বাচ্চাবাজি: মুসলিম দেশেই শরীয়া বিরোধী এক নিষিদ্ধ রীতির চর্চা! (ভিডিও)

0

ফিচার ডেস্ক:

প্রয়াত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর শেষ ছবি “ঘেটুপুত্র কমলা” ছবিতে আমরা এক ঘেটুপুত্রকে দেখেছি। ঘেটুপুত্র কী? বর্ষাকালে যখন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, মাঠ-ঘাট-ফসলের জমি পানিতে একাকার, তখন ঐসব এলাকার জমিদাররা এক ধরণের বিশেষ নৃত্য-গানের আয়োজন করতেন। সেখানে কোন মেয়ে নাচ গান করতো না! বরং একটি ছেলেকে মেয়ে সাজিয়ে সেখানে জমিদার ও গণ্যমান্যদের সামনে তাকে নাচানো হতো। মেয়ের সাজে এসব ছেলেদেরকেই বলা হয় ঘেটুপুত্র। ঘেটুপুত্ররা শুধু নাচ-গানই করতো না, জমিদারের বিকৃত যৌন বাসনা পূরণ করার জন্য তাদেরকে জমিদারের শয্যাসঙ্গীও হতে হতো! ঘেটুপুত্ররা কিন্তু সমকামী নয়, কিংবা হিজড়াদের মতো জেনেটিক ত্রুটির কারণে এমন হতো না। বরং টাকার বিনিময়ে মনোরঞ্জন করাই ছিল তাদের পেশা।

এই পেশা শুধু বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে নয়, অন্যান্য অনেক দেশেই প্রচলিত। ১০-১৮ বছর বয়সী সুদর্শন কিশোরদের বেছে বেছে কিনে নিয়ে আসা এবং তারপর যৌন পরিতৃপ্তির জন্য মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত তাদের শরীরকে পৈশাচিকভাবে ব্যবহার করা, এটা আফগানিস্তানের ১০০ বছরের সুপ্রাচীন রীতি! কাবুলিওয়ালার দেশের এই ‘বর্বর ঐতিহ্য’ সকলের কাছে পরিচিত ‘বাচ্চাবাজি’ নামেই। আফগান উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো ছাড়াও আর্থিক সচ্ছ্বল আফগান পরিবারের পুরুষরাও এই ‘রিচুয়্যাল’ প্র্যাকটিস করে থাকে। এমনকি এই ধরণের কুরুচিকর ‘প্রথা’র ব্যবহারিক প্রয়োগে সামিল হয়েছে আফগান দেশের তাবড় থেকে তাবড়ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও।

কাম পরিতৃপ্তি তো বটেই ‘বাচ্চাবাজি’র মত ‘প্রথা’তে ১০-১৮ বছরের কিশোরদের মূলত ‘নর্তক’ করে রাখা হয়। যৌন দাসত্বের মতই মনীবের কথায় যেমন অনিচ্ছাকৃত কামে লিপ্ত হতে হয় তেমনই মনীবের কথাতেই এই কিশোরদের বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ‘মেয়ে সেজে’ নাচতেও হয়।

পবিত্র রমজান মাসে গোটা আফগান দেশ এই প্রথার ‘প্র্যাকটিসে বুঁদ হয়ে থাকে’, আর এটাই আরও বেশি করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিশ্ব মানবতার। শুধু যে পুরুষ বাচ্চা তা নয়, মেয়ে বাচ্চাদের ওপরও যে ধরণের অত্যাচার ‘বাচ্চাবাজি’র নামে হয়ে থাকে এবং এখনও হচ্ছে, তা আদতে এক প্রকাণ্ড মানবতা বিরোধী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

“কেবলমাত্র সন্তানের গর্ভ ধারণের জন্য কিশোরীদের ব্যবহার, আর কিশোরদের উপভোগ করা আনন্দের জন্য”, ‘বাচ্চাবাজির’ এই ট্র্যাডিশন ঈদের মত পবিত্র দিনেও পিছু ছাড়ছে না নিরপরাধ কিশোর-কিশোরীদের।

‘ইসলাম বিরোধী’ এই প্রথা, প্রথম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তালিবান শাসনকালেই (১৯৯৬-২০০১)। এরপর কিছু জায়গায় ‘বাচ্চাবাজি’কে সাময়িকভাবে বন্ধ করা গেলেও দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এই প্রথার রমরমা থেকেই গিয়েছে। এমনকি তাজিকের মত জায়গাতেও এই প্রথা ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে।

আফগানিস্তান ইন্ডিপেন্ডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের (AIHRC) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহিলাদের সঙ্গে পুরুষদের সামাজিক যোগাযগের অভাবের কারণেই বাচ্চাবাজির মত পাশবিক রীতির রমরমা বাড়ছে। এছাড়াও আইন, দুর্নীতি, অশিক্ষা, দারিদ্র, সামাজিক অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণগুলোও নাকি এই অসামজিক প্রথার বাড়বাড়ন্তের অন্যতম কারণ, এমনই দাবি আফগানিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের।

এ প্রসঙ্গে সচলায়তন ব্লগে প্রকাশিত ‘সবুজ পাহাড়ের রাজা’ লিখিত “বাচ্চাবাজি” ব্লগ পোষ্ট থেকে কিছু অংশ পাঠকদের জন্য উদ্ধৃত করা হলো।

বাচ্চাবাজি একটি পশতুন/ফারসী শব্দ। সহজ বাংলায় ছেলে শিশুদের নিয়ে খেলা করা। বাচ্চাবাজিতে ছেলে শিশুদের (সাধারণত: আট থেকে ষোল বছর) মেয়েদের পোষাক পরিয়ে নাচের জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সব ছেলে শিশুরা নাচের পাশাপাশি যৌনকার্যে ব্যবহৃত হয়। আফগান ওয়ারলর্ড-ব্যবসায়ী-সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বাচ্চাবাজির প্রধান গ্রাহক।


ছবি: প্রাচীন চিত্রকলাতেও বাচ্চাবাজি সংস্কৃতির বিষয়টি উঠে এসেছে

বাচ্চাবাজি মধ্য এশিয়ান একটি অনেক পুরনো একটি প্রথা। এই অঞ্চলে ইসলামের আর্বিভাবের বহু পূর্ব হতে বাচ্চাবাজির প্রচলন ছিলো। নানান সময়ে বাচ্চাবাজি মধ্য এশিয়ার নানান খানাতে নিষিদ্ধ এবং পুনঃ প্রচলন হয়েছিলো। বাচ্চাবাজি তালেবানদের সময়ে নিষিদ্ধ ছিলো। তালেবানদের পতনের পর বাচ্চাবাজি আফগানিস্তানে ফের প্রচলন শুরু হয়।

বাচ্চাবাজিতে ছেলেশিশুদের মেয়েদের মত করে সাজানো হয়; পায়ে নুপুর-মেয়েদের পোষাক পরে- মেয়েদের মত মেকআপ করে বয়স্ক পুরুষদের সামনে নাচতে থাকে এরা। আর এ সময় লালায়িত নরপশুরা আফগানী নোট ছুঁড়ে মারতে থাকে শিশুগুলোর উপর। নাচ শেষ হবার পর নিলাম শুরু হয় এই শিশুগুলোর।

পশতুন বয়স্ক পুরুষদের বিকৃত যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য বিক্রয় হয়ে যায় এই ছেলে শিশুগুলো। আফগানিস্তানের কান্দাহার-খোশত-খোন্দজের পশতুনদের মাঝে বাচ্চাবাজির ছেলে শিশুদের সাথে সঙ্গম এখন খুব সাধারণ একটি বিষয়।

স্টানফোর্ডের সাংবাদিকতার অধ্যাপক জোয়েল ব্রিন্কলের মতে, আফগানিস্তানের পশতুনরাই বাচ্চাবাজি-র প্রধান গ্রাহক। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো- জাতিতে পশতুন কান্দাহারের অধিবাসী প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের পরিবারের দুজন সদস্যর বিরুদ্ধে বাচ্চাবাজির অভিযোগ পেয়েছেন জোয়েল।

বাচ্চাবাজির মত ভয়ংকর এই বীভৎস রীতি ক্রমেই আফগান সমাজের স্থায়ী রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাচ্চাবাজিতে ব্যবহার করা শিশুরা বড় হয়ে গেলে, তারা স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ করে; কিন্তু এদের অনেকেই তখন বাচ্চাবাজির শিশুদের গ্রাহক হয়ে যায়। ফলে দেখা যায়, প্রতিনিয়ত বাচ্চাবাজির নিত্য নতুন গ্রাহক সৃষ্টি হচ্ছে। এক বালক রয়টার্সের নেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলে-

যখন আমি বড় হবো, তখন আমার নিজের মালিকানায় বাচ্চাবাজির ছেলে থাকবে।

বৈরুতে বসবাসরত লেখক আবদুল আহাদের গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত বাচ্চাবাজি নিয়ে একটি আর্টিকেল অনুসারে, আফগানিস্তানে বাচ্চাবাজি ক্রমেই খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।

উত্তর আফগানিস্তানে বিয়েতে বাচ্চাবাজির আয়োজন এখন খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। আফগানিস্তানে বাচ্চাবাজি নিয়ে রীতি মত সংগঠিত হোটেল-মাদক-ব্যান্ড-সিডি/ভিসিডি-দেহ ব্যবসায় হচ্ছে। বাচ্চাবাজির এত চাহিদা আফগানিস্তানে বেশি যে, এই সব ছেলে শিশু ক্রয়ে বিশ হাজার ডলার খরচ করতেও অনেকে কুন্ঠা বোধ করে না।

সাম্প্রতিক সময়ে উইকিলিকসের কল্যাণে জানা গেলো, আফগানিস্তানের কুন্দুজ প্রদেশে কার্য পরিচালনারত DynCorp নামের একটি নিরাপত্তা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বাচ্চাবাজিকে স্পন্সর করেছিলো। DynCorp এর কাজ আফগান পুলিশদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া। DynCorp তাদের অধীন প্রশিক্ষণাধীন আফগান পুলিশদের বিনোদনের জন্য বাচ্চাবাজিতে অর্থ স্পন্সর করে।

পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে আফগান প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হানিফ আতমার (জুন, ২০১০-এ পদত্যাগ করেন) বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য মার্কিন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান।

আফগানিস্তানে প্রচলিত শরিয়া আইন ও ফৌজদারী আইন উভয় আইনে বাচ্চাবাজি নিষিদ্ধ ও কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও এর কোন প্রয়োগই নেই। বরং, প্রশাসনই বাচ্চাবাজির পিছনে মদদ দিচ্ছে।


ছবি: প্রাচীন চিত্রকলাতেও বাচ্চাবাজি সংস্কৃতির বিষয়টি উঠে এসেছে

বিবিসি’র সাংবাদিক রুস্তম কোবিলের সাথে এক সাক্ষাৎকারে জোওজান প্রদেশের সহকারী পুলিশ প্রধান সরাসরি অস্বীকার করেন বাচ্চাবাজির উপস্থিতির কথা। যুদ্ধ বিধস্ত আফগানিস্তানের অস্থিতিশীল অর্থনীতি বাচ্চাবাজি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে। অনেক দরিদ্র আফগান পিতা অর্থের বিনিময়ে ছেলে শিশুকে তুলে দিচ্ছে দালালের হাতে।

আবার অনেক কিশোর দারিদ্রের কষ্ট সইতে না পেরে স্বেচ্ছায় বাচ্চাবাজিতে যোগ দেয়। আর সেই সাথে অপহরণের মাধ্যমে ছেলে শিশু সংগ্রহ তো আছেই। বর্তমানে জাতিসংঘ-মানবাধিকার সংস্থাগুলো আফগান প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছে বাচ্চাবাজি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে। স্থানীয়ভাবে কাজ করতে থাকা মানবাধিকার সংস্থা-এনজিওগুলোও চেষ্টা চালাচ্ছে বাচ্চাবাজি বন্ধে। তবে, বাচ্চাবাজি বন্ধে যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আফগানদের সদিচ্ছা আর আফগান প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপ।

ডকুমেন্টারি:

নাজিবুল্লাহ কুরায়েশীর বাচ্চাবাজি নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি “The Dancing Boys of Afghanistan” পিবিএস ফ্রন্টলাইনে প্রচারিত হয় ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল। মূলতঃ এই ডকুমেন্টারীই বাচ্চাবাজি সম্পর্কে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করে।

ডকুমেন্টারিটা দেখুন:

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।