প্র্যাংকের নামে গর্ভবতী সাজা আরজে ট্যাজের নোংরামি নিয়ে সমালোচনা!

0

বাংলা সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বহির্ভূত একটি ‘বিশেষ’ শ্রেণির জন্মদাতা হিসেবে এফএম রেডিও স্টেশনগুলোর প্রতি দেশের সংস্কৃতিপ্রেমি এবং সুশীল সমাজ অনেকদিন ধরেই সমালোচনায় মুখর। বিশেষ করে তাদের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, তরুণ সমাজকে নিজের সংস্কৃতিবিমুখ করে তোলার দিকে পরিচালিত করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিকৃত বাংলার ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে সচেতন মহল সোচ্চার যখন, এমন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে আরজে ট্যাজের আর একটি প্র্যাংক ভিডিও। এই আরজে সেখানে ‘মজা’ করার জন্য অভিনয় করেছেন। আর সেই ভিডিওটি নিয়ে খুব সমালোচনা হচ্ছে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, হঠাৎ লিফটে এক গর্ভবতী নারীর প্রসব ব্যথা উঠে। গর্ভবতী নারী ব্যথায় অস্থির হয়ে উঠবস করেন। তারপর লিফটের দেয়াল থাপড়িয়ে চিৎকার করেন, ‘আমার বাচ্চা আসছে। আমি কেমনে ওয়েট করবো। আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে।’ এ দৃশ্য দেখে লিফটে অবস্থান করা অন্য ব্যক্তিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। এমন অবস্থায় তারা কী করবেন বুঝতে পারেন না। কেউ ভয় পান, কেউ হেল্পের জন্য এদিক ওদিক ফোন করেন।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকেই শেয়ার করে এমন নোংরামি বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি উপযুক্ত শাস্তিও দাবি করছেন।

আনিসুর সুমন নামের এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী ভিডিওটি তার ফেসবুকে শেয়ার করে বলেছেন,

‘একজন নারী কী পরিমাণ মেন্টাল ক্রাক, ফাউল, উন্মাদ কিংবা বিকারগ্রস্ত হলে এ ধরনের কাজ করতে পারে তার প্রমাণ এটা। প্র্যাংকের নামে আগেও বেশকিছু অবান্তর কাজ করে দেখিয়েছেন তিনি। উনার নাম আরজে ট্যাজ। শুনেছি উনি একটি এফএম চালান, স্বনামধন্য ব্যবসায়ীও। সে যে সর্বোচ্চ শিক্ষিত তাতে নিঃসন্দেহ, তারপরও এই লেডি কিভাবে প্রেগন্যান্সি বা মাতৃত্ব কিংবা নারীর সর্বোচ্চ সুখের বিষয় নিয়ে এভাবে ফাউল ফান করতে পারে ভাবতেই পারবেন না। বয়কট, নিষিদ্ধ-ফিসিদ্ধ না, নারী নামের চরম কলঙ্কিত এই লেডির শাস্তি হওয়া দরকার।’

আরজে ট্যাজের আরও একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে আরজে ট্যাজ এক ব্যক্তিকে কল দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তিটির স্ত্রী কয়েকদিন আগে হাসপাতালে একটি বাচ্চা প্রসব করেছে।

এর আগে আর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। স্ত্রী সন্তান প্রসব করেছে, এমন একজন ব্যক্তিকে হাসপাতালের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে আরজে ট্যাজ বলেন যে- হাসপাতালের ভুলে বাচ্চা অদলবদল হয়ে গেছে এবং যে বাচ্চাটিকে ওই দম্পতি ঘরে নিয়ে গেছেন সেটি আসলে তাদের বাচ্চা নয়, অন্যের বাচ্চা এবং এই বাচ্চাকে এখন হাসপাতালে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই ভুলের মাশুল হিসেবে হাসপাতাল দম্পতিকে ক্ষতিপূরণ দিতে প্রস্তুত। ফোনে এই খবর শুনে নবজাতকের বাবা-মা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত এবং আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন, এক পর্যায়ে বাচ্চাটির প্রসূতি মা হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে অবস্থা বেগতিক দেখে এই আরজে ট্যাজ গোমর ফাঁস করে জানান আসলে এটা ‘প্র্যাংক’ বা ‘দুষ্টামি’ ছিল!

আরও পড়ুন  ‘খোকা কোথায় গেলি বাবা’ ম্যাজিস্ট্রেট বউয়ের জ্বালায় রেললাইনে ফেলে যাওয়া মা

ভিডিওটি সাইবার ৭১ -We Hack to Protect Bangladesh ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে লিখেছে-

প্র্যাংক কলের নামে মানুষকে এভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে কেন? প্রশাসন এবং মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ভিডিওটি সেটআপ হোক আর যাইহোক সাধারণ জনগণ এর মাঝে এইভাবে বিভ্রান্তি তৈরী করা কতটুকু যুক্তিগত আমাদের জানা নেই! ৩ মিনিট ৫২ সেকেন্ডর এই ক্লিপ দেখে বুঝে নিন এরা কি পরিমান হয়রানি করছে জনসাধারণকে, এরা স্টুডিও থেকে মজা নেয় আর অপরপ্রান্তে হাউমাউ করে কাঁদে!!!! এসব বন্ধ করার বিরুদ্ধে সবারই কথা বলা প্রয়োজন, প্রয়োজন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। আমরা শুরু করলাম, বাকীটা দেশবাসীর উপর ছেড়ে দিলাম।

এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিওটি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ আরজে ট্যাজকে মানসিক প্রতিবন্ধি বলছেন আবার কেউ কেউ প্রশাসন এবং মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

রাকিবুল হাসান লিখেছেন-

প্র্যাংক কল করে মানুষের স্বাথে তামাশা করার বিরুদ্বে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি।

সোহরাব হোসাইন লিখেছেন-

প্র্যাংক কল। সম্প্রতি বেশ শুনা যায়। এমনকি ইউটিউবে ঢুকলে বিভিন্ন নামের টাইটল ব্যবহার করে দর্শকদের নজর কাড়ে। এখন আসি মূল কথায়। এইসব প্র্যাংক কলের ভোক্তভুগী কিন্তু আমি, আপনি, বা আপনার সহজসরল মা-বাবা অথবা আপনজনের কেউ। কতটা যৌক্তিক অপরিচিত কাউকে বোকা বানিয়ে মজা নেয়া এবং সবশেষে বলা যে এটা একটা প্র্যাংক কল ছিল? দেখা যায় পুরুষ হলে একধরণের বক্তব্য অন্যথায় মহিলা হলে একধরণের বক্তব্য পেশ করে। কখনো প্রেমিক প্রেমিকা, কখনো মেরে ফেলার হুমকি, কখনো সন্তানাদি নিয়ে যা ইচ্ছা তাই বলে। আমি আসলে এর কোন যৌক্তিক কারণ খোঁজে পাইনি। একজনকে বোকা বানিয়ে অন্যজন মজা নিচ্ছে বা অন্যকাউকে মজা দিচ্ছে। আপনি বা ভোক্তভুগী যতই এড়িয়ে যেতে চায়, প্র্যাংক কলার ততটাই গভীরে ঢুকে মজা নেয়। বিষয়টা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আনা দরকার। যাতে এইসব ভণ্ডামি বন্ধ হয়।

মুনিরুল ইসলাম খান লিখেছেন-

আরও পড়ুন  বন্যার্তদের কাছ থেকে কোরবানের পশু কেনার অনুরোধ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

এই R J Tazz আমাকে প্র্যাংক কল করেছিল কিন্তু আমার গালির পরিমান এত বেশি ছিল যে তা ইউটিউবে আর আপলোড হয় নাই। আশা করি হবে না কখনও….. গালির ধরণ কেও আবার শুনতে চাইবেন না। এর উচ্চারণ শুনে একে ছাগল ছাড়া আর কিছু বলতে পারছি না। বাংলা উচ্চারণ বাংলার মত না করলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আর ইংরেজি বললে সেটাই বলতো পুরা স্ক্রিপ্ট এ, বাহবা দিতাম। এদের দেখে মনে হয় কাক, ময়ূর হতে চায়। মানসিক প্রতিবন্ধীদের পক্ষেই এটা করা সম্ভব। মহিলা অসুস্থ…..পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার ভালোবাসা সম্ভবত উনি কখনও দেখেননি। সন্তান নিয়ে মস্করা! এই মহিলাকে বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্লাসে পাঠানো দরকার! এ ধরনের প্র্যাংক, আসলেই কি কোন সভ্য দেশে হচ্ছে নাকি শুধু আমাদের দেশেই এভাবে সাধারন মানুষকে প্র্যাংক এর নামে মেন্টালি রেপ করা হচ্ছে?

মাহমুদা আক্তার নিশা লিখেছেন-

এরা কি ধরনের আরজে আর এটা কেমন রেডিও স্টেশন?! এগুলার জন্য বলতে লজ্জা লাগে যে এক সময় আমিও আরজে ছিলাম! একজন নবজাতক জন্ম দেওয়া মায়ের ইমোশন নিয়ে যেখানে এই ধরনের ফাইজলামি করা হয় সেখানে বেশি কিছু বলব না, এক কথাতেই শেষ করি, Rj Tazz তুমি একটা আবালচোদা!

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, কাউকে না জানিয়ে এভাবে রাত-বিরাতে উত্যক্ত করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি বলেন, ইন্টারনেট ঘাঁটলে দেখা যাবে প্র্যাংকের একটি মাত্রা থাকে। বিদেশে প্র্যাংক হয় বড়জোর কারও গায়ে সস ফেলে দেওয়া হচ্ছে বা ছোট একটা জিনিস হঠাৎ বড় হয়ে যাচ্ছে অথবা এরকম ছোট কিছু। এতে লোকে আতংকিত কম হয়, হয়তো অবাক হয় বা বিরক্ত হয় কিন্তু দেখা যায় জিনিসটি আসলে সেরকম বিস্ময়কর বা বিরক্তিকর কিছু ছিল না।

‘আপনার নবজাতক সন্তান আপনার নয়’ এমন একটি তথ্য মানুষের মনে অনেক গভীর প্রভাব ফেলে। যতক্ষণে এটি ‘প্র্যাংক’ স্বীকার করা হয় ততক্ষণে মানুষটি অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। ড. হেলাল জানান, এ ধরণের মানসিক ধাক্কা খেলে মানুষ দুই রকমের সমস্যায় ভুগতে পারেন। একটি হচ্ছে অ্যাকিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। এটি হলে মানুষ অন্য হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কাউকে আঘাত করতে পারে, আত্মহত্যা করতে পারে। আরেকটিকে হচ্ছে প্যানিক অ্যাটাক। এতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন  হতভাগ্য শংকর বিশ্বাসের পাশে এসে দাঁড়াবেন কেউ?

এই নির্দিষ্ট প্র্যাংক কল সম্পর্কে ড. হেলাল বলেন, ভুক্তভোগী মায়ের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে একটি শিশু জন্ম হয়েছে। এই সময়টি একজন সদ্য প্রসূতির মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুব স্পর্শকাতর সময়। এসময় অধিকাংশ নারী প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগেন, তাদের ঘুম ও বিশ্রামের সময়ের ব্যাঘাত ঘটে, অনেকের হরমোনের পরিবর্তনের ফলে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকে। এ ধরণের মানসিক অবস্থায় বাইরের কোনো প্ররোচনা ছাড়াই নিজ শিশুকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তা যদি নাও হয় মায়ের মনোজগতে এমন কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে যা নিরাময় করা অসাধ্য।

এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার অনীক আর হক জানান, আমাদের দেশে গত বছর ২৪ জুলাই প্র্যাংক ভিডিও বন্ধে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে। সেই রুলে হাইকোর্ট মজা করার উদ্দেশ্যে যদি সাধারণকে হয়রানি করা হয় তবে তা বন্ধের ব্যবস্থা নিতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন, জানান ব্যারিস্টার অনিক। এ ছাড়াও নতুন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৩ ও ২৪ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত বা জ্ঞাতসারে অন্য কারও (ব্যক্তি বা কোম্পানি) পরিচয় ধারণ করে, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে, কাউকে মিথ্যা ভীতি প্রদর্শন করে, বিরক্ত করে, অপমান করে এবং এর ফলে ব্যাক্তি নিজে কোনোভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হয় তবে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অপরাধ প্রমাণিত হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। যদি এ কাজ একাধিক বার করা হয় তবে কারাদণ্ডের মেয়াদ হবে ৭ বছর ও অর্থদণ্ড হবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত, উল্লেখ করেন ব্যারিস্টার অনীক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের ডেপুটি কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন জানান, নিজেদের মজার জন্য অন্যকে উত্যক্ত করার কোনো সুযোগ আইনে নেই। এ ধরণের কোনো ঘটনার অভিযোগও যদি কেউ নাও করে তবুও মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, মানসিক স্থিরতা বিঘ্ন বিষয়ক ঘটনা আইনশৃংখলা বাহিনী নজর রাখে।

যদি সচেতন মানুষ এগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাহলে পুলিশ নিজে থেকেই এ দায়িত্ব তুলে নিয়ে ব্যবস্থা নেয়, জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।