অপেক্ষা || শহীদ ডাঃ জামিল আক্তার রতনের রক্তঋন পরিশোধের

0

তখন,
৩১ মে, ১৯৮৮

রোদজ্বলা এক সুন্দর দুপুরে রামেক ক্যাম্পাস রক্তাক্ত হল। কোরবানির গরুর মত জবাই হয়ে গেলেন অসম্ভব মেধাবী ডাঃ জামিল আক্তার রতন। তার পেট এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল একজন নন মেডিকেল শিবির কর্মীর ধারাল অস্ত্র। প্রচন্ড ক্ষমতার দাপটে তখন তার কিছুই হয়নি। এরপর তার বাবা সে সময়ের জজ, বেঁচে গিয়েছিল সেই খুনী। কিছুদিন আড়ালে আবডালে থাকার পর আবার প্রকাশ্যে চলাফেরা শুরু করল। জামিল আক্তার রতন তখন অতীত। অত্যন্ত ব্যস্ত মেডিকেলগোষ্ঠির তার কথা মনেই থাকল না। তার সমাজতান্ত্রিক সাঙ্গপাঙ্গ অল্প গর্জে উঠল, ওই কাগুজে গর্জন, লোক দেখানো মানববন্ধন কিংবা সমাবেশ, তারপর পেটপুরে খেয়েদেয়ে ঘুম। জামিল আক্তার রতনের নামে হল একটা মেডিওকোর হোস্টেল, বিচার… তা আর কে চায়? কতশত মানুষ মরছে প্রতিদিন, প্রতি সেকেন্ড। ডাক্তারদের মেরুদণ্ড নেই, শো অফ আর অহংকার সর্বস্ব এই সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করতে যাওয়ার খেসারত দিলেন মেধাবী তুখোড় জামিল।

এখন,
ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

কেটে গেছে প্রায় ত্রিশ বছর। সেই খুনী আর ঘৃণিত কেউ নয়। ফ্রেঞ্চকাট দাড়িমুখে অত্যন্ত সম্মানিত একজন শিক্ষক, প্রভাষক! পান্না মাস্টার বা পরিমল যা পারেনি। হয়ত জলজ্যান্ত মানুষকে খুনের জন্যই তার মানসিক রোগ প্রবল। কখনো প্রতিবেশীর সবগুলো গাছ কেটে দেন, কখনো কলিগের পোষা কুকুরছানার চোখ উপড়ে দেন, কখনো সহকর্মী নারী অধ্যাপকের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে হেনস্থা করা, আবার কখনো অন্য ডিপার্টমেন্টের মেয়েদের টিজ করেন। বাধ্য হয়ে তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসা চলে। এরইমধ্যে তিনি হিরো আলম – টুনটুনি আদ্রিতার মত তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। “অতি ব্রিলিয়ান্ট মানুষের ভেতর হালকা পাগলামি থাকেই”, এই কথা কায়মনোবাক্যে মেনে নিয়ে তার ছাত্রছাত্রীরা এক পর্যায়ে তাকে পীরের সমান মর্যাদা দেয়। তার নামে মানত করা বাকি থাকে, তার মাজারের অবশ্য প্রয়োজন হয়না, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অনুষদই তো তার মাজার, এই মাজারে জামায়াতপন্থি শিক্ষক Fu..k সহ নানান বিদেশী শব্দের প্রচলন ঘটান। সেসব লুফে নেয় তার মুরিদকুল। এরকম আধুনিক পীর কি আর সবখানে জোটে?

বাধ সাধল সর্বনাশা টুইস্টে!

সেই ভদ্রলোক খুনী আবার সেই ডাঃ জামিলের রক্তমাখা রামেকে ছুটে এলেন অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসার জন্য। ছুটতে যেয়ে এক বাঘা মেয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে তর্কে জড়ান, সেখান থেকে টিজ এবং রাত এগারোটায় একদল ক্লান্ত ইন্টার্নের হাতে উত্তমমধ্যম খেয়ে পরদিন নিজ মাজারে তার প্রচার। তার উত্তেজিত মুরিদকুল চোখেরজল নাকেরজল এক করে হইরই করে বিশ্ব কাঁপিয়ে ফেলল রাতারাতি। শিবির ক্যাডার এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস নেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কিংবা সুশীল সমাজের। এই সুযোগে পীর তার ইমোশনাল মাজেজা দেখিয়ে চললেন।

তারপর?

কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে গেল। খাল কেটে কুমির আনার ভুলটা হয়ত উনার মত অভিনেতার জন্য অপ্রত্যাশিত। অনলাইন ডাটাবেজ আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে উনার চেহারা চেনার বাকি থাকল না আর। একেরপর এক উনার অতীত কুকীর্তি বুদবুদের মত ভেসে উঠতে শুরু করল। উনার এই হাজার মুরিদের অযুত তেলেসমাতি ধীরে ধীরে মলিন হতে লাগল। উপায়ান্তর না দেখে এবার উপর মহলের চাপ, ভয়ভীতি, মামলার হুমকি আর পোষা সাংবাদিকদের অপতৎপরতা। কিন্ত তুষের আগুন এত সহজে নেভে না।

সবশেষ?
এর উত্তরের জন্যই অপেক্ষা

…অপেক্ষা নাটকের শেষ অঙ্ক দেখার জন্য

কৃতজ্ঞতা: শহীদ ডাঃ জামিল আক্তার রতন হত্যার বিচার বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি

** অধ্যাপক এটিএম এনামুল জহির সম্পর্কিত সংবাদগুলো একসাথে পেতে ক্লিক করুন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।