ল্যান্ডিং গিয়ারের ত্রুটির জন্য এই মডেলের বিমানগুলো বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ!

0

সময় এখন ডেস্ক:

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যে বিমানটি নেপালের কাঠমান্ডুতে যাত্রী পরিবহন করত সেটির নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি পুরনো। আর ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিভিন্ন দেশে এই মডেলের বিমান নিষিদ্ধ। ইউএস-বাংলার এই বিমানটি এর আগেও একবার দুর্ঘটনায় পড়েছিল। জানা যায়, ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর একবার যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে ঘাসের ওপর পড়ে। সেসময় যাত্রীরা ভয়ংকর আতঙ্কিত হলেও কর্তৃপক্ষ একটি ব্রিফ দিয়ে দায় সেরেছিল।

জানা যায়, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এয়ারক্রাফটটি ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৭৪ জন যাত্রী নিয়ে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটি রানওয়ের এক প্রান্তে ইউটার্ন নিয়ে যখন পার্কিং বে-তে আসছিল তখন একটি চাকা আটকে যায়। সেদিন ঢাকা থেকে দ্রুততার সঙ্গে হেলিকপ্টারযোগে ইউএস-বাংলার দক্ষ প্রকৌশলীদের নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রকৌশলীরা বিমানটি পার্কিং বে-তে ফিরিয়ে আনেন এবং ফিরতি যাত্রীদের নিয়ে যথারীতি ঢাকায় ফিরে আসে।

দুর্ঘটনায় পড়া বিমানটির মডেল বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ এইট কিউ ফোর জিরো জিরো। কানাডার প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা দুই ইঞ্জিনের উড়োজাহাজটি অবতরণের ক্ষেত্রে প্রায়ই ভুল হয় বলে এক জরিপে জানা গেছে।

সোমবার ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭১ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়েই ছিটকে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে অন্তত ৫০ যাত্রীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। এই বিমানের যাত্রীদের মধ্যে ৩২ জন ছিলেন বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ১৪ জন বেঁচে আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আরও পড়ুন  অধ্যাবসায় | টাঙ্গা চালিয়ে শুরু জীবন যুদ্ধ, আজ বেতন পান ২১ কোটি!

নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় ফ্লাইটের দুই পাইলটকে দায়ী করেছে, তবে ইউএস-বাংলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আসিফ দায়ী করেছেন নেপালের ত্রিভূবন বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কট্রোল টাওয়ারের (এটিসি) থেকে তাদের পাইলটকে ভুল সংকেত দেয়া হয়েছে। ফলে কোথায় অবতরণ করতে হবে, সেটি তারা বুঝতে পারেননি। আর বিমানের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না।

বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না, সেই বিষয়টি তদন্তের পর জানা যাবেন। তবে বিমান চলাচল বিষয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানা গেছে, যে মডেলের ফ্লাইটটি কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত হয়েছে, সেই মডেলের ফ্লাইট অবতরণের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঝামেলায় পড়ে।

বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ এইট কিউ ফোর জিরো জিরো মডেলের দুই ইঞ্জিনের এই উড়োজাহাজের যাত্রী বহন ক্ষমতা ৭০ থেকে ৭৮ জন। কানাডার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দো হ্যাভেনেট কানাডার ১৯৮৩ সালে তৈরি এই মডেলের উড়োজাহাজ ১৯৮৪ সালে প্রথম উড্ডয়ন করে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কিনে নেয় বম্বারডিয়ার এয়ার স্পেস নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

আরও পড়ুন  ৮০ লক্ষ টাকায় ১ বোতল পানি: এ যেন অমূল্য রতন

এখন পর্যন্ত এক হাজার ২৪২টি এই ধরনের উড়োজাহাজ তৈরি হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনায় পড়েছে, যার প্রায় সবই ঘটেছে অবতরণের সময়। এ ধরনের উড়োজাহাজের প্রতি ১০০টি অবতরণের প্রায় অর্ধেকই সেইফ ল্যান্ডিংয়ের সব শর্ত পূরণ করে না। এর জন্য ত্রুটিপূর্ণ ল্যান্ডি গিয়ারকে দায়ী করেছেন আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৯০ সালের ২১ নভেম্বর ব্যাংকক এয়ারওয়েজের একটি ‍উড়োজাহাজ অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। ১৯৯৩ সালের ৬ জানুয়ারি জার্মানির লুফথানতা সিটি লাইনের বিমান অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। পরপর তিনটি উড়োজাহাজ অবতরণকালীন দুর্ঘটনায় পড়ার পর ২০০৭ সাল এই মডেলের বিমান নিজেদের বহরে নিষিদ্ধ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্স। ২০০৯ সালে এই মডেলের একটি বিমান অবতরণের সময় নিউ ইয়র্কে একটি বাসায় বিধ্বস্ত হয়।

এই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিমানের বহরেও এখন এই মডেলের উড়োজাহাজ আছে দুটি। দেশের প্রতিটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সও এ ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে।

আরও পড়ুন  ইউএস-বাংলার বিমানটি আসলে কে চালাচ্ছিলেন?

৫০০ মাইল বা এর চেয়ে কম দূরত্বে চলার উপযোগী এই উড়োজাহাজ। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন দেশের ছোট বিমান সংস্থার কাছে এই মডেলের উড়োজাহাজ বেশ জনপ্রিয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানান, খরচ কম পড়ে বলে বেসরকারি বিমান পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো সাধারণত পুরনো বিমানই ভাড়া করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নত দেশে বাতিলের খাতায় রাখা ফ্লাইটগুলোই ভাড়া আনা হয়।

ইউএস-বাংলার যে ফ্লাইটটি দুর্ঘটনায় পড়েছে, সেটি কবে ভাড়া আনা হয়েছে, সে বিষয়ে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কিছুই জানায়নি। জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল বলেন, ‘এ বিষয়ে ইউএস-বাংলার কোনো গাফিলতির প্রমাণ পেলে বা তারা নিরাপত্তায় ত্রুটি থাকা কোনো ফ্লাইট ব্যবহার করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

বাংলাদেশে বিমান পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ বিমান ভাড়া নিয়ে আসার প্রবণতার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এই বিষয়টি নিয়েও বিস্তারিত জেনে তারা উদ্যোগ নেবেন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।