‘খুলি উড়িয়ে দেয়ার নেশা’

0

।। সাইফুর রহমান ।।

তাতার সাম্রাজ্যের অধিপতি দুনিয়া কাঁপানো দিগ্বিজয়ী তৈমুর লং সম্পর্কে একটি মিথ চালু আছে। তিনি নাকি মাথার খুলি বেশ পছন্দ করতেন। কথায় কথায় তলোয়ারের খোঁচায় উড়িয়ে দিতেন মানুষের খুলি। ১২৫৬ সালে যখন তিনি দিল্লি আক্রমণ করেছিলেন তখন নাকি তিনি ৭০ হাজার, মতান্তরে ৯০ হাজার মানুষের শিরশ্ছেদ ঘটিয়ে অতঃপর সেই খুলি দিয়ে তৈরি করেছিলেন একটি সুউচ্চ পিরামিড। মানুষের মাথার খুলির প্রতি তৈমুরের অনুরাগসংক্রান্ত মিথগুলোর আরও দু-একটি এরকম— একবার সিরিয়া আক্রমণের পর মানুষের খুলি দিয়ে তৈমুর নাকি তৈরি করেছিলেন একটি উঁচু মিনার আর রাতের বেলা সে মিনার তিনি আলোকিত করেছিলেন স্পিরিটের আলো দিয়ে। তৈমুর লং বাগদাদ আক্রমণ করেন ১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে। আক্রমণের প্রাক্কালে তৈমুর তার প্রতিটি সৈন্যকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে শত্রুপক্ষের অন্তত দুটি করে মুণ্ডু কেটে এনে দেখাতে হবে তাকে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, তৈমুরের সবচেয়ে বিখ্যাত দুজন জীবনীকার-হ্যারন্ড ল্যাম্ব এবং জাস্টিন মারোজি ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছেন তৈমুরের বিরুদ্ধে এসব অপবাদ। ল্যাম্ব এবং মারোজি দুজনেরই ভাষ্য হচ্ছে অপপ্রচারমূলক এসব ইতিহাসের জন্ম পারস্য ও ইউরোপে এবং এ অপবাদের বিস্তার তৈমুরের মৃত্যুর ২০০ বছর পর। পারস্য এবং ইউরোপ কেন তার সম্পর্কে এমন জঘন্য ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল সেটা অনুমান করা খুব যে কঠিন তা নয়। তৈমুরের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সিরিয়া, বাগদাদ ও ইরান। আর তুর্কিরা ইউরোপ থেকে হাজার হাজার সৈন্য ভাড়া করে এনেছিল তৈমুরকে প্রতিহত করতে। ইউরোপ থেকে আসা সেসব সৈন্য কচুকাটা হয়েছিল তৈমুরের তলোয়ারের আঘাতে।

হ্যারন্ড ল্যাম্ব ও জাস্টিন মারোজি দুজনেই একমত যে সে সময়ের খ্রিস্টান, মোংগল, তুর্কি, চৈনিক কিংবা অন্য যে কোনো রাজা কিংবা সম্রাটের মতো তৈমুরও ছিলেন একজন নৃশংস সম্রাট। সম্রাট তৈমুরের জন্ম ১৩৩৬ সালে বর্তমান উজবেকিস্তানে। তৈমুর নামের অর্থ হচ্ছে ইস্পাত। কৈশোর বয়সে তৈমুর সতীর্থ কিছু যোদ্ধা নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি দস্যু বাহিনী। তারা গ্রামে-গঞ্জে গৃহস্থের খামারে কিংবা ধানের গোলায় লুটতরাজ করত। একবার নৌবন্দরে একটি জাহাজ লুট করতে গিয়ে তীরের আঘাতে তার ডান হাত ও পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডান পায়ের ক্ষতিটি তৈমুর আর কখনোই পুষিয়ে উঠতে পারেননি বলে সমস্ত জীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় তাকে। এ জন্য পারস্য জাতি অবজ্ঞার সুরে তাকে সম্বোধন করতে শুরু করে ‘তৈমুর ল্যাং’ বলে। ফারসি ভাষায় ল্যাং অর্থ হচ্ছে খোঁড়া। ইউরোপও পক্ষপাতদুষ্টভাবে তৈমুরকে বলে ‘তাম্বুরলেইন’ ‘তৈমুর দ্য লেইম’ থেকে সংক্ষেপে তাম্বুরলেইন। ইংরেজিতে লেইম অর্থ হচ্ছে খোঁড়া। আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা কিন্তু যথেষ্ট সম্মান দিয়ে তাকে তৈমুর ল্যাং না বলে বলি তৈমুর লং।

তার বিরুদ্ধে এমন একটি অপবাদ প্রচার করার আরও দু-একটি কারণ, আমার মতে সম্ভবত- তার পূর্ববর্তী বহু মোংগল নেতার মানুষের মুণ্ডুর প্রতি ছিল বেশ আসক্তি। যেমন চেঙ্গিস খান তার শত্রুর কাটা মুণ্ডু না দেখলে নাকি বিশ্বাসই করতে চাইতেন না যে সত্যি সত্যি তার শত্রুটি নিহত হয়েছে। এ জন্য সৈন্যরা শত্রুর মুণ্ডু কেটে এনে রাখতেন চেঙ্গিস খানের সিংহাসনের পদতলে। তবেই মিলত তার আত্মতুষ্টি। চেঙ্গিস খানের দৌহিত্র হালাকু খানেরও ছিল মানুষের মুণ্ডুর প্রতি সীমাহীন লোভ। হালাকু ও কুবলাই খান দুজন আপন সহোদর। কিন্তু চরিত্রের দিক থেকে দুজনেই ছিলেন একেবারে ভিন্ন। এখানে উল্লেখ্য, চেঙ্গিস খান, কুবলাই খান কিংবা হালাকু খান এরা কিন্তু কেউই মুসলমান ছিলেন না। খান শব্দটি একটি মোংগল শব্দ যার অর্থ হচ্ছে গোত্র প্রধান। তবে ধর্মের দিক থেকে তৈমুর লং ছিলেন ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তার রাজ্যের লোকজন অবশ্য তাকে সম্বোধন করত ‘অর্ধ মুসলিম’ বলে। তিনি মদও খেতেন আবার ইসলামী অনুশাসনও মেনে চলতেন। সে যাই হোক, হালাকু খানের কথা বলছিলাম। তো হয়েছে কী, হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করেছিলেন ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখে বাগদাদ আত্মসমর্পণ করল হালাকু বাহিনীর কাছে। কিন্তু আত্মসমর্পণ করার পরও রেহাই পেল না বাগদাদ নগরী ও নগরীর মানুষ। হালাকু ও তার সেনাপতি গুও কান মুণ্ডুপাত করল নব্বই হাজার, মতান্তরে দুই লাখ মানুষের। ভস্মীভূত করল বাগদাদের বিখ্যাত পাঠাগার যেখানে সংরক্ষিত ছিল চিকিৎসা ও জোতিষ শাস্ত্র ছাড়াও বিচিত্র বিষয়ে মহা মূল্যবান সব গ্রন্থ। এ ছাড়াও হালাকু খান ধ্বংস করল মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, দৃষ্টিনন্দন সব সৌধ ও হর্ম্য। বাগদাদের খলিফা আল মুস্তাসিমকে বন্দী করে তার দৃষ্টির সামনে ঘটানো হলো এসব নারকীয় কাণ্ড। সেদিন টাইগ্রিস নদীর জল দুটি রং ধারণ করে সমান্তরাল দুই ভাগে প্রবাহিত হয়েছিল। একভাগ, বিশাল পাঠাগারের বইয়ের কালো রং পানির সঙ্গে মিশে হয়েছিল কৃষ্ণবর্ণের। জলের অন্য ভাগ ধারণ করেছিল মুণ্ডু কাটা মানুষের টাটকা রক্তের অরুন বর্ণের লাল রঙে। এদিক দিয়ে তৈমুর লং ছিলেন আবার বেশ একটু ব্যতিক্রমী ধরনের। তিনি কোনো রাজ্য আক্রমণ করার আগে উড়িয়ে দিতেন সাদা পতাকা। যেসব মানুষ সাদা পতাকার নিচে এসে আত্মসমর্পণ করত তাদের তৈমুর হত্যা করতেন না। এরপর তিনি উড়িয়ে দিতেন লাল পতাকা। তখন শুধু হত্যা করা হতো সেনাপতিদের। এরপরও যখন আত্মসমর্পণ করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না তখন তিনি উড়িয়ে দিতেন কালো পতাকা এবং ধ্বংস করে দিতেন প্রতিপক্ষের সৈন্যবাহিনী। তবে তৈমুর সাধারণত নিরীহ লোকজনকে হত্যা করতেন না। তিনি কবি-সাহিত্যিকদের খুব কদর করতেন। ইরান ও তুর্কি থেকে অনেক কবি-সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি নিয়ে আসতেন সামারখন্দে। পারস্য কবি হাফিজকেও তৈমুর অসম্ভব পছন্দ করতেন। হাফিজ একটি কবিতা লিখেছিলেন— ‘প্রাণ যদি মোর দেয় ফিরিয়ে তুর্কি সওয়ার মনচোরা/প্রিয়ার মোহন চাঁদ কপালের/একটি কালো তিলের লাগি বিলিয়ে দেব সামারখান্দ ও রত্নখচা এ বোখারা।’

কিছুদিন আগে এক রবিবার সকালে আওয়ামী লীগের সাবেক এক সংসদ সদস্য গুলি করে শিক্ষার্থীদের মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বেতন বৃদ্ধি বন্ধসহ মোট আট দফা দাবিতে আন্দোলনে নামা বেসরকারি শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এ হুমকি দেন তিনি।

সাবেক এ সংসদ সদস্য শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বর্তমান চেয়ারম্যান। আট দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা সকাল ৮টা থেকে হাসপাতালের সামনে অবস্থান করছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন হাসপাতালের এ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘ধর্মঘট করলে আমার কোনো সমস্যা হবে না। বেশ কটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। আমিও বন্ধ করে দেব।’… যারা ইতরামি করবে, খুলি উড়াইয়া দেব।’


ছবি: লাল বৃত্ত চিহ্নিত বুশ সিনিয়র

জানা গেছে, ওই মেডিকেল কলেজেরই এক বিদেশি ছাত্রীকে উদ্দেশ করেও হুমকি দিয়েছেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পুলিশকে পাশে রেখেই আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন তিনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত কিছু থাকতে দাপটধারী এ নেতা আন্দোলন সংগ্রামরত ছাত্রছাত্রীদের মাথার খুলি কেন উড়িয়ে দিতে চাইলেন? তিনি নিশ্চয়ই বলতে পারতেন ‘জানে মেরে ফেলব একেবারে’ কিংবা ‘গুলি করে পাঁজর ঝাঁজরা করে দেব’ ইত্যাদি। কিন্তু খুলির প্রতি তার কেন এত আক্রোশ। উনি কি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিলেন যে, মাথাই হচ্ছে একজন মানুষের সব। পাবলো নেরুদা, ভলতেয়ার, রুশো, ভিক্টর হুগো, গ্রামসি প্রভৃতি মগজসম্পন্ন মানুষগুলো তাদের সময়কার স্বৈরাচারী রাজা কিংবা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রনায়কের হাতে মাথা খোয়ানোর ভয়ে সব সময় পালিয়ে বেড়িয়েছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ফরাসি বিপ্লবের পর গণেশ উল্টে গিয়ে ফ্রান্সের রাজা অষ্টাদশ লুই তখন কারাগারে, হঠাৎ একদিন তার চোখ গিয়ে পড়ল ভলতেয়ারের মোটা মোটা সব বইয়ের ওপর। তখন রাজা অষ্টাদশ লুই নাকি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন এ লোকটির চাবুকের মতো তীক্ষ এ লেখাগুলোর জন্যই আজ আমাদের এমন দুরবস্থা। কিংবা মুসোলিনী বিখ্যাত লেখক গ্রামসির উদ্দেশে বলেছিলেন আগামী ২০ বছরের জন্য তার চিন্তা করার ক্ষমতাকেই আমাদের থামিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এত কিছু তো এ সংসদের জানার কথা নয়। তার নিজের বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়েই মানুষের সংশয় আছে। কারণ ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। অন্যদিকে এ সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে নিজেই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে।

যাক সে কথা। বলছিলাম খুলির প্রতি উনার কেন এত আক্রোশ। সচেতন কিংবা অবচেতন যেভাবেই বলি না কেন এর কিন্তু একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। যেমন আমরা অনেক সময় বলি ‘যদি ভালোভাবে বাঁচতে চাও তো মাথা উঁচু করে বাঁচো’। কিংবা ‘ওই লোকটি সব সময় মাথা নিচু করে হাঁটে’। মেধাবী লোকজনকে উদ্দেশ করে হরহামেশাই বলি ‘লোকটার মাথা আছে বটে’। আর ঠিক তেমনি নির্বোধ লোকদের উদ্দেশে বলি ‘লোকটি একেবারেই মগজহীন’। অতএব দেখা যাচ্ছে যে উপরোক্ত সবকিছুই কিন্তু খুলি সংশ্লিষ্ট। প্রাচীনকালে দেখা যেত বিভিন্ন দেশের বর্বর আদিবাসীদের কাছে মাথার খুলি হচ্ছে অমিত শক্তির প্রতীক। আদিবাসীদের মধ্যে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ছিল না বলে খুলির ভিতর কী আছে অথবা কী নেই সেগুলো নিয়ে তাদের সেরকম কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তবে তারা অবশ্যই মাথার খুলিকে অসীম শক্তির উৎস বলে মনে করত। এ জন্যই আমরা পাশ্চাত্যের অনেক চলচ্চিত্রে দেখতে পাই, আদিবাসী রাজা যেখানে বসে থাকে তার পেছনটা রাজ্যের সব নরমুণ্ডু দিয়ে সাজানো। দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা অন্যান্য অনেক দ্বীপ অঞ্চলের বর্বর আদিবাসীরা এক সময় তাদের ঈশ্বরের উদ্দেশে মানুষ বলি দিত। তারপর সেই মুণ্ডু দিয়ে তারা সিংহাসন সাজাত। জেনে অবাক হতে হয় যে, মাথার খুলিকে শক্তির উৎস বলে মনে করে আমেরিকার একটি গুপ্ত সংঘ। গুপ্ত এ সংঘটির অবস্থান আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় ইয়েল এ। সিক্রেট এ অর্গানাইজেশনটির নাম ‘স্কাল অ্যান্ড বোন্স’, বাংলা করলে এর মানে দাঁড়ায় ‘খুলি ও হাড়’। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে। অতঃপর ‘খুলি ও হাড়’ নামক এ গুপ্ত সংঘটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে। প্রতি বছর বসন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী ও চৌকস ১৫ জন করে ছাত্র এ গুপ্ত সংঘের সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। ‘খুলি ও হাড়’ নামক এ সংঘটি গুপ্ত এ কারণে নয় যে, মেধাবী ও চৌকস সেসব ছাত্রকে কেউ খুলি উড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখায় বরং এটা অতিশয় গোপনীয় এ জন্য যে, এরা পড়াশোনা শেষ করে একজন আরেকজনকে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে দারুণভাবে। পৌনে ২০০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত এ গুপ্ত সংঘটি থেকে এ পর্যন্ত তিনজন সদস্য আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সঙ্গে অসংখ্য সদস্য মন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, সিনেটর ও আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে আমেরিকার ২৭তম রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম হাওয়ার্ড ৪১তম রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ৪৩তম রাষ্ট্রপতি বুশ জুনিয়র। ২০০৪ সালে ‘খুলি ও হাড়ের’ দুজন সাবেক সদস্য মুখোমুখি অংশ নেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। তাদের মধ্যে একজন বুশ জুনিয়র অন্যজন জন কেরি। অনেকেই সে সময় ধারণা করেছিল, এবার বুঝি খুলি ও হাড়ের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তারা এতটাই সাবালকত্বের পরিচয় দেন যে, গুপ্ত সংঘটি সম্পর্কে তাদের কারও মুখ থেকে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত শোনা যায়নি। বুশ জুনিয়র তো এ গুপ্ত সংঘের সদস্য ছিলেনই। তার বাবা জর্জ ডব্লিউ বুশ ছিলেন এ সংঘের সদস্য। শুধু তাই নয় জর্জ ডব্লিউ বুশের পিতা প্রেসকট বুশও ছিলেন খুলি ও হাড়ের একজন সক্রিয় সদস্য। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে প্রেসকট বুশ একবার ওয়াকলাহামা গোরস্তান থেকে কবর খুঁড়ে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান আদিবাসীদের নেতা জোরানেমোর মাথার খুলি তুলে এনেছিলেন শুধু এটা প্রমাণ করার জন্য যে, সংঘের সদস্যরা চাইলে যে কোনো ভয়ঙ্কর কাজ করতেও সদা প্রস্তুত।

এ প্রসঙ্গে আমার জিজ্ঞাসা সাবেক ওই সংসদ সদস্য কি তার শক্তি দেখানোর জন্যই ছাত্রছাত্রীদের খুলি উড়াতে চেয়েছিলেন, নাকি তার খুলি উড়াতে চাওয়াটা ছিল শুধুই ছাত্রছাত্রীদের ভয় দেখানো।

মানুষের মুণ্ডু কেটে ভয় দেখানোর একটি ইতিহাস আমার মনে পড়ছে এ মুহূর্তে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আমল থেকেই রোমানরা ব্রিটেন জয় করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সাফল্য তারা পাচ্ছিলেন না তেমন একটা। রোমান সম্রাট কালিগুলার মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অনিচ্ছুক সম্রাট ক্লডিয়াস বসলেন সিংহাসনে। অনিচ্ছুক সম্রাট বললাম এ কারণে যে, ক্লডিয়াস তার পুরো জীবন বইপত্রের মধ্যেই মুখ গুঁজে থাকতেন। জ্ঞান অর্জনই ছিল তার জীবনের একমাত্র ধ্যান জ্ঞান। ক্ষমতার প্রতি তার বিশেষ লোভ কিংবা ইচ্ছা কোনোটিই ছিল না। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তাকেই বসতে হলো সিংহাসনে। সেই ক্লডিয়াসই সেনাপতিদের নির্দেশ দিলেন, যে করেই হোক জয় করতে হবে ব্রিটেন। রাজার নির্দেশ অনুযায়ী সেনাপতিরা ব্রিটেন জয় করার শুরুতেই পড়লেন মহাবিপদে। সেখানকার দক্ষিণ অঞ্চলের কিছু আদিবাসী ছিল দুর্ধর্ষ কিসিমের। ভয় দেখানোর জন্য শত শত রোমান সৈন্যের মুণ্ডু কেটে বর্শার আগায় বিদ্ধ করে সেই বর্শা তারা গেঁথে রাখত জমিতে। এ ধরনের বীভৎস দৃশ্য দেখে পিছু হটে গেল সৈন্যরা। সেই সংবাদ জানানো হলো সম্রাটকে। সম্রাট ক্লডিয়াস ছিলেন অতিশয় বুদ্ধিমান। তিনি তার সেনাপতিদের বললেন, আমার তিনটি উপদেশ যদি তোমরা অনুসরণ করতে পার তবে অবশ্যই জয় করতে পারবে ব্রিটেন। এক. সর্বপ্রথম শিখতে হবে তাদের ভাষা। দুই. খুঁজে বের করতে হবে শত্রুর বিশেষ বিশেষ দুর্বলতাগুলো। তিন. গোত্রপ্রধানের শত্রুদের খুঁজে বের করে কাজে লাগাতে হবে তাদের। চার. উপযুক্ত পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে হলেও তৈরি করতে হবে বিশ্বাসঘাতক। যারা আমাদের চিনিয়ে দেবে আদিবাসী যোদ্ধাদের আস্তানা। ক্লডিয়াসের এ পরামর্শের গুণেই রোমানরা জয় করে নিল ব্রিটেন। আর ক্লডিয়াসের পুত্র ব্রিটেনিকাসের নাম অনুযায়ী গ্রেট ব্রিটেনের নাম হলো ব্রিটেন। আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যদি সম্রাট ক্লডিয়াসের মতো ঘিলুওয়ালা কোনো লোক থেকে থাকে তাহলে সাবেক ওই সংসদ সদস্যের ভয় দেখানোর অভিপ্রায়টি কিন্তু ভণ্ডুল করে দিতে পারেন অনায়াসে।


ছবি: লেখক- সাইফুর রহমান

বহুল আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্যের খুলি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকিটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। চারদিকে ওঠে নিন্দার ঝড়। আমার মতে এটি মোটেও ভালো কাজ হয়নি। উনি যদি দাবি করেন এটা তিনি এত ভেবেচিন্তে করেননি তারপরও বলব কিছু বলার আগে তার ভেবে বলা উচিত ছিল। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা হেরে যাওয়ার পর সৈন্যরা যখন আমেরিকায় ফিরে আসছিল তখন তাদের অনেকের মধ্যেই মানুষের খুলি সংগ্রহের একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। পরে তাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কেউই সুনির্দিষ্ট করে কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কিন্তু তাদের এ কর্মের জন্য সমালোচনার ঝড় ওঠে আমেরিকায়। প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা যায়, কারবালার প্রান্তরে আমরা দেখি সিমার যখন ইমাম হোসেনের মস্তক কেটে তুলে দিয়েছিল ইয়াজিদের হাতে। এ ঘটনায় আমাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয় সিমারের নিষ্ঠুরতায়। এ জন্য আজও নির্মম ও নিষ্ঠুর মানুষদের আমরা সিমার বলে সম্বোধন করি। এ জন্য কিছু বলা কিংবা করার আগে চিন্তাভাবনা করে বলা কিংবা করা উচিত।

লেখক: গল্পকার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।