মোটরসাইকেলে ধাওয়া করে ছিনতাইকারী ধরার দুঃসাহসী কাহিনী

0

সময় এখন ডেস্ক:

চলচ্চিত্রের পরোপকারী নায়কের মতো নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছিনতাইয়ের শিকার এক নারীর ব্যাগ উদ্ধার করে দিয়েছেন এক যুবক। অচেনা নারীর জন্য এই কাজ করতে গিয়ে মরতে বসেছিলেন তিনি। তবু পরোয়া করেননি। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন একজন পুলিশ সদস্যও। ঘটনাটি গত শুক্রবার সকালের। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বাসাবো বৌদ্ধ মন্দিরে। আর অটোরিক্সায় থাকা ছিনতাইকারীদের ধাওয়া দিয়ে ধরা হয় উড়াল সড়ক পার হয়ে সবুজবাগ এলাকায়।

ঘটনাটি এমন- ঢাকার একটি বিপণীবিতানের কর্মী শারমিন আক্তার তার স্বামী সন্তানকে নিয়ে যাচ্ছিলেন রিকশায় করে। বাসাবো বৌদ্ধমন্দির এলাকায় তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছিনতাইকারীরা এসেছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিক্সায় করে।

পাশ দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন শাফায়েত হোসেন নামের এক তরুণ। তার গ্রামের বাড়ি যশোরে। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। ছিনতাইয়ের শিকার নারীর রিকশা থেকে পড়ে যাওয়া আর ‘আমার ব্যাগ, আমার ব্যাগ’ বলে চিৎকারে বুঝে গেলেন কী হয়েছে। সিদ্ধান্ত নিলেন যেভাবেই হোক পাকড়াওয়ের চেষ্টা করবেন।

অটোরিক্সাটি তখন ছুটতে শুরু করেছে। শাফায়েতও পিছু নিলেন। খিলগাঁও উড়াল সড়কের ওপর অটোরিক্সাটির কাছাকাছি পৌঁছে যান। এ সময় তাকে উড়াল সড়কের রেলিংয়ে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে ছিনতাইকারীরা। দেয়ালে ঘষা খেয়েও নিজেকে কোনোমতে সামলে প্রাণ বাঁচান শাফায়েত। এরপর আরও জেদ চেপে বসে।

আরও পড়ুন  সাবধান: গোপন ক্যামেরার ভয়ংকর ভিডিও’র ফাঁদে নারীরা

অটেরিকশাটি তখনও এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময় অন্য একটি বাইকে থাকা এক পুলিশ সদস্যকে শাফায়েত জানালেন, ওই অটোতে ছিনতাইকারী। পরে ওই পুলিশ সদস্যও যোগ দেন তার সঙ্গে।

অটোরিক্সাটি ততক্ষণে উড়ালসড়ক দিয়ে রাজারবাগের দিকে মোড় নিয়েছে। পিছু নেন শাফায়েত। সঙ্গে সেই পুলিশ সদস্য। এইবার ভয় পায় ছিনতাইকারীরা। অটোরিক্সাটি বাম পাসের ইউ টার্ন এর নামার পর উল্টোপাশ দিয়ে পারাপারের চেষ্টা করে। কিন্তু গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে উল্টে যায়। আর সেখানেই ধরা পড়ে তিন ছিনতাইকারী।

ব্যাগটিতে মোবাইল ফোন ছাড়াও বেশ কিছু প্রসাধনী সামগ্রী ছিল। ছিনতাইকারীদের আটক করার পর শারমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এসে তার ব্যাগ নিয়ে যান। ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অটোরিক্সায় আরও কিছু গয়না আর মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এগুলোও তারা ছিনতাই করেছিল।

পরে ওই নারীর স্বামী আনোয়ার হোসেন ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপায়। শুক্রবার ভোরে সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগের বাসায় ফিরছিলেন। তখন ছিনতাইয়ের শিকার হন।

আনোয়ার জানান, তার স্ত্রীর ব্যাগে থাকা একটি মোবাইল ফোন, আড়াই হাজার নগদ টাকা, একটি ব্যাগ এবং ব্যাগে থাকা কিছু প্রসাধনী সামগ্রী ছিল। ছিনতাইকারীরা হঠাৎ ব্যাগটি টান দিয়ে সজোরে অটোরিক্সা চালিয়ে চলে যেতে থাকে। এ সময় তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন  ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা ৫ নারী ছিনতাইকারী রাজশাহীতে আটক

এই ঘটনায় মামলা হয়েছে শাহজাহানপুর থানায়। সেখানকার উপপরিদর্শক জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘ছিনতাইয়ের ঘটনাটি দেখে এক মোটরসাইকেল সিএনজিটিকে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সিএনজিটি তাকে ওভারটেক করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে রাজারবাগের দিকে। ওই সময়ে ফ্লাইওভারের উপরে আমাদের একজন পুলিশ সদস্য যাচ্ছিলেন। তিনি বিষয়টি জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ সিএনজিটিকে ধরে ফেলেন। এরপর তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে পুলিশ সেখানে পৌছে যায় এবং সিএনজি চালকসহ তিনজন ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করে।’

ছিনতাইকারী আটকের মূল নায়ক শাফায়েত হোসেন ফেসবুকে তার কাহিনী তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন, সকাল ৮:১০। বাইকে করে অফিস যাওয়ার উদ্দেশে বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির এর সামনের মোড় পার হয়ে মেইন রাস্তায় উঠলাম। হঠাৎ আওয়াজ পাইলাম, মিররে দেখলাম এক মহিলা রিকশা থেকে পড়ে গেছে এবং একটা সিএনজি আমাকে অনেক বাজেভাবে ওভারটেক করল। মহিলা ছিনতাইকারী, ছিনতাইকারী বলে চিৎকার করছে, আর বলছে আমার ব্যাগ আমার ব্যাগ। বুঝতে আর বাকি রইলো না।

আমি বাইক নিয়ে সিএনজিকে চেজ (ধাওয়া) করতে থাকি। সিএনজিকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার এ উঠার মুখে ওভারটেক করি এবং থামতে বলি। সে না থামিয়ে চলন্ত অবস্থাতেই আমাকে ধাক্কা দেয়। তখন ৫০ কিলোমিটার স্পিডে এবং ফ্লাইওভার এর রেলিং এর সাথে চেপে ধরে। আল্লাহর অসীম রহমতে আমি চাপ খেয়ে, দেয়ালে ঘষা খেয়ে, বাইক স্কিড করে কোনমতে বেঁচে যাই।

আরও পড়ুন  সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে যাচ্ছে তাসফিয়ার পোশাক ও আদনানের মোবাইল

তারপর আবার ধাওয়া করি সিএনজিকে। চলন্ত একটা প্রাইভেট কারকে বলি সামনের সিএনজিতে ছিনতাইকারী, একটু হেল্প করেন। উনি আমার কথায় কান দিলেন না। মিররে দেখলাম একজন পুলিশ ভাই বাইকে করে আসছেন। উনাকে বলার পর উনি আমার সাথে যোগ দিলেন।

যারা ধরা পড়েছে

যে তিন জন ধরা পড়েছে তারা হল- মামুন শেখ (৪০), আবদুল জব্বার (৩০) এবং জাকির হোসেন সিকদার (২৫)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই তিনজন পুলিশকে জানায়, তারা সায়েদাবাদের এলাকায় থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত।

শাহজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক জিয়া উদ্দিন বলেন, শুক্রবার মামলা হওয়ার পরে তিন ছিনতাইকারীকে আদালতে পাঠান আর বিচারক তাদেরকে তিন দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিন জন জানান, তাদর বাড়ি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায়। এদের একজন অটোরিক্সা চালান। অন্য দুই জনের কোনো কাজ নেই। তারা চালককে প্রস্তাব করেন ছিনতাইয়ে যুক্ত হতে। পরে তার সঙ্গে যোগ দেন ওই চালক।

Spread the love
  • 49
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    49
    Shares

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।