ইজ ফান। এত সিরিয়াস হবার তো কিছু নেই। তোর গোলতো শুধু আনন্দ ছড়িয়ে দেবার জন্যে।

আবারও বলি- হিসেব নিকেশের আগে সৃজনশীলতা।

মুক্ত থাকবি, জিতে যাবি একটা বিশ্বকাপ।

মুক্ত থাকবি, জিতে যাবি চ্যাম্পিওনস লীগ, লা লীগা আর সিরি আ।

মুক্ত থাকবি, জিতে যাবি ব্যালন ডি ওর।

তোর অনেকগুলো গর্বের মধ্যে যে বিষয়টা নিয়ে বেশি গর্ব হবে তা হচ্ছে নিজের খেলার স্টাইল দিয়ে তুই বার্সেলোনার ফুটবলটাকেই বদলে দিবি। বার্সেলোনায় যখন ঢুকবি, রিয়াল মাদ্রিদ তখন স্পেইনের সবচে শক্তিশালী দল। যখন ক্লাবটা ছেড়ে আসবি তখন বার্সেলোনা এমন এক জায়গায় উঠে যাবে যে বাচ্চারা এই দলটায় খেলার স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জাগবে।

বার্সেলোনায় তোর ভূমিকাটা শুধু মাঠেই থেমে থাকবেনা। কাজ হবে তার চাইতে বেশি কিছু।

বার্সেলোনায় তুই শুনতে পাবি ইয়ুথ টীমের একটা ছোট ছেলের কথা। তোর মতোই ১০ নাম্বার জার্সি পরে, ড্রিবল করে। তোর মতোই নাকি খেলে। বন্ধুদের সাথে নিয়ে একদিন চলে যাবি বাচ্চাটার খেলা দেখতে। খেলা দেখে মনে হবে এই ছেলে গ্রেইট ফুটবলারই না শুধু হবে তার চাইতে বেশী কিছু। একদম আলাদা ছেলেটা। নাম লিওনেল মেসি।

কোচেদের বলবি, ওকে যেন একদিন সিনিয়রদের সাথে খেলতে পাঠানো হয়। ক্যাম্পে আসার পরে বার্সেলোনার খেলোয়াড়েরা ফিসফাস শুরু করবে। তোর সাথে ঠিক ব্রাজিল দলের প্রথম দিনের ক্যাম্পে যা হয়েছিলো সেরকম আরকি।

ছেলেটাকে বলবি, “আনন্দ নিয়ে খেলবি। মুক্ত হয়ে খেলবি। জাষ্ট প্লে উইথ দ্য বল।”

এইযে মুক্ত হয়ে খেলা, এটা বার্সেলোনায় তুই চলে আসার পরেও থাকবে। মেসিই বাঁচিয়ে রাখবে।

জীবনে অনেক কিছু ঘটবে। ভালো-খারাপ। মনে রাখিস তোর জীবনে যা কিছু হচ্ছে সবই ফুটবলের জন্যে হবে। লোকে যখন তোর স্টাইল নিয়ে কথা বলবে, ম্যাচ হারার পরেও কেন হাসিস এসব প্রশ্ন করবে, একটা স্মৃতিই মাথায় আনবি।

যখন বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তোর কাছে বাবার কোন ভিডিও ছিলোনা। থাকবে কোত্থেকে, ভিডিও ক্যামেরা কেনার টাকাইতো ছিলোনা। আছে শুধু একটা ছবি। সেই ছবিতে বাবা তোর সাথে ফুটবল খেলছেন। তোর মুখে এক অদ্ভুত হাসি। ফুটবল খেলা যাচ্ছে এই আনন্দেই তুই হাসি আটকাতে পারছিস না। বাবাও তোর হাসি দেখে আনন্দিত। অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য।

যখন টাকা আসে—সাথে চাপ আসে আর আসে সমালোচকেরা—

কিসসু যায় আসেনা ওতে—খালি মুক্ত থাকবি।

ভেতরের মানুষটা যেভাবে বলে সেভাবে খেলবি।

বলটা দিয়েই খেলবি।

—রোনালদিনহো

মূলঃ প্লেয়ারস ট্রিবিউন।

Spread the love
  • 78
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    78
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।