শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের পুত্র, ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী সুমনের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার!

0

সময় এখন ডেস্ক:

রাজধানীর খিলগাঁওয়ে রেললাইন থেকে একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদের (৫২) দ্বিখণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ জুন) সকালে খিলগাঁওয়ের বাগিচা মসজিদ সংলগ্ন রেললাইনে তার মরদেহ পাওয়া যায়।

ঘটনাস্থল থেকে সুমন জাহিদের মরদেহ উদ্ধার করে রেলওয়ে হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন ফারুক বলেন, ‘সুমন জাহিদের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ট্রেনে কাটা পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে।’

ময়নাতদন্তের জন্য সুমন জাহিদের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

মৃতের শ্যালক সারোয়ার বলেন, ‘সুমন জাহিদ ফারমার্স ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন। আজ সকালে তিনি কখন বাসা থেকে বেরিয়েছেন তা জানি না। আমরা এখন কমলাপুরে আছি।’

সুমন জাহিদের স্ত্রীর নাম টুইসি। তাদের সংসারে আছে দুই সন্তান। সুমন জাহিদের বাবার নাম জাহাঙ্গীর খণ্ডলী।

উল্লেখ্য, সুমন জাহিদ মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যায় অভিযুক্ত পলাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদানকালে তিনি বলেছিলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার মা শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় চৌধুরী মাঈনুদ্দিন জড়িত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবেই সুমন জাহিদ তার মাকে হত্যার ঘটনার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন।

তিনি তাঁর সাক্ষ্য প্রদানকালে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ১১৫, নিউ সার্কুলার রোডের (বর্তমান ২৯ নং শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক) বাসায় থাকতাম। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর বেলা আনুমানিক দেড়টার দিকে আমি ও আমার এক মামা (সাহাব উদ্দিন উজির) গোসল করে বাসার ছাদে অবস্থান করছিলাম। মা (সেলিনা পারভিন) তখন রান্না করছিলেন। সে সময় আমরা বুঝতে পারলাম, বাসার সামনে একটা গাড়ি এসে থেমেছে। তখন বাসার ছাদ থেকে আমি ও মামা উঁকি দিয়ে দেখতে পাই, জিপ ও একটি মাইক্রোবাসের পেছনে একটি মিলিটারির লরি ছিল। মাইক্রোবাসটিতে কাদামাখা ছিল। কিছুক্ষণ পর বাসার কলাপসিবল গেটে কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাই। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে তখন সৈয়দ সালাহউদ্দিন সাহেব থাকতেন। তিনি কলাপসিবল গেটটি খুলে দেন। আগতরা সেলিনা পারভিনের ফ্ল্যাট কোনটা জানতে চাইলে তিনি তা দেখিয়ে দেন। তারা সালাহউদ্দিন সাহেবকে ঘরে চলে যেতে বললে তিনি ঘরে চলে যান।

আরও পড়ুন  ‘সারাদিনে মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমাই, ১৯ ঘণ্টাই দেশের জন্য কাজ করি’


ছবি: রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা শহীদ বুদ্ধিজীবি সেলিনা পারভীনের লাশ। (ছবিসূত্র: জন্মযুদ্ধ’৭১)

সুমন বলেন, কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে আমরা কয়েক সিঁড়ি নেমে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি, কারা এসেছে। তখন মা দরজা খুলে দিলে আগতরা পরিচয় জানতে চান। তাদের একজন আমাদের দেখে ফেলেন এবং বন্দুক তাক করে বলেন, ‘হ্যান্ডসআপ’। তখন আমি এবং উজির মামা হাত উঁচু করে নেমে আসি। এ সময় তারা আমাদের পরিচয় জানতে চাইলে মা আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে আমার ছেলে আর মামাকে দেখিয়ে বলেন, সে আমার ছোট ভাই। তখন আগতরা উজির মামাকে দেখিয়ে বলেন, ইয়ে মুক্তি হ্যায়?

সুমন বলেন, এ সময় আমি মায়ের কাছে গিয়ে আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন আগতরা মাকে বলেন, আপনাকে আমাদের সঙ্গে সেক্রেটারিয়েটে যেতে হবে। মা, কারফিউ পাশ নেই- বলে যেতে পারবেন না জানালে আগতরা বলেন, আমাদের কাছে কারফিউ পাশ আছে, অসুবিধা হবে না। আমি মায়ের সঙ্গে যেতে চাইলে তাদের একজন বলেন, বাচ্চা লোক নেহি যায়েগা অন্দর মে যাও। তাদের মুখ মাফলার দিয়ে ঢাকা ও হাতে অস্ত্র ছিল। তাদের ধমকে আমি ও মামা ভয় পেয়ে দরজার কাছে চলে যাই। সে সময় আমার মাথায় হাত রেখে মা বলেছিলেন, সুমন তুমি মামার সঙ্গে খেয়ে নিও। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবো। এটাই ছিল মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। তখন আগতরা গামছা দিয়ে মায়ের চোখ বাঁধার পর পিঠ মোড়া করে বেধে কাদামাখা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন  ‘চিন্তা করিস না। কিছুই হবে না’- ধর্ষকের পিতা

সুমন বলেন, এরপর মায়ের আর কোনো খবর পাইনি। ১৭ ডিসেম্বর শহীদ মুনীর চৌধুরী ও কবীর চৌধুরীর ভাই শমসের চৌধুরীর কাছ থেকে মেঝ মামা মহসীন ও উজির মামা জানতে পারেন, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে মায়ের লাশ পড়ে আছে। পরের দিন ১৮ ডিসেম্বর মায়ের লাশ সনাক্ত করার পর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।


ছবি: লন্ডনে বহাল তবিয়তে থাকা রাজাকার চৌধুরী মাঈুদ্দিন

ট্রাইব্যুনালে সুমন বলেন, ১৯৭১ সালে আমার মা সেলিনা পারভীন সাপ্তাহিক ‘ললনা’ পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ‘শিলালিপি’র সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। তার বিভিন্ন লেখা সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় ছাপা হতো। সে সময় সেলিনা পারভিন তার সম্পাদিত পত্রিকা ‘শিলালিপি’র বিক্রয়লব্ধ টাকা দিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। এটি জানতে পেরে সেলিনা পারভিনকে অপহরণ এবং হত্যা করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে সাক্ষী জানতে পেরেছেন বলে তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন। মা ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় লিখতেন। সেখানে ফেনীর চৌধুরী মাঈনুদ্দিন নামে একজন কাজ করতেন। মামা সাহাব উদ্দিন উজির তখন ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) করতেন। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন তখন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায়ই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হতো।

আরও পড়ুন  দেহ ব্যবসার কথা স্বামীকে জানানোয় মা ছেলেকে হত্যা!

সুমন আরো বলেন, যেহেতু চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বাড়ি ফেনীতে আর মামার সম-সাময়িক সেই হিসেবে চৌধুরী মাঈনুদ্দিনও মাকে বুবু বলে ডাকতেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানতে পারি, এই মাঈনুদ্দিনই আগতদের আমাদের বাসার ঠিকানা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উজির মামা পত্রিকায় ছবি দেখে একদিন বলেছিলেন, বুবুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় এই লোকটিও ছিল। এছাড়াও রায়েরবাজার বদ্ধভূমি থেকে সে সময় জীবিত ফিরে আসা একমাত্র ব্যক্তি দেলোয়ার হোসেনের কাছ থেকে জানতে পারি, মাকে ধরে নিয়ে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের আলবদর হেডকোয়ার্টারের একটি রুমে ২০-২৫ জন লোকের সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছিল।

সুমন বলেন, আমি দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে, চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ছিলেন আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ এবং আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন আলবদরের একজন সদস্য।

Spread the love
  • 851
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    851
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।