বিএনপি নেতা ‘গুম ইলিয়াস আলী’র খুন খারাবির ইতিহাস!

0

‘গুম’ হয়ে যাওয়ার তকমা নিয়ে নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার সফেস্টিকেটেড নথিপত্র ঘেঁটে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেই তথ্য মোতাবেক ‘৮০ ও ‘৯০ এর দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশে পাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল ইলিয়াস আলী। সে ও তার এককালীন প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান রতন কুখ্যাত ছিলো যথাক্রমে ১৮ খুন ও ২২ খুনের মামলার জন্য।

একজন দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান, কোন দৃশ্যমান পেশা ছাড়াই এখন শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। রাজনীতিতে প্রবেশ এসময় এরশাদের নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের সশস্ত্র ক্যাডার হিসেবে যোগ দিয়ে অস্ত্রবাজির রাজনীতি শুরু করেন। নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যডার হিসেবে যোগ দিলেও পরে দলবদল করে ছাত্রদলের অস্ত্রবাজ কর্মী হয়ে ওঠেন ইলিয়াস আলী। দুর্ধর্ষ নিরু আর বাবলু তখন ক্যাম্পাসের রাজা। পাগলা শহীদের শিষ্য ছিল গোলাম ফারুক অভি আর ওস্তাদ শহিদকে খুন করে হিরো হয়ে গেছিল অভি। বাবলু তার নিজ রুমে রহস্যজনক বোমা দুর্ঘটনায় নিহত হয়।

৯০ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে অভি নীরুদের রাজত্ব ছিল, ইলিয়াস সে সময় একটা ছ্যাচড়া মাস্তান ছাড়া কিছু না। মহসীন হলে মাস্তানির জন্য ইলিয়াস আলীকে মধুর ক্যান্টিনে কান ধরে ওঠ বস করিয়েছিল সবার সামনে অভি-সজলরা। সে সময় ছাত্রদল সিনিয়র ক্যাডারদের ফুট ফরমায়েশ খেটেই দিন কাটত ইলিয়াসের, ৯০ এ মিলন হত্যার কারণে অভি নীরুদের রাজত্বের অবসান হয়। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ছ্যাঁচড়া ক্যাডার ইলিয়াস আলী ফ্রন্টলাইনে এসে অভি-নিরু হওয়ার চেষ্টা করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়ই নিজ দলে গ্রুপিংয়ের রাজনীতি ঢুকিয়েছিলেন ইলিয়াস আলী। মাফিয়া স্টাইলে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব হিটিং গ্রুপ। ছাত্রদলের ক্যাডার পরিচিতি দিয়েই উত্থান তার। একের পর এর ঘটনার নায়ক হয়ে জন্ম দিতে থাকেন অভন্তরীণ সংঘাত। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যায় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ইলিয়াস আলী পরিণত হন ত্রাস সৃষ্টিকারী এক সন্ত্রাস নির্ভর ছাত্রনেতায়। বহু খুনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সে কারণে একাধিকবার গ্রেফতার করা হয় তাকে। জেলে কাটে সময়।

আসুন, ইলিয়াস আলীর আরও কিছু ভয়ংকর অপরাধের নমুনা দেখা যাক:

  • ১৯৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী কার্মকান্ডের কারণে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়।
  • ১৯৮৮ সালের ১১ ডিসেম্বর ছাত্রদল নেতা বজলুর রহমান ওরফে পাগলা শহীদকে হত্যা করে।
  • ১৯৮৯ সালের ২৯ নভেমর তার নেতৃত্বে ডাকসু কার্যালয় ভাংচুর করা হয়।
  • ১৯৯০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার নির্দেশে জহুরুল হক হলের ভিপি ছাত্রলীগ নেতা শহীদুর ইসলাম চুন্নুকে মিছিলে গুলি করে হত্যা করে।
  • ১৯৯২ সালের ৩ অগাস্ট ছাত্রদলের কামরুজ্জামান রতন গ্রুপের সঙ্গে ইলিয়াস গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি নিহত হয়।
  • ১৯৯২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মামুন ও মাহমুদ নামে দুই ছাত্রদল নেতাকে হত্যা করে লাশ পানির ট্যাংকের ভিতর লুকিয়ে রাখে।
  • ১৯৯১ সালে প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা মির্জা গলিব ও ছাত্রলীগ নেতা লিটন হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় তাকে।
  • ১৯৯২ সালে ১৬ জুন ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন করা হলে রহুল কবির রিজভী আহমেদ সভাপতি ও এম ইলিয়াস আলী সাধারণ সম্পাদক হয়। মাত্র ৩ মাসের মাথায় ছাত্রদলের কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এ সময় বিএনপি ক্ষমতায় থাকা স্বত্বেও ‘৯৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মামুন ও মাহমুদ হত্যা মামলায় আবার গ্রেফতার হয় ইলিয়াস আলী। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। ২ বছর কারাবাসের পর মুক্তি পায় সে।
  • ১৯৯৬ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে প্রথমবারের মত দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত।
  • সিলেটের অনেক সিনিয়র রাজনীতিবিদ ইলিয়াস আলী ও তার দলবলের হামলার মুখে পড়েন। এম সাইফুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, এসএমএ কিবরিয়া, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতো ব্যক্তিরা তার সন্ত্রাসের মুখোমুখি হন বারবার। সাইফুর রহমানের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়াকেও অনেকে ইলিয়াসের পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে মনে করেন।
  • দেশের বাইরেও উচ্ছৃংখল আচণের দায়ে পুলিশের নজরবন্দি হতে হয় ইলিয়াস আলীকে। ২০০০ সালে লন্ডনের মিল্টন কিন্স শহরে জয়পুর রেস্টুরেন্টে ওয়েটারকে হত্যার হুমকি দেয় সে। কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে কঠোরভাবে হুশিয়ার করে দিয়ে যায় তাকে।
  • ২০০১ সালে এমপি হওয়ার পর বিশ্বনাথ বালাগঞ্জে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে ইলিয়াস। প্রকাশ্য আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মাঠে নামে “ইলিয়াস বাহিনীর ক্যাডার”রা।
  • সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়া হত্যা এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হযরত শাহজালাল মাজার গেটে হত্যা চেষ্টার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
  • ২০১২ গত ৩ এপ্রিল সিলেটে ইলিয়াস আলীর প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছাত্রদল নেতা নীর ও জুনায়েদকে গুম করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
  • ২০১১ এর ১১ ডিসেম্বর “ইলিয়াস দেশে না বিদেশে’ শিরোনামে সংবাদ ছাপা হয়েছিল। প্রথমে বিদেশে যাওয়ার কথা অস্বীকার করে পরে সে নিজেই স্বীকার করে যে, সে ব্যাংকক গিয়েছিল।

ইলিয়াস আলী আজ পর্যন্ত কতগুলো মানুষকে হত্যা করেছে, কত সন্ত্রাসী তৈরী করেছে, কত মায়ের বুক খালি করিয়েছে, কত দুর্নীতি, ডাকাতি করেছে, কত সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করে তার হিসাব কেউ রাখেনা। শতকোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার বনানীতে “সিলেট হাউজ’ নামে বিশাল বাড়ি করেছে।

তার নামে প্রচুর মামলা। এসব মামলায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, হুমকি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আছে। বলা হয়েছে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইলিয়াস আলী ও তার লোকেরা বহু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এতসব অত্যাচার নিপীড়নের অসংখ্য বিতর্কিত ঘটনার নায়ক ইলিয়াস আলী সবকিছু পাশ কাটিয়ে ফিল্মি স্টাইলে দেশ ব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেন একমাত্র বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মদদে।

একটা খুনি আসামি, যে সারা জীবন কোন্দল-গ্রুপিং, খুনখারাপি করে পুরোটা সময় পার করেছে, দলের নাম করে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছে, আর তাকেই করা হল দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এমন ক্যাডাররা বিএনপিতে বিশাল নেতা, ম্যাডামের পাশে বসতে পারে। তার জন্য দুই দুইটা হরতালও হয়।

লেখক: ক্বারী ইকরামুল্লাহ মেহেদী
পেকুয়া, কক্সবাজার

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।