পিতা জাফর ইকবালের ওপর হামলা-প্রতিক্রিয়ায় কন্যা ইয়েশিম ইকবাল যা বললেন

0

লেখক-অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় নিজের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাঁর কন্যা ইয়েশিম ইকবাল। মঙ্গলবার (৬ মার্চ) এটি লিখেন তিনি। নিচে তা তুলে ধরা হলো–

আমরা সবাই অবশ্যই শোকগ্রস্ত ও চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এই লেখা যারা পড়বেন তাদের অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন, দুঃখজনক হলেও আমার দেশ নিরাপদ নয়। যে ক্যাম্পাসে আমরা বেড়ে উঠেছি, সেই ক্যাম্পাসেই রোবোটিকস প্রতিযোগিতা উপভোগের সময় আক্রান্ত হয়েছেন আমার বাবা। এক তরুণ বন্ধু ব্যাকুল হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘কেন ইয়েশিম আপু? এমন ঘটনা যখন ঘটছে, তখন কেন এই দেশে থাকবে?’

অনেক মানুষই দেশের এই অবস্থা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন। অনেকেই বলেছেন, আমার পরিবার যদি দেশ ছাড়ে, তাহলে প্রমাণ হবে আমরাই বাবাকে ব্যর্থ করে দিয়েছি।

আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই। মূলত নিজের কিছুটা আলস্য থাকায় বাবার কাছ থেকে ধার করে নিয়েই বলতে চাই। কারণ, আমি জানি তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আবারও কী বলবেন। আমরা আশা ছাড়তে পারি না। আমরা কখনোই সত্য ও সুন্দরের লড়াই থেকে সরে আসতে পারি না। দেশের জন্য মনপ্রাণ দিয়ে যা চান আর যেগুলো এখনও হাতের মুঠোয় আসেনি সেগুলো পাওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি লড়াই বন্ধ করে দিতে পারেন না।

আরও পড়ুন  বেটার ডেইজ: স্বপ্নবাজ তরুণদের এগিয়ে চলার গল্প

সহজে কিছুই পাওয়া যায় না। আজ বিশ্বে যা কিছু উপভোগ করছি তার প্রত্যেকটি জিনিস– মুক্তভাবে হেঁটে বেড়ানোর একটা পথ, একবেলা খাবার, অসুস্থ হলে একজন চিকিৎসক, স্কুলে যাওয়ার অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার, জীবনধারণের পর্যাপ্ত পারিশ্রমিকের কাজের সুযোগ পাওয়া, রিকশায় চড়ে গিয়ে পেট খারাপের চিন্তা সত্ত্বেও ফুচকা খাওয়া– কারণ, যার সঙ্গে খাচ্ছেন তার হাসি আপনাকে আনন্দ দেয়; এর সবকিছুর জন্যই আপনার আগে জন্ম নেওয়া কেউ লড়াই করেছিল। কোনও কিছুই বিনামূল্যে ও সহজে আসেনি। কেউ এর জন্য অল্প অল্প করে, এক এক করে, দিনের পর দিন লড়াই করেছিল। আমার বাবা-মায়ের মতো অনেক মানুষ, আমার-আপনার মতো অনেক মানুষ। আমরা যা কিছু পেয়েছি তার প্রত্যেকটি জিনিস উপভোগের অধিকার ও দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। আর যা কিছু এখনও পাইনি তার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়াও আমাদের কর্তব্য। যাতে আমাদের সন্তানেরা তা পায়।

যখন তা কঠিন মনে হবে, যখন আপনার চিৎকার করে নিতান্ত ক্ষোভের কারণে কাঁদতে ইচ্ছে হবে– আমি জানি, কীভাবে পালাবেন তার কোনও চিন্তা আপনার মনের মধ্যে নেই। গভীর শ্বাস নিন। চারপাশে তাকান, দুর্ঘটনাবশত হারিয়ে ফেলা টুকরো টুকরো সাহস সঞ্চয় করুন। মাথা উঁচু করে দাঁড়ান আর পরের পদক্ষেপটি কোথায় ফেলবেন তা ঠিক করে নিন।

আরও পড়ুন  খালেদার সাজা ঘোষণার ৪৫মিনিট আগেই দিল্লিতে রায়ের কপি ফাঁস?

আমি জানি, এসব কথা বলতে পারছি তার অন্যতম একটি কারণ বাবা বেঁচে আছেন, ভালো আছেন, এই সেমিস্টারের পরের পাঁচটি কোর্স কীভাবে পড়িয়ে শেষ করবেন, তা নিয়ে কথা বলেছেন। আর আমি একই লড়াইয়ে প্রাণ হারানো মানুষদের পরিবার ও বন্ধুদের কথা ভাবতে চাই। অনেক মেয়ে আছেন যার বাবা কখনোই সেরে ওঠেননি। আমি তার কথা ভাবছি।

এই দেশে আছি, কারণ আমি এই দেশকে ভালোবাসি। এই দেশ আমার কাছে এই ঘটনার মতো কদর্য নয়। এই ঘটনা আর এর পেছনে জড়িতরা সমস্যা। দ্রুত তাদের মোকাবিলা করা জরুরি। তারা ফাঙ্গাস অথবা আঁচিলের মতো অনাহুত। তাদের সংখ্যা বেড়েছে, তারা এখন দৃশ্যমান কারণ, আমরা তাদের পরিষ্কার করার মতো ভালো কাজ করে উঠতে পারিনি। তাদের পরাজিত করা দরকার।

কিন্তু তারা জানে না এটা কোন জায়গা। আমার কাছে এই দেশ এক গর্বিত স্বেচ্ছাসেবক। আমি ‘কান পেতে রই’ এর সঙ্গে কাজ করি। এই দেশটাতে রয়েছে ছায়ানট আর শিল্পকলা একাডেমির মতো আনন্দের জায়গা, যেখানে আমি যেকোনও দিনই হৃদয়ের গান খুঁজে পাই। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও এই ছোট দেশটা বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্যে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে! এই দেশেই আছে একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আমি অনেক কিছু শিখি। এখানে আমার বাবার সহকর্মীরা রাতের খাবার টেবিলে বসে তাদের পরবর্তী পাঠ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে। এখানে আমার বন্ধুরা আমাকে ছোট মাছের কাবাব খাওয়ানোর জন্যে জোরাজুরি করে, কারণ এই খাবারে অনাগত বাচ্চা স্বাস্থ্যবান হয়। এই দেশটা আমার কাছে কোনও ভুল না করা আমার বাবা-মা। যারা কোথাও যাচ্ছেন না।

আরও পড়ুন  টয়লেট দেশে দেশে: ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা

আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে ওই মুহূর্তে সেখানে যারা ছিলেন, নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন, বাবাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি। দেশব্যাপী যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের ধন্যবাদ, আপনাদের স্বর আমাকে সাহস যুগিয়েছে। আর যাদের কাছ থেকে গত কয়েকদিনে এক সমুদ্র ভালোবাসা পেয়েছি, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। সত্যিই আপনাদের ভালোবাসা আমার জন্য খুবই দরকার ছিল।

ভুলের অবকাশ নেই। আমরা কোথাও যাচ্ছি না।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর লেখাগুলো

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।