শত্রুকে কষ্ট দিয়ে মারতে শিং মাছের গলায় তাবিজ বেঁধে নদীতে ছাড়া হয়!

0

ফিচার ডেস্ক:

কুফরি কালাম লেখা তাবিজ শিং মাছের গলায় বেঁধে দিয়ে তিস্তা নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই মাছ ধরা পড়েছে কাকিনা মহিপুর ঘাটে। তিস্তা নদীতে জেলেরা মাছ ধরার সময় এই মাছ দুইটি জালে উঠে এসেছে। এরপর মাছের বড় কাঁটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল শক্তিহীন করার জন্য।

স্থানীয়রা বলেন, কবিরাজরা মাছগুলোকে ছোট অবস্থায় গলায় আঁটো করে তাবিজ বেঁধে নদীতে ছেড়ে দেয় টাকার বিনিময়ে। মাছ বড় হয় আর তার গলায় তাবিজ বাঁধা নাইলনের সুতা আরও এঁটে বসে ধীরে ধীরে মাছটিকে মৃ-ত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এই মাছের সব কষ্টের প্রভাব গিয়ে পড়ে সেই ব্যক্তির উপর যার নামে এই কুফরিযুক্ত তাবিজ করা হয়। শেষ পরিণতি ভ-য়ানক মৃ-ত্যু।

বয়স্করা বলেন, এসবকে মেয়াদি বান বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের হ-ত্যা করার জন্য এই ধরনের তাবিজ ব্যবহার করা হয়। এ জাতীয় তাবিজ (কুফরি কালামে লেখা) যারা বানায় তাদের অনেক চাহিদা। সহজে তাদের নাগাল পাওয়া যায় না। পেলেও তারা এসব করতে রাজি হন না সহজে। বড় অংকের টাকার বিনিময়ে তারা কাজটি করেন। ক্ষেত্র বিশেষে সেই টাকার অংক গিয়ে দাঁড়ায় হাজার থেকে লাখ পর্যন্ত!

অনেকেই জানতে চান, এসব জাদুটোনা বা বান মারায় কাজ হয় কি না- তাদের প্রশ্নের জবাবে এক কবিরাজ সম্পর্কে জানানো যাক:

প্রেমে ব্যর্থ এক যুবক তদবির নিতে গেল ওঝা গৌরী রানীর কাছে। ওঝা দাবি করেন ৫ হাজার ১ টাকা। কাজ না হলে টাকা ফেরত দেয়ারও অঙ্গীকার করেন তিনি। এতে রাজি হয়ে যান ওই যুবক। তিনি ৫ হাজার ১ টাকা দেয়ার পর গৌরী রানী জ্যান্ত শিং মাছ সংগ্রহ করেন। এরপর ওই শিং মাছের গলায় একটি তাবিজ পরিয়ে দিয়ে প্রেমে ব্যর্থ যুবকের হাতে তুলে দেন।

গৌরী রানী তাকে নির্দেশ দেন শিং মাছটি নদীতে ছেড়ে দেয়ার জন্য। শিং মাছ নদীতে দৌড়াদৌড়ি করবে আর ওই মেয়েও তার জন্য ছটফট করবে। ৭ দিনের মধ্যে যুবকটি ফলাফল পাবে বলে তাকে অবহিত করেন গৌরী। এরপর ওই যুবকটি শিং মাছ নিয়ে চলে যান।

এভাবে বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামে গৌরী রানী, তার পুত্রবধূ পুতুল রানী এবং গৌরী রানীর সহযোগী ফাতেমা বেগম বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। শত্রুদের বান মে-রে বশ করাসহ আরো অনেক সমস্যার সমাধান করছেন সর্বনিম্ন ৫শ’ থেকে হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে।

গত ৮/১০ বছর ধরে এ ধরনের প্র-তারণা চালিয়ে আসছেন তারা। গৌরীর স্বামী মৃত নিতাই চন্দ্র শীল পূর্বে সেলুনে কাজ করতেন। পুতুলের স্বামী রাম চন্দ্র শীল সদর উপজেলার তালুকদার হাট বাজারে সেলুনে কাজ করেন। ফাতেমার স্বামী আমজাদ শ্রমিকের কাজ করেন।

ভণ্ড কবিরাজ গৌরী ও পুতুল রানীর কাছ থেকে তদবির নেয়া অনেকেই জানান, গৌরী বলেন- যে কোনো মেয়েকে চিনি খাইয়ে কোনো যুবকের কাছে নিয়ে আসতে পারে। এ ছাড়া কারো শত্রুকে বান মে-রে হ-ত্যাও করতে পারে তারা। এছাড়া কোনো অবিবাহিত মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেয়া, ব্যবসায় উন্নতি, কাউকে বান মা-রলে তা ফেরানো, সুন্দরী নারীদের বশে আনা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক করানো, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলসহ যে কোনো সমস্যার জন্য শাশুড়ি ও পুত্রবধূ তদবির দিচ্ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ভণ্ড এই ৩ কবিরাজের প্র-তারণার শিকার হয়েছেন অনেক নারী। তারা খুব সহজেই সবকিছু বিশ্বাস করেন।

স্থানীয়রা জানান, হাত দেখার জন্য ৫শ’ টাকা ফি দিতে হয়। এ ছাড়া কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীকে পছন্দ করেন তাহলে তাকেও এনে দেয়ার চুক্তি নেন তারা। এ জন্য তারা ৫ হাজার টাকা ফি নেন বলে জানা গেছে। এছাড়া পেট টানানোর নামে ৫শ ১ টাকা ফি আদায় করা হচ্ছে। কোনো রোগী তাদের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গৌরী তার পেটে হাত দিয়ে বলেন- সর্বনাশ, লোকে তোর অনেক বড় ক্ষতি করছে। পেটের মধ্যে অনেক তাবিজ রয়েছে। এগুলো দ্রুত বের করতে হবে। না হলে তুই শিগগিরই মারা পড়বি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জানান, তিনি একটি মেয়েকে ভালোবাসতেন কিন্তু মেয়ে তার দিকে ফিরেও তাকায় না। পরে তিনি নানা জনের কাছে শুনে গৌরী রানীর কাছে ছুটে যান। গৌরী রানী ৫ হাজার টাকা নিয়ে একটি তাবিজ ওই যুবকের হাতে ধরিয়ে দেন। তাবিজটি ওই মেয়ের বাড়ির সামনে পুঁতে রাখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। যেখানে তাবিজ রাখা হবে সেখান থেকে মেয়ে হাঁটলে নাকি ছেলের জন্য পাগল হয়ে দৌড়ে চলে আসবে।

কিন্তু তাবিজ পুঁতে রাখার কয়েক দিন পর মেয়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। এভাবে শুধু ওই যুবকের সঙ্গেই নয়, শত শত মানুষ তাদের প্র-তারণার ফাঁদে পড়ছে। প্র-তারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন গৌরী রানী ও তার পুত্রবধূ। কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাসার মধ্যে রয়েছে এসির ব্যবস্থা। তার ছেলে মোবাইল সার্ভিসিং কাজ করে। তাকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়ে দামী মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে চাঁদপুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমান উল্লাহ আমান জানান, প্র-তারণার বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। ওইসব ভণ্ড কবিরাজ যাতে এলাকায় না থাকতে পারে সে ব্যবস্থা করবেন।

এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন বন্দর থানার ওসি মোস্তফা কামাল হায়দার জানান, ভণ্ড কবিরাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে অচিরেই।

Spread the love
  • 1.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.7K
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।