১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে মধুপুরে মন্দিরের জমিতে মার্কেট নির্মাণ

0

টাঙ্গাইল সংবাদদাতা:

রীতিমতো প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে সনাতন ধর্মালম্বীদের দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক টাঙ্গাইলে মধুপুরের শ্রী শ্রী মদন গোপাল দেব বিগ্রহ মন্দিরের মূল্যবান জমি দখল করে নির্মাণ কাজ করছে সরকারদলীয় মনোনীত বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি মধুপুর শাখা।

ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হুমকি ধমকিতে মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ ভয়ে স্থবির হয়ে গেছে। নীরব কান্নায় মধুপুরের গোটা হিন্দু সম্প্রদায় বোবা হয়ে গেছে। তাদের চোখের সামনে আইন আদালত উপেক্ষা করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জমি দখল করে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরই সমর্থিত সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ।

ঘটনার বিবরনীতে জানা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা রাজশাহীর পুঠিয়ার জমিদার মহৎপ্রান মহারানী হেমন্তকুমারী মধুপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে বাংলা ১২৯৮ ইংরেজি ১৮৯১ সালে শ্রী শ্রী মদনগোপাল দেববিগ্রহ নামে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ১২টি দাগের মোট ৯.১৭ একর জমি মন্দিরের নামে দিয়ে যান। সেই থেকে হিন্দু সম্প্রদায় বছরে একবার এক মাসব্যাপী গোষ্ঠমেলাসহ সকল ধর্মীয় ক্রিয়াদি সম্পন্ন করে আসছে। দেশে একমাত্র এখানেই মাসব্যাপী মেলা হওয়ায় একটি বিশেষ ঐতিহ্য লাভ করে। সব শ্রেণী সম্প্রদায়ের মানুষ মেলায় সওদা করার জন্য এটি সার্বজনীন রূপ নেয়।

আরও পড়ুন  নারী হোমিও চিকিৎসকের শয়নকক্ষে বাকৃবি শিক্ষক, দরজায় তালা

তৎকালীন পাকিস্থান সরকার উক্ত মূল্যবান জমি অধিগ্রহণ করে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। পরে মন্দিরের সেবায়েতগণ আইনের আশ্রয় নিলে ময়মনসিংহ মুন্সেফ আদালত ০৫/২৮/১৯৬৩ এর রায়ে সরকার পক্ষ হেরে যায়। হেরে গিয়ে উক্ত রায়ের বিপক্ষে আপিল করে। আপিল মামলা ৪৫/১৯৬৪ এর ২৯/০৭/১৯৬৭ তারিখে আদালতে রায়েও আপিল মামলায় সরকার পক্ষ হেরে যায়।

মন্দিরের পক্ষে রায় হওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে তাদের বাৎসরিক সকল ধর্মীয় ক্রিয়াদিসহ অনান্য উৎসবাদি পালন করে আসছে। স্বাধীনতার পর ভূমিদস্যুদের আগ্রাসনে অনেক জমি জবরদখল হয়ে যায়। অবশিষ্ট জায়গায় তারা ধর্মীয় সকল ক্রিয়াদি ও উৎসব পালন করে আসছে। ৮৭ খতিয়ানের ২৪১ দাগে মূলত বড় ধর্মীয় উৎসব পালন হয়। এই দাগের আনুমানিক প্রায় ৮ শতক জায়গায় বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি মধুপুর শাখার সরকার দলীয় মনোনীত কমিটির সাধারন সম্পাদক মফিজ উদ্দিন ও সমিতির নামে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মান কমিটির আহ্বায়ক কবির হোসেনের নেতৃত্বে ভবন নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা মধুপুর পৌর সভায় প্ল্যান পাসের আবেদন করে। কিন্তু জমির সঠিক কাগজ প্রদানে ব্যর্থ হয়। ফলে পৌরসভা প্ল্যান প্রদান করে না। কিন্তু শিক্ষক সমিতি বেআইনীভাবে ভবন নির্মানের উদ্যোগ চালিয়ে যায়।

আরও পড়ুন  পায়ুপথে ইয়াবা পাচার, গ্রেফতার ১

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি ও মন্দির কমিটির সাধারন সম্পাদক এবং সেবায়েত জীবন কুমার চৌধুরীর আবেদনের প্রেক্ষিতে মধুপুর পৌরসভা ২২-১০-২০১৭ইং তারিখে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এর সার্ভেয়ার পৌরসভার ভূমি জরিপকারীকে সাথে নিয়ে সরেজমিনে মেপে সমিতির ভবন নির্মান উদ্যোগের চিহ্নিত স্থান সমিতি নয়, সেটি মন্দিরের মর্মে ২২-১১-২০১৭ তারিখে রিপোর্ট প্রদান করেন। কিন্তু শিক্ষক সমিতি এসবের তোয়াক্কা না করে পৌরসভার প্ল্যান পাস ছাড়াই বাণিজ্যিক ভবন নির্মান উদ্যোগের কাজে অগ্রসর হয়।

বাধ্য হয়ে মন্দির কমিটি টাঙ্গাইল অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আইনের আশ্রয় নেয়। মামলা নং৭৯৬/৭। বিজ্ঞ আদালত ২৩-১১-১৭ই তারিখে ১৪৪ ধারা জারি করেন। এরপর হতে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য মন্দির কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকের উপর বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি, ভয়-ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিয়ে জমি ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।

সর্বশেষ ৬ জুন তারিখে মন্দিরের জমিই মন্দির কমিটিকে বুঝিয়ে দেয়ার হাস্যকর ফন্দি করে। মন্দির প্রাঙ্গনে ওসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সামনেই মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দদের বকাঝকা ও ভয়ভীতি প্রদান করে মামলা তুলে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

আরও পড়ুন  মুক্তিযোদ্ধাকে চড় এবং স্থানীয়দের গালি দেয়ায় মাহমুদুর রহমান গণধোলাই খেয়েছেন!

এরপর হতে শিক্ষক সমিতি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মন্দিরের জায়গায় ভবন নির্মানের কাজ শুরু করেছে। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় অসহায়ের মত চেয়ে দেখছে ও নীরব কান্নায় বোবা হয়ে গেছে। কেউ ভয়ে মুখ খুলছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক’জন ধর্মপ্রাণ হিন্দু বলেন, আমরা সব সময় নৌকায় ভোট দেই ও আওয়ামী লীগ সরকারকে সংখ্যালঘুবান্ধব সরকার মনে করি, সেই তারাই যখন আমাদের মন্দিরের জমি আইন আদালত না মেনে গ্রাস করছে তখন আমরা কী করব। ধর্মকর্ম করতে না পারলে জায়গা জমি ফেলে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। কারন, পাকিস্থান সরকার যা পারেনি বা করেনি আমাদের সমর্থিত সরকার তাই করছে। অতএব পালানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে তারা সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও সহায়তা কামনা করেন।

উল্লেখ্য শিক্ষক সমিতি মন্দিরের জায়গায় বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মানের লক্ষ্যে মহাসড়কের পাশে নির্মাণ সামগ্রী রেখে দিয়েছে। যা ঈদ মৌসুমে ফুটপাতে গরীবদের দোকান ও আশপাশের মার্কেটগুলোতে বেচাকেনার বিঘ্ন হচ্ছে এবং যানজটে যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

Spread the love
  • 191
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    191
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।