হাফেজ মুফতি মাসুদ এর পক্ষে-বিপক্ষে | একটি পর্যালোচনা

0

।। তানিয়া ফরাজী ।।

অনেকদিন যাবৎ খেয়াল করছি, অালহাজ্ব মুফতি অাবদুল্লাহ অাল মাসুদ নারী অধিকার, শিশু অধিকার, অমুসলিমদের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা করছেন। ইসলামিক স্কলাররা মুফতি সাহেবের কঠোর সমালোচনা করে অনেক বক্তব্য দিচ্ছেন। অালেমরা এখন নিজেরাই ইসলামের সত্যতা নিয়ে কনফিউজড, এমনটাই দাবি করছেন মুফতি মাসুদ। এ দাবি কতটুকু সত্য বা মিথ্যা তা জানিনা, তবে এটুকু বুঝি- অভিযোগ খন্ডন ও প্রশ্নের জবাব দেয়ার বদলে ইসলামি গবেষকরা দোয়া নিক্ষেপ, অভিশাপ বর্ষণ ও চক্রান্তের থিওরি অাওড়াচ্ছেন।

আলহাজ হাফেজ মাওলানা মুফতী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ এর লেখাগুলো পড়ুন

মূল অালোচ্য বিষয়ের রেফারেন্সসহ ভুল ধরতে না পেরে শুধু বলছেন- “তুই ইহুদী”, অাবার বলছেন “তুই টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছিস!”, কখনোবা বলছেন “তোর উপর অাল্লার গজব পড়বে!” অার কেউ কেউ বলছেন- “তোরে জবাই করুম” কখনোবা বলছেন “সাহস থাকলে দেশে অায়।” অার অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা তো সর্বদাই চলছে। যদিও অনেক ইসলামিক স্কলার দাবি করেন- যারা গালাগাল করে তারা সহীহ মুসলিম নয়, কিন্তু এটা সত্য যে, গালাগাল, ষড়যন্ত্র থিওরী, হুমকি, গজব, অভিশাপ সবই চলছে সমান্তরালভাবে!

অামরা যারা উভয়পক্ষের (মুফতি মাসুদের ইসলামি ব্যাখ্যা এবং তার প্রতিপক্ষের অালেমদের ইসলামি ব্যাখ্যা) যুক্তি ও লিখনি পড়ি তারা অাসলে ষড়যন্ত্র থিওরি, দালালি থিওরি ও ‘হত্যার হুমকি’ পড়ার জন্য অনলাইনে বসি না। অামরা লজিক ও রেফারেন্সসহ উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনতে চাই। অামরা অাসলে বুঝতে চাই- কার দাবি সঠিক কিংবা কে সত্যবাদী অার কে মিথ্যাবাদী?

নারী অধিকার নিয়ে প্রতিটি নারীই এখন অাগের চেয়ে বেশি সচেতন। মুফতি মাসুদ তার লেখা ও ভিডিওগুলোয় দাবি করছেন:-

ইসলামে স্ত্রীকে তার যৌনাঙ্গের মালিকানা দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে স্বামীকে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীকে ঘরের বাইরে বেরোনোর অনুমতিও দেয়া হয়নি। নারীকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভোগ্যপণ্য বলা হয়েছে ইসলামে। ইসলামে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মাসুদ সাহেব তার বিভিন্ন লিখনি ও ভিডিওতে যা দাবি করছেন তার কিছু সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:-

# ১ : নারীর অবস্থান পুরুষের নিচে (Quran 4:34, 2:228)

# ২ : তাদের মর্যাদা পুরুষের অর্ধেক (Quran 2:282, 4:11 Sahih Bukhari 3:48:826, 1:142)

# ৩ : নারী পুরুষের যৌনদাসী (Ibn Hisham-al-Sira al-nabawiyya, Cairo, 1963)

# ৪ : তারা পুরুষের অধিকৃত সম্পত্তি (Sahih Bukhari 5:59:524)

# ৫ : তারা কুকুরের সমতুল্য (Sahih Bukhari 1:9:490, 1:9:493, 1:9:486 Sahih Muslim 4:1032, 4:1034, 4:1038-39 Abu Dawud 2:704)

# ৬ : ভালোবাসার অযোগ্য (Sahih Bukhari 7:62:17 Abu Dawud 41:5119)

# ৭ : তাদের বন্ধক রাখা যায় (Sahih Bukhari 5:59:369)

# ৮ : রজঃচক্র চলাকালীন তারা অপবিত্র (Quran 2:222 Al-Tabari Vol.1 p.280) হজ্ব করার অযোগ্য (Sahih Bukhari 1:6:302)

# ৯ : তারা নিকৃষ্ট (Sahih Bukhari 9:88:219) বুদ্ধিহীন (Sahih Bukhari 2:24:541) অকৃতজ্ঞ (Sahih Bukhari 1:2:28) খেলার পুতুল (Al-Musanaf Vol.1 Part 2 p.263) হাড়ের মত বক্রতা যুক্ত (Sahih Muslim 8:3466-68 Sahih Bukhari 7:62:113, 7:62:114, 4:55:548)

# ১০ : তারা পুরুষের চাষযোগ্য ক্ষেত্র (Quran 2:223 Abu Dawud 11:2138)

# ১১ : তারা শয়তানের রূপ (Sahih Muslim 8:3240)

# ১২ : তাদের মাঝে নিহিত আছে যাবতীয় অমঙ্গল (Sahih Bukhari 4:52:110, 4:52:111)

# ১৩ : তারা বিশ্বাসঘাতক (Sahih Bukhari 4:55:547)

# ১৪ : পুরুষের জন্যে ক্ষতিকারক (Sahih Bukhari 7:62:33)

# ১৫ : নেতৃত্ব দানের অযোগ্য (Sahih Bukhari 9:88:219)

# ১৬ : প্রার্থনা ভঙ্গ হওয়ার কারণ (Sahih Bukhari 1:9:490, 1:9:493)

# ১৭ : চাহিবামাত্র স্বামীর যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে তারা বাধ্য (Sahih Muslim 8:3368)

# ১৮ : পুরুষ কর্তৃক শর্তসাপেক্ষে ধর্ষণের অনুমোদন (Quran 70:29-30 Abu Dawud 11:2153, 31:4006 Sahih Bukhari 5:59:459 Sahih Bukhari 8:77:600, 8:3432, 8:3371)

# ১৯ : স্বামীর অনুগত না হলে তাদের প্রার্থনা গৃহীত হবে না (Muslim Scholar Al-Suyuti while commenting on Quran 4:34 Mishkat al-Masabih Book I, Section ‘Duties of husband and wife’, Hadith No. ii, 60)

# ২০ : পুরুষ পারবে চারজন নারীকে বিয়ে করতে (Quran 4:3)
– পুরুষের জন্য চার স্ত্রীর পাশাপাশি দাসী এবং যুদ্ধবন্দিনী নারীর সাথেও যৌনতা জায়েজ! (Quran 4:24), (তাফসির ইবনে কাছীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন – ৩৪৩, ৩৪৪, ৩৪৫, ৩৪৬, ৩৪৭ পৃষ্ঠা) (সহি মুসলিম, বই- ৮, হাদিস- ৩৪৩২), (Quran 23: 5-6), (সহি মুসলিম, বই- ৮, হাদিস- ৩২৫১)

# ২১ : তালাকের অধিকার রয়েছে শুধু পুরুষেরই (Sahih Bukhari 8:4871-82 Mishkat al-Masabih, Book 1, duties of parents, Hadith No. 15)
– স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিলে অন্য স্বামীর সাথে সহবাস করে সেখান থেকে ঝাঁটার বাড়ি (তালাক) না পাওয়া পর্যন্ত প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে যাওয়া জায়েজ নেই (হিল্লা বিয়ে।) (সূরা বাকারার ২২৫ থেকে ২৩২ অায়াত পর্যন্ত পড়ুন)
– অাবার হিল্লার উদ্দেশ্যে বিয়ে করলে অাল্লাহর লা’নত বর্ষিত হয়, তা-ও বলা হচ্ছে! সূত্র: জামে তিরমিজি: (পৃ- ৪২৫), হাদিস নং: (১০৩৪), প্রকাশক: দারু ইহ্ইয়াউত তুরাসিল আরাবি, বইরুত। এ হাদিসটি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে আরো বর্ণনা করেন ইমাম আহমদ: (৪২৮৩), (৪২৮৪), (৪৪০৩), নাসায়ি ফি সুনানিল কুবরা: (৩/৩২৫) ইব্‌ন আবি শায়বাহ: (৭/২৯২), দারামি: (২২৫), বায়হাকি: (৭/৩৩৯)

# ২২ : স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার অধিকার রয়েছে পুরুষের (Quran 4:34 Sahih Muslim 4:2127) স্ত্রীকে পেটানোর কারণে স্বামীর কাছে কোন কৈফিয়ত তলব করা হবে না (Abu Dawud 11:2142)

# ২৩ : বেহেস্তে পুরুষের জন্যে রয়েছে বহু (Virgin) রমণী সম্ভোগের ব্যবস্থা (Quran 33:48, 44:51-54, 55:56-58, 78:31-35 Ibn Kathir Tafsir of 55:72 Sahih Muslim 40:6795, 40:6796 Sahih Bukhari 4:54:476 Al-Tirmidhi, Sunan. Vol. IV Chap. 21 Hadith: 2687 Sunan Ibn Maja, Zuhd-Book of Abstinence 39)

# ২৪ : শুধুমাত্র নীরবতাই তাদের বিয়ের সম্মতি (Sahih Bukhari 9:86:100, 9:86:101, 9:85:79)

# ২৫ : তাদের একমাত্র কাজ পুরুষের সেবা করা (Mishkat al-Masabih, Book 1, Duties of Husband and Wife, Hadith Number 62 Mishkat al-Masabih, Book 1, duty towards children Hadith Number 43)

অামি অাসলে সত্যটা জানতে ও জানাতে চাই। এই অাধুনিক টেকনোলোজির যুগে গুগল সার্চ করলেই পাওয়া যায় হাদিস, কোরঅানের অায়াত ও ফতোয়া সমূহ। সুতরাং অামরা খুব সহজেই চাইলে সত্যটা জানতে পারি। মুফতি মাসুদ এবং অন্যান্য ব্লগাররা সত্য বলছেন নাকি ইসলামিক পন্ডিতগণ সত্য বলছেন তা যাচাই করতে এখন অার সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হতে হয় না।

অনেকেই অাছে ইসলাম সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, নামাজ-রোজার ধার ধারেনা, কোরঅান-হাদিসেরও ধার ধারেনা; কিন্তু মানবাধিকার, নারী ও অমুসলিম সম্পর্কিত ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে সমালোচনা ও গালাগাল করতে! তেমনি কিছু সমালোচনার স্ক্রিনশট অাপনারা দেখতে পাচ্ছেন নিচে। অামি অার কিছু বলতে চাই না, নিরপেক্ষ থাকতে চাই। সমালোচনার ধরণ দেখে অাপনাদের কি মনে হচ্ছে; অাপনারাই বলুন দয়া করে!

লেখক: ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।