বিপদ যে কোন মুহুর্তেই: অরক্ষিত অবস্থায় সরকারি ওয়েবসাইটগুলো

0

বিজ্ঞান প্রযুক্তি ডেস্ক:

সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকারীন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় দপ্তরের ওয়েবসাইট কয়েক ঘণ্টা হ্যকারদের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর একটি প্রশ্ন আবার ফিরে এসেছে- সাইবার নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, এ বিষয়ে দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা এবং এক সময় হ্যাকিংয়ে যুক্ত থাকা একজনের সঙ্গে কথা বলে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হলো।

গত কয়েক বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন হ্যাকার সংগঠন বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে হানা দিয়েছে। তবে সরকারি ওয়েবসাইটগুলো তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্য, কেননা তাতে আলোচনা বেশি হয়, ‘বেশি সক্ষমতার পরিচয়’ দেওয়া যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাইবার অ্যাট হোমের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘সরকারি সাইটগুলো সব সময় হ্যাকারদের খুব পছন্দের টার্গেট। তাছাড়া সরকারি সাইটগুলো নিয়মিত পরিচর্যায় থাকে না। সিকিউরিটি আপডেট করার যে প্রক্রিয়া তা হয়ত ঠিকঠাক নেই। সেজন্য সরকারি সাইটগুলো অনেক বেশি ভালনারেবল।’

অবশ্য বাংলাদেশের সরকারি সাইটগুলো হ্যাকারদের জন্য ‘সহজ শিকার’ বলে মানতে রাজি নন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের সাবেক পিপলস পারস্পেকটিভ স্পেশালিস্ট মো. নাইমুজ্জামান মুক্তা। তিনি বলেন, “হোয়াইট হাউজ, এফবিআইয়ের মত স্পর্শকাতর সাইটগুলোও কিন্তু নিয়মিত হ্যাকিংয়ের ঝুঁকিতে থাকে।”


ছবি: ‘জোন এইচ’র আর্কাইভে হ্যাকড হওয়ার তথ্য

হ্যাকড বাই বাংলাদেশ

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মধ্যে গত ১১ এপ্রিল রাতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দপ্তরের ওয়েবসাইটে হানা দেয় হ্যাকাররা। সেখানে বসিয়ে দেয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের বার্তা। রাতেই ওয়েবসাইটগুলো পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর ওয়েবসাইটগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে।

অবৈধভাবে কোনো ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে হ্যাকাররা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে পারে। সে কোনো পরিবর্তন এনে নিজের উপস্থিতির জানান দিতে পারে, আবার তথ্য চুরি বা ওয়েবসাইটের ক্ষতিও করতে পারে। সাইবার ৭১ হ্যাকার দলের সাবেক একজন সদস্যের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলেছে প্রতিবেদক। তিনি জানান, ১১ এপ্রিলের হ্যাকিংয়ের ধরণটি ছিল ‘ডিফেসিং’। এ ধরনের ক্ষেত্রে হ্যাকার ওই ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ভেঙে প্রবেশ করে প্রচ্ছদ বদলে দেন। অর্থাৎ চেহারা বদলে দেন। কখনও কখনও সাইটে কোনো পরিবর্তন না এনে ওই ওয়েবপৃষ্ঠাকে রিডাইরেক্ট করে দেওয়া হয় অন্য কোনো লিংকে।

ডিফেসিংয়ে এমনিতে সাইটের বড় কোনো ক্ষতি হয় না। তবে কখনও কখনও সার্ভার থেকে তথ্য নষ্ট করা বা ম্যালওয়্যার আপলোড করার কাজ চলে ডিফেসিংয়ের আড়ালে। সাবেক ওই হ্যাকার বলেন, “হ্যাকার যদি ‘সুপারইউজার’ এক্সেস নিয়ে নিতে পারে, তাহলে ওই সার্ভারে যতগুলো ওয়েবসাইট থাকবে সবই হ্যাকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।”

ওই রাতের ঘটনা নিয়ে নাইমুজ্জামান মুক্তা বলেন, হ্যাকারদের হাতে সাইটের নিয়ন্ত্রণ ছিল এক থেকে দেড় ঘণ্টার মত। তারা হোম পেইজের ওপরে আরেকটি লেয়ার তৈরি করেছিল। তবে কনটেন্টের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। হ্যাকিংয়ের ঘটনার দিন তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক দাবি করেছিলেন, ‘বিদেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে’ ওই সাইবার হামলা চালানো হয়। তবে মুক্তা বলছেন, আক্রমণের ঘটনাটি দেশের ভেতর থেকেই হয়েছিল। এখন তো ফরেনসিক ল্যাব রয়েছে। এটা এখন দেখা যায় কোথা থেকে অ্যাটাক হয়েছে, অরিজিন কোথায়।

সুরক্ষিত?

সাইবার ৭১ হ্যাকার দলের সাবেক হ্যাকার বলেন, ওয়েবসাইট কোন ল্যাংগুয়েজে তৈরি হয়েছে, কোন ফ্রেমওয়ার্কে করা হয়েছে, কোন সার্ভারে রয়েছে এসব তথ্য থেকে একজন হ্যাকার নিরাপত্তার সম্ভাব্য খুঁত খুঁজতে পারেন এবং সেই খুঁত ধরে হানা দিতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে ক্রেডেনশিয়াল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েবসাইট মুছে গেলেও ব্যাকআপ থেকে সাইট দাঁড় করানো যাবে। কিন্তু পাসওয়ার্ড হাতছাড়া হলে পুরো সিস্টেম বেদখল হয়ে যেতে পারে।

এটুআই প্রকল্পের সাবেক বিশেষজ্ঞ নাইমুজ্জামান মুক্তাও মানছেন, সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং পাসওয়ার্ড পরিবর্তন না করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং সরকারি ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে এটা অতিক্রম করা সহজ নয়। তারপরও চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ন্যাশনাল পোর্টালের প্রাথমিক সব কাজ শুরু হয়েছিল এটুআই থেকে। পরে পোর্টাল মেইনটেন্যান্স ও এনহ্যান্সমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয় ট্যাপওয়্যার সলিউশনস লিমিটেডকে।

এর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা নিটন মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ওয়েবসাইট হ্যাকারের দখলে গেলেই বলা যাবে না যে ডেটা চুরি গেছে। আবার ওয়েবসাইট হ্যাক হলে ডেটা হ্যাক হবে না- এটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে লগ থেকে সব তথ্যই জানা সম্ভব। যেহেতু ন্যাশনাল পোর্টালের কাজের সাথে আমি সরাসরি যুক্ত, তাই বলতে পারি, এটা হ্যাক করা সহজ নয়। তবে যেসব সরকারি পোর্টাল এখনও ন্যাশনাল পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে, সেগুলো অনেক বেশি ঝুঁকিতে আছে।


ছবি: বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার হচ্ছে কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিতে

কামরুজ্জামান জানান, সরকারের সার্বিক কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ে ৫০ হাজারের বেশি অফিস রয়েছে। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এসব অফিসের ওয়েবসাইটগুলোকে ন্যাশনাল ওয়েবপোর্টালের আওতায় নিয়ে আসার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ৪৮ হাজার সাইট ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্কে চলেও এসেছে। তবে প্রশাসনিক কারণে অনেক সাইট এখনও বাইরে রয়েছে। সব মন্ত্রণালয়কেও এখনও আনা যায়নি।

‘হ্যাকড বাই বাংলাদেশ’ আক্রমণের পর ওয়েবসাইটের কনটেন্টের কোনো ক্ষতি ছাড়াই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো সাইট ফিরিয়ে আনতে পারাকে ‘সক্ষমতা’ হিসেবে দেখতে চান এটুআইয়ে কাজ করা নাইমুজ্জামান মুক্তা। ২০১০ সালে জেলা তথ্য বাতায়নে একযোগে আক্রমণ হয়েছিল। তখন সেগুলো রিকভার করতে আমাদের সময় লেগেছিল। আমরা এর মাঝে ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার ব্যবস্থাপনা আর ডিজাস্টার রিকভারিতে সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছি। এখন আমাদের অ্যালার্ট সিসটেম রয়েছে। সাইটে আক্রমণ হলে আমরা অ্যালার্ট পেয়ে যাই। সাইটগুলোতে এখন কয়েক স্তরের নিরাপত্তা যুক্ত করা হয়েছে।

দুর্বলতার কারণ

কামরুজ্জামানের মতে, বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতার দুটো বড় কারণ হল জনবল ও বাজেটের অভাব। সিকিউরিটি হচ্ছে প্রথম কথা। কিন্তু বাজেট সমস্যার কারণে অনেক সময় নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। অন্যদিকে সিকিউরিটি সেলের প্রয়োজনীয় কাঠামো থাকলেও সেজন্য যে জনবল দরকার তা নেই।

ফাইবার অ্যাট হোমের সুমন আহমেদ সাবিরও এ বিষয়ে কামরুজ্জামানের সঙ্গে একমত। জনবলের অভাবে রয়েছে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। সাইবার সিকিউরিটি একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। এখানে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, লম্বা সময় তাদের এ বিষয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, আজকে একজন যে দায়িত্বে আছেন, এক বছর পরে তিনি অন্যখানে চলে যান। আজকে যিনি আইটিতে ছিলেন, এরপর তিনি হয়ত কৃষি মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। এর ফলে স্পেশালাইজড হিউম্যান রিসোর্স তৈরি হয় না।

অ্যাস্পায়ার টেক সার্ভিসেস অ্যান্ড সলিউশনসের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা আইনুল তানজিল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন। একটি ওয়েবসাইটকে সুরক্ষিত রাখতে কোডিং করার সময় গাইডলাইনগুলো মেনে চলার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। সরকারি হোক বা বেসরকারি, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের সময় কোনো প্রফেশনাল সাইবার সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এর অ্যাসেসমেন্ট করা উচিৎ। সাম্প্রতিক হ্যাকিংয়ের ঘটনায় তথ্য চুরির কোনো খবর এখনও আসেনি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মত আরেকটি ঘটনা ঘটলে বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করে দেন তিনি।

২০১৬ সালে সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিল। নাইমুজ্জামান মুক্তা মনে করেন, ইথিকাল হ্যাকারের (যারা হ্যাক করেন নিরাপত্তা ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য, প্রকারান্তরে সাইট সুরক্ষিত করতে সহায়তা করার জন্য) সহায়তা নিয়ে খুঁত জেনে সিস্টেমকে সুরক্ষিত করা দুর্বলতা কাটানোর একটি ভালো উপায় হতে পারে। সরকার নিয়মিত হ্যাকাথন আয়োজন করে। ইথিকাল হ্যাকারদের আমরা আমন্ত্রণ জানাই। হ্যাক করাও একটি সক্ষমতা। একে আমরা নেতিবাচক ভাবে দেখি না। বরং এখান থেকে আমরা ট্যালেন্ট হান্ট করি।

সাইবার ৭১ হ্যাকার দলের সাবেক সেই হ্যাকার এ বিষয়ে বলেন, “একজন হ্যাকার কোন উদ্দেশ্যে হ্যাকিং করছে এটা একেবারেই তার ব্যক্তিগত চিন্তা। খারাপ উদ্দেশ্যেও হতে পারে, আবার জাস্ট ফর ফানও হতে পারে। তবে বাংলাদেশে যেসব হ্যাকার দল ছিল, তারা এখন মূলত হোয়াইট হ্যাটে যোগ দিচ্ছে। তারা বাংলাদেশের হয়েই কাজ করছে।”

আলোচিত সাইবার হামলা

বাংলাদেশ-ভারত সাইবারযুদ্ধ: ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একযোগে বাংলাদেশের শত শত ওয়েবসাইটের হামলা হয়। সেসব হ্যাকিংয়ের ঘটনায় দায়ী করা হয় ভারতীয় হ্যাকারদের। এর পাল্টায় বাংলাদেশের হ্যাকাররাও ভারতীয় সাইটে আক্রমণ শানায়। ২০১১ সালে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি কিশোরি ফেলানী খাতুনের মৃত্যুর পর ভারতীয় কিছু ওয়েবসাইট হ্যাকিং করেছিল বাংলাদেশি হ্যাকাররা। পরের বছর হাবিবুর রহমান নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যক্তিকে গরু পাচারকারী সন্দেহে আটক করে নির্যাতন চালায় বিএসএফ। ওই ঘটনার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তার প্রতিক্রিয়ায় ভারত থেকে সাইবার আক্রমণের শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি সাইবার আক্রমণের ওই ঘটনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বর্ণনা করা হয় ‘বাংলাদেশ-ভারত সাইবার যুদ্ধ’ হিসেবে।

পুলিশের ওয়েবসাইট আক্রান্ত: দিগন্ত টেলিভিশন ও দৈনিক আমার দেশ বন্ধ হওয়ার পর ২০১৩ সালে আক্রান্ত হয় বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট। হ্যাকাররা তাদের বার্তায় তথ্যমন্ত্রীকে হুমকি দেয়। ওই ঘটনায় জামায়াত সমর্থক হ্যাকারদের হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়েবসাইটটি কার্যকর করতে সে সময় লেগে যায় ৭ দিন। তার আগে ২০১১ সালেও একবার আলেবেনীয় হ্যাকাররা বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে আক্রমণ করেছিল ‘মজা করার জন্য’।

হ্যাকারের নিশানায় সংবাদমাধ্যম: দিগন্ত টেলিভিশন ও আমার দেশ চালুর দাবিতে ২০১৩ সালেই জামায়াত সমর্থক হ্যাকারদের কবলে পড়ে আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট। তার মধ্যে প্রচার সংখ্যায় প্রথম দিকে থাকা একটি পত্রিকার ইন্টারনেট সংস্করণও ছিল।

শিক্ষায়াতনের ওয়েবসাইটে হানা: ২০১৫ সালে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলে রাজপথে আন্দোলন শুরু হয়। সে সময় ‘চুপ থাকায়’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়। ওয়েবসাইটটি পুনরুদ্ধারে কয়েকদিন সময় লেগে যায়। ওই ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছিল। আর এ বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয় কেবল ‘নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ’ করার জন্য।

লক্ষ্য সরকারি ওয়েবসাইট: আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের ১৩টি সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করে আন্তর্জাতিক হ্যাকার সংগঠন অ্যানোনিমাস। ঘটনাটি ২০১৩ সালের মে মাসের। ওই ১৩টি সরকারি সাইটের মধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন সংক্রান্ত সরকারি পোর্টালটিও ছিল।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের সাইটেও হানা: গতবছর ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ওয়েবসাইট হ্যাক করে তাতে লেখা হয়েছিল- ‘রোহিঙ্গা বলে কিছু নেই’। রোহিঙ্গা সঙ্কটকে কেন্দ্র করে সোশাল মিডিয়ায় উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশি হ্যাকারদের একটি দল মিয়ানমারের কিছু সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করলে পরদিনই বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে হানা দেয় মিয়ানমারের হ্যাকাররা। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ওয়েবসাইটটি তারই শিকার হয়।

মরক্কোর হ্যাকার দলের আক্রমণ: এ বছরে মরক্কোর একটি হ্যাকার দল ফেইসবুকে বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় থাকা ওয়েবসাইটগুলো তারা হ্যাক করেছিল বলে দাবি করে। তার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের পোর্টালও ছিল।

আক্রান্ত খোদ আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটই: আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে ভারতের কাছে বাংলাদেশের হারের পর বাংলাদেশি হ্যাকাররা ভারতের কয়েকটি ওয়েবসাইটে আক্রমণ করে। তার জেরে বাংলাদেশের আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়েবসাইটিটি সচল করা হয়।

সোনালি ব্যাংকে সাইবার চুরি: ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোনালী ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাকারের দখলে ছিল কয়েক ঘণ্টা। তার কিছুদিন আগেই এক অনুষ্ঠানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম জানান, ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবের পাসওয়ার্ড হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে আড়াই লাখ ডলার লোপাট হয়েছিল।

ডট বিডি ডোমেইনে আক্রমণ: সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকার কারণ দেখিয়ে গত বছর সাইবার হামলা চালানো হয় ডট বিডি ডোমেইনগুলোতে। আক্রান্ত হয় টেলিকম অপারেটর রবি, বাংলালিংক, দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক এবং গুগলের ডট বিডি ডোমেইন। হ্যাকার নিজের পরিচয় প্রকাশ করেই ওই হামলা চালান বিটিসিএল এর নিরাপত্তা দুর্বলতা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। তার বক্তব্য ছিল, বড় কোনো হ্যাকিং ছাড়াই কেবল ইউআরএল রিডাইরেক্ট করে দেশের হাজার হাজর ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়া সম্ভব।

বিআরটিএ ওয়েবসাইটে বার বার হানা: চলতি বছর দুই বার হ্যাকারদের দখলে যায় বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটটি। ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত ব্যবহার করে দেওয়া হ্যাকারদের বার্তায় বাংলাদেশি হ্যাকারদের সতর্ক করা হয়। পরের মাসে বাংলাদেশের হ্যাকাররাই বিআরটিএ ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ঢাকার রাস্তায় ছাত্রলীগের এক কর্মসূচির মধ্যে এক কলেজছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ জানানো হয় সেখানে।

‘চুদুরবুদুর চইলত ন’: জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটের ঠিকানায় ব্রাউজ করলে তা chudurbudur.com -এ নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালে। তার কিছুদিন আগে সংসদে বাজেট আলোচনায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সদস্য রেহানা আক্তার রানুর বক্তব্যে ‘চুদুরবুদুর’ শব্দটি আসে। এ নিয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে সে সময় ব্যাপক আলোচনা ও হাস্যরস চলে। তাতে অংশ নেয় হ্যাকাররাও। chudurbudur.com নামে একটি সাইট বানিয়ে সংসদের ওয়েবসাইটকে সেখানে রিডাইরেক্ট করে দেওয়া হয়। অবশ্য পরে বিটিআরসি chudurbudur.com ব্লক করে দেয়। সংসদের ওয়েবসাইট ফের হ্যাকারের কবলে পড়ে ২০১৫ সালে। পাকিস্থানের হ্যাকাররা ওই ঘটনায় বাংলাদেশের হ্যাকারদের হুঁশিয়ারি দেয়।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।