তাবলিগযাত্রী নায়িকার অজানা কথা | ময়ূরী-শফিকের সাক্ষাৎকার

0

বিনোদন ডেস্ক:

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্ধকার যুগের ‘সুপারহিট’ নায়িকা ময়ূরী সম্প্রতি বিয়ে করেছেন শফিক জুয়েল নামের এক যুবককে। ময়ূরীর বর্তমান স্বামী শফিক জুয়েল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৪১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী। ময়ূরীর সঙ্গে পরিচয়, বিয়ে, দাম্পত্য জীবনসহ নানা বিষয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন শফিক জুয়েল।

কেমন আছেন?

শফিক জুয়েল: জি। ভালো আছি।

নায়িকা ময়ূরীর সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হলো?

শফিক জুয়েল: আমি তার ফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করি। তিনি পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল) জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে এসে দেখা করেন। এরপর ফোনে কথা হতো অল্পস্বল্প। তারপর বিয়ে।

বিয়ে হলো কবে?

শফিক জুয়েল: বিয়ে হয়েছে পরিচয়ের তিন-চার মাসের মাথায়। আমি ময়ূরীকে ২০১৭ সালের ২২ জুন বিয়ে করি। সেটি ২৭ রমজান ছিল। তবে বিয়ের কথা প্রকাশিত হয় জুলাই-আগস্টে। আসলে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কারণে আমরা কিছুদিন পরে প্রকাশ করি বিয়ের কথা।

অনেক সংবাদপত্রে আপনাকে তৃতীয় বিয়ে হিসেবে প্রকাশ করা হচ্ছে। এটা কি সত্য?

শফিক জুয়েল: না না, এটা মিথ্যা কথা। আপনার ভাবীর (ময়ূরী) প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পরেই আমার সঙ্গে বিয়ে হয়। তবে মাঝখানে অনেকেই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। তাদের বিশ্বস্ত মনে না করায় লিজা (ময়ূরীর আসল নাম) সবাইকে ফিরিয়ে দেন।

আপনার পরিবার সম্পর্কে বলুন।

শফিক জুয়েল: আমার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলায়। আমার বাবার নাম ইনসাফ আলী ও মা রাফেজা স্বপ্না। আমরা চার ভাই। কোনো বোন নেই আমাদের।

বিয়ের ক্ষেত্রে আপনি পরিবার থেকে কী ধরনের বাধার সামনে পড়েন?

শফিক জুয়েল: হ্যাঁ, তা তো হয়েছিই। আমার পরিবারের সবাই বিষয়টি গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ গ্রামীণ পরিবেশে এমন একটি সিদ্ধান্তকে প্রথমে মেনে নেওয়ার মতো সামাজিক পরিবেশ এখনো আমাদের দেশে তৈরি হয়নি। তবে আমার বাবা আমাদের জন্য দোয়া করেছেন, তিনি নিয়মিত আমাদের সঙ্গে কথা বলেন।

আপনি দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়াশেনা করেন। তারা কীভাবে নিয়েছে আপনার এই বিয়েকে?

শফিক জুয়েল: আমি আসলে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই ভেবেছি অনেক বাধা আসবে, কথা হবে। অনেকেই বিয়ের আগে আমাকে নিরুৎসাহিত করেছে। কিন্তু সমাজে পরিবর্তনের জন্য কিছু করতে হলে আপনাকে প্রতিবন্ধকতা জয় করেই করতে হবে। অনেকেই পেছনে অনেক কথা বলেছে, তবে সামনাসামনি কিছুই বলেনি। ফেসবুকে প্রথমে আমাদের নিয়ে সমালোচনা হলেও এখন মানুষের বোধোদয় হয়েছে যে, কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এভাবে পাবলিক প্লেসে হাসিঠাট্টা করা উচিত নয়। অনেকেই আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ভার্চুয়াল জগতে। তাদের প্রতি আমি ও আমার স্ত্রী কৃতজ্ঞ।

ময়ূরীর আগের পক্ষের মেয়ে আপনাকে কীভাবে গ্রহণ করছে?

শফিক জুয়েল: সে আমাকে খুবই ভালোবাসে এবং মূলত এই বিয়েতে ওর ভূমিকাই বেশি। এর আগে আরো কেউ কেউ ময়ূরীকে বিয়ে করতে চাইছে। সেখানে তিনি (ময়ূরী) পাত্তা দেননি কাউকে, কারণ এঞ্জেল (ময়ূরীর মেয়ে) তাদের পছন্দ করেনি।

একজন তরুণ হিসেবে ময়ূরীকে বিয়ে করার ত্যাগ বা সাহস কখন এল?

শফিক জুয়েল: আমি দেড় বছর ধরে তাকে (ময়ূরী) খুঁজছিলাম। যখন আমি সংবাদ দেখি যে, তার প্রথম স্বামী মারা গেছেন, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই তাকে বিয়ে করার। তারপর নায়িকা হ্যাপি যখন তাবলিগ শুরু করলো তখন আমার মনে হয়েছে যে, আমি একটু ময়ূরীর সঙ্গে দেখা করি। তারপর ফেসবুকে তাকে খুঁজে আমি দেখা করি এবং যেভাবে ভেবেছি, আলহামদুলিল্লাহ, তারপর সব সেভাবেই হয়েছে। এই হচ্ছে কথা, অনেক মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়েছে যা সত্য নয়। মিডিয়ার প্রতি অনুরোধ…!

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কিছু বলতে চান?

শফিক জুয়েল: আমরা নিউজ হতে চাইনি। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতদের অনেক রকম বাধা, সমালোচনা সহ্য করেই বিয়েটা হয়েছে। কিন্তু, নিউজটা আমাদের অজান্তে ছড়িয়ে পড়ে। নিউজগুলোর অধিকাংশ তথ্যই ছিল মিথ্যা। সাংবাদিক ভাইদের প্রতি নিবেদন, আমাদের সাথে কথা বলে সংবাদ করুন। আমার ও ময়ূরীর সঙ্গে কথা বলে আমাদের বক্তব্যটি সঠিকভাবে তুলে ধরে যেন সংবাদ করা হয়। যেমন, আমি মাদরাসা শিক্ষক নই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ময়ূরীর দ্বিতীয় বিয়ে এটি, তৃতীয় নয়। অসত্য বা উড়ো খবরের ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিক কিংবা ইউটিউব ব্যবহারকারীদের উচিত নয় কোনো কিছু প্রকাশ করা। তারা যেন ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনুগ্রহ করে সংবেদনশীলতার পরিচয় দেন।

ছবি ব্যবহার মানে?

শফিক জুয়েল: ময়ূরী চলচ্চিত্র ছেড়ে দিয়েছে প্রায় এক যুগ। এখন সে ব্যক্তিগত জীবনে একটি সন্তানের মা। আমার স্ত্রী। তার ভুল সময়ের ছবি দিয়ে কোনো কিছু প্রকাশ করলে তা তো আমাদের আহত করতে পারে। এখন আমাদের ছবি আছে, আমার সঙ্গে ওর বোরকা পরা ছবি আছে। সাংবাদিক ভাইরা চাইলে আমরা তা দিব। কিন্তু এমন কোনো ছবি যেন না ব্যবহার করেন যাতে একজন নারী যিনি সে সময়ের ভুল বুঝতে পেরে দূরে সরে মার্জিত জীবনযাপন করছেন, তিনি কষ্ট পান। এইটুকু বিনীত নিবেদন রইল মিডিয়ার প্রতি।

ময়ূরীর নাম এলেই অশ্লীল চলচ্চিত্রের কথা তোলেন অনেকে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

শফিক জুয়েল: আমার স্ত্রীকে অশ্লীল সিনেমার নায়িকা বলা হয়। কিন্তু এর জন্য দায়ী প্রযোজক, পরিচালক, সেন্সর বোর্ড। আর তার বিপরীতে যেসব নায়ক অভিনয় করেছে, তাদের অশ্লীল নায়ক বলা হয় না কেন? তার সময়ের এমন কোনো নায়ক নেই, যার সঙ্গে ময়ূরী কোনো সিনেমা করেনি। সমাজের চোখ কেন একজন নারী ময়ূরীর দিকেই পড়ে বারবার?

ময়ূরী সম্পর্কে আপনাকে মূল্যায়ণ করতে বললে কী বলবেন?

শফিক জুয়েল: আমার স্ত্রী আমৃত্যু আল্লাহর পথে চলতে চায়। সে অনেক বড় এবং ভালো মনের অধিকারী। নইলে সে কেন একজন বেকারকে বিয়ে করবে! কত টাকাওয়ালা লোকজন তাকে বিয়ে করার জন্য ঘুরেছে। কিন্তু, সে একজন সৎ ও ভালো মনের মানুষের জন্য অপেক্ষায় ছিল। নায়িকা ময়ূরী তার আয় থেকে অনেককেই দু’হাত ভরে সাহায্য করেছে। আত্মীয়-স্বজনদের বিদেশ পাঠানো, বিয়ে দেওয়া, চিকিৎসা, পড়ালেখা করানো, চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ লাখ লাখ টাকা মামা, খালা, কাজিন, এলাকার লোকজনের জন্য খরচ করেছে। এফডিসি, সার্কাস এসবের সাথে জড়িত অনেক স্টাফ ময়ূরীর টাকায় উপকার পেয়েছে। মানুষ দূর থেকে তাকে যা-ই ভাবুক না কেন, আমি তাকে কাছ থেকে দেখেছি, ভালোবেসেছি। অনেকেই তাকে কষ্ট দিয়েছে, প্রতারণা করেছে, টাকা মেরেছে, ঢাকায় জমি মেরে দিছে, আবার জমির টাকা নিয়ে জমি দেয়নি, উল্টাপাল্টা মিথ্যা নিউজ দিয়েছে। ময়ূরীকে ইউজ করে অনেকেই টাকা কামিয়েছে। ময়ূরী তার সব কথা যদি বলতে পারত, তাহলে মানুষ উপলব্ধি করত তার মানবিক উদারতা। তাকে নিয়ে এভাবে মন্দ কিছু বলতে পারত না।

আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

শফিক জুয়েল: ইনশা আল্লাহ বাকি জীবন একসঙ্গে যেন সুখে থাকতে পারি সে চেষ্টাই করব। আপনারা দোয়া করবেন সবাই। আমরা গত আগস্ট মাসে তিন দিনের তাবলিগে গিয়েছি, এই মাসের শেষে (সেপ্টেম্বর) আবার যাব। আজ (২০ সেপ্টেম্বর) উত্তরায় নাইজেরিয়া থেকে একটি মহিলা তাবলিগ জামাত এসেছিল। আমরা সেখানেও সময় দিয়েছি। স্ত্রী, মেয়ে এঞ্জেল, শাশুড়ি ও আমি এখন টঙ্গীতে বাস করছি। দেশবাসীর কাছে আমরা দোয়া চাই।

মুনমুন আক্তার লিজা, ময়ূরীর আসল নাম। এক সময়ের আলোচিত নায়িকা তিনি। রূপালি পর্দা থেকে দীর্ঘদিন তিনি দূরে আছেন। বিয়ে, চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যাওয়া ও বিয়ের পর তাবলিগ জামাতের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া নিয়ে তিনি এই প্রথম পূর্ণ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

কেমন আছেন?

ময়ূরী: আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি।

কেমন কাটছে নতুন সংসার?

ময়ূরী: জ্বী ভালো। সকলের দোয়ায় আমরা ভালো আছি।

শফিকের সঙ্গে পরিচয় কিভাবে?

ময়ূরী: শফিকের সাথে পরিচয় ফেসবুকে হয়েছে। ও আমাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। পরে সে মাঝেমাঝে টেক্সট দিতো। আমি একদিন আগ্রহ নিয়ে দেখলাম, কে এই ছেলে যে এইভাবে আমার ব্যাপারে আগ্রহী, আমাকে ফোন করে নাছোড়বান্দার মত। সত্যি বলতে আমি, ওকে বেশি কথা বলার জন্য ওর প্র্রোফাইলটা দেখলাম। দেখি, হুজুর ধরনের ছেলেটা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশেনা করে। তো ভাবলাম, এই ধার্মিক ছেলে ময়ূরীকে চেনে কিভাবে? পরে বকাঝকা করার উদ্দেশ্যে কথা বলি। কিন্তু কথা বলে আর বকতে পারিনি, ও এত সুন্দর করে কথা বলছে! আমাকে নিয়ে, আমার মেয়েকে নিয়ে, আমার পরিবারকে নিয়ে। কথা হতো, মাঝেমাঝে ফোন দিতো। এই তো পরিচয়। ও ফোন করলে ভাল্লাগতো। কারণ অন্যদের কথার মধ্যে যে লোভনীয় বা নোংরা একটা ব্যাপার ছিল, তা জুয়েলের মধ্যে ছিল না।

দেখা হলো কবে?

ময়ূরী: দেখা হয় পয়লা বৈশাখে। আমাকে ঐ দিন শফিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে বলে। পরে আমি আমার মেয়ে ও একজন আত্মীয়কে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করি। জাবির বটতলায়। আমি সেদিন সাধারণ একটা পোশাক পরে গিয়েছিলাম যাতে ও চিনতে না পারে। ও চিনতে পারেনি সত্যিই, আমিই ওকে দেখে চিনেছি। সেদিন কথা বলে ওর মধ্যে যে সরলতা দেখেছি তাতে আমি মুগ্ধ হই। আমার মেয়েটা ওকে ভীষণ পছন্দ করে।

তারপর বিয়ে করে ফেললেন?

ময়ূরী: না না, বিয়ে করেছি দুই মাস পরে। দেখা হয়েছে এপ্রিলে আর বিয়ে হয়েছে জুনের শেষের দিকে। আমার মেয়ের একটি অপারেশন হয়। তখন আমরা হাসপাতালে ছিলাম খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে। সে সময় শফিক জুয়েল ওর খালার বাসা থেকে রান্না করে আমাদের জন্য নিয়ে আসে। আসলে তখন আমি এই ওর মধ্যে যে মানুষটাকে দেখেছিলাম তার প্রতি আমার পরিবারের অন্যরাও ইতিবাচক ছিল। (হাসতে হাসতে) আসলে ও-ই যে খাবার রান্না করে খাইয়ে জুয়েল আমাকে ঋণী করেছে। এই ঋণ শোধ করতে গিয়ে কথা হতো। খাবারটা আমি আর আমার মামী খেয়েছি। মামীকে বললাম, দেখেন, এই ছেলেটা থাকে ভার্সিটিতে, অথচ কোথা থেকে কষ্ট করে খাবার রান্না করিয়ে নিয়ে আসছে আমাদের জন্য। এটা এ যুগে আশা করা যায় না।

স্বজনরা রাজি হলো এই অসম বিয়েতে?

ময়ূরী: আমার স্বজন ও হীতকাঙ্খীদের সঙ্গে কথা বললাম জুয়েলকে নিয়ে। ওরা সবাই বললো যে ছেলেটা ভালো। জীবনে অনেক ছেলেই আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। এ রকম ইয়াং একটি ছেলে, স্টুডেন্ট, নিজের স্বাভাবিক চাওয়াকে জলাঞ্জলি দিয়ে আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমার তো বদনাম আর বদনাম। কিন্তু এই ছেলেটা মা-বাবা, ভাই, গ্রামের মানুষ, ভার্সিটির সবাই, সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে নিজেকে কোরবানি দিয়ে আমাকে বিয়ে করতে চায়। একে কষ্ট দেয়া যাবে না। ও সেই ২০১৫ থেকে আমাকে ও আমার মেয়েকে খুঁজতেছে। এগুলো শুনে ওর প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পড়ি। পরে আমি ওকে প্রশ্ন করি, সে কি চায়। ও বলে, আমাকে দ্বীনের পথে আনতে চায়, তাবলিগে নিতে চায়, সুস্থ ও সুন্দর একটি জীবন উপহার দিতে চায়। এমন মানুষকে কষ্ট দেয়া যায় না। আমার প্রথম স্বামী মারা গেলে চেয়েছিলাম আর বিয়ে করব না। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, যেন বিয়ে কপালে লেখা থাকলে এমন কারো সঙ্গে হয় যে আমাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে বলবে, আমার চেহারা যেন আর দেখাতে না হয়। তখন মনে হলো, আল্লাহ মনে হয় এই ছেলেকে পাঠাইছে। তো জুয়েল, ওর তাবলিগের সাথি আকরাম ভাই উনাদের ব্যবহার দেখে আমার খুব ভালো লাগে। এসব কারণেই ওকে বিয়ে করতে সিদ্ধান্ত নিই। তার ওপর আমার মেয়েটাও জুয়লকে ভীষণ পছন্দ করে।

আপনার মেয়ে তাহলে আপনার দ্বিতীয় স্বামীকে মায়ের জন্য পছন্দ করেছে?

ময়ূরী: হা হা হা, তা বলা যায়। হ্যাঁ। আসলে আমার বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। অনেকেই বিয়ে করতে চেয়েছে, আমার মেয়ে মায়মূনা ফিরিয়ে দিয়েছে। অনেকে সম্পদের জন্য বিয়ে করতে চেয়েছে, তাদের সরিয়ে দিয়েছি। অনেক পরে জুয়েল আসে আমার জীবনে। তারপর বিয়ে করি। বিয়েতে আমার মেয়েটা ভীষণ খুশি হয়েছে। ও প্রথম দিন জুয়েলকে দেখে বলেছিল, ‘আম্মু, তোমার এই ভক্তটা না অনেক সুন্দর’। জুয়েলকে ও বাবা বলে এবং জুয়েলও মেয়ের মতই স্নেহ করে। বলতে পারেন, মেয়ের পছন্দেও বিয়েটা করছি। এখন আমরা সুখে আছি।

আপনাদের বিয়ের পর সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বয়সে তরুণ শফিক অনেক চাপে ছিল। সে সময়টায় আপনার কেমন কেটেছে?

ময়ূরী: আমার জন্য ও অনেক কষ্ট সহ্য করছে, এখনো করছে। আমার স্বামী অনেক আঘাত পেয়েছে। আমার খুব খারাপ লাগছে তখন। আমি কান্নাকাটি করেছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি ওকে যেন ধৈর্য ধারণ করতে দেন এবং আমাদের যেন সুখে রাখেন। ধীরে ধীরে এখন আমাদের জীবনটা মসৃন হয়ে উঠছে আল্লাহর রহমাতে। ওর গ্রামের মানুষেরাও ওকে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে।

আপনার কি মনে হয় জুয়েল আপনার অর্থ-বিত্ত বা খ্যাতি এসব কোনো কারণে আপনাকে বিয়ে করেছে?

ময়ূরী: না, কিছুতেই না। তাহলে তো ও আমাকে ফের চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে বলতো। ও তো আমাকে নিয়ে তাবলিগ জামাতে যেত না যেখানে দুনিয়ার কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। আল্লাহ যেন তিল পরিমাণ আমার মনে ওর প্রতি এমন ধারণা জন্ম না নেয়।

সংবাদমাধ্যমে আপনাদের বিয়ের ব্যাপারে নানা কথা আসছে তা দেখেছেন?

ময়ূরী: হ্যাঁ, অনেক সংবাদমাধ্যমই আমাদের সঙ্গে কথা না বলে অসত্য তথ্য প্রকাশ করছে। এটা ঠিক নয়। এটি আমার দ্বিতীয় ও জীবনের শেষ বিয়ে। তৃতীয় বিয়ের গুজব ঠিক নয়। আর আমি সাংবাদিক ভাইদের প্রতি অনুরোধ করি, যে সময়টার ময়ূরী আমি হতে চাই না, সেই অতীত সময়ের ছবি দিয়ে যেন সংবাদ প্রকাশ না করা হয়। আমিও মানুষ। আমার সংসার আছে, সন্তান আছে, আমার ব্যক্তিগত জীবনের প্রাইভেসি প্রতি দয়া করে শ্রদ্ধা পোষণ করুন। অতীতের ময়ূরীকে দিয়ে আমার বর্তমান জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।

অতীতে যে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সে ব্যাপারে আপনার এখনকার প্রতিক্রিয়া কী?

ময়ূরী: আমি ক্লাস নাইনে থাকতে একজন পরিচিত আমাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে নিয়ে আসে। সে সময় আমি অনেক ছোট ছিলাম। ১৪ থেকে ১৫ বছরের মেয়ে। আমি ক্যামেরার কারসাজি বুঝতাম না। আমাকে তখনকার বড় বড় নায়িকার ভিডিও, ছবি দেখিয়ে বলা হতো, তারা যদি এমনভাবে অভিনয় করতে পারে, তুমি পারবেনা কেন? সে অনেক কথা। সে সব কথা বললে অনেকের মুখ থাকবে না। আমার সঙ্গে কোনো নায়ক সে সময় অভিনয় করেনি? পরিচালক, প্রযোজকরা আমাকে যেভাবে উপস্থাপন করেছে বাণিজ্যিক স্বার্থে তা যখন আমি বুঝতে পারলাম তখন সরে আসি। আর তখনই ওরা কাটপিস ব্যবহার শুরু করে, আমি সেগুলো জানতে পেরে কষ্ট নিয়ে এফডিসি ছেড়েছি। পেছনের সেই সব দিনের কথা আর মনে করতে চাই না। এখন সামনে এগিয়ে যেতে চাই মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে।

সোস্যাল মিডিয়ায় আপনার বিয়ে নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। জানেন?

ময়ূরী: জানি। অনেকেই আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। অনেকেই আক্রমণ করে কথা বলেছে। সবচেয়ে কষ্ট লেগেছে কিছু মেয়ে আমাদের নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছে। আমি একটি মেয়ে, এই মেয়ের প্রতি এসব মেয়েদের এমন ধারণা দেখে কষ্ট পেয়েছি। ওরা কীভাবে আরেকটি মেয়ের নতুন জীবন নিয়ে এমন করতে পারলো? নারী বলেই আমার প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি। আমার সাথে অভিনয় করা নায়করে ব্যাপারে ওরা কিছু বলে না। যেসব ছেলেরা শফিক জুয়েলকে নিয়ে কথা বলে তাদের বলবো, জুয়েলের মত এমন সিদ্ধান্ত কয়জন নিতে পারবে? একটি বিধবা মেয়েকে যে শফিক বিয়ে করেছে তার মত বুকেরপাটা কজনের আছে?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শফিকের বন্ধু, সিনিয়র ও জুনিয়রদের উদ্দেশ্য কিছু বলবেন?

ময়ূরী: সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

ভবিষ্যতে কী পরিকল্পনা আছে?

ময়ূরী: আপাতত পরিকল্পনা দুজনে মিলে এক চিল্লার উদ্দেশ্যে তাবলিগ জামাতে যাবো। তারপর অন্যান্য কিছু। আমরা বিয়ে করেছি শবে কদরের রাতে। শফিকের সঙ্গে হজ করতে যাবো ২০১৯ বা ২০২০ সালে।

ভক্ত, পাঠক, দর্শকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার আছে?

ময়ূরী: দেশবাসীর কাছে অনুরোধ, আমাকে খারাপ চোখে দেখবেন না। আমি আপনাদের মা-বোনের মত। আমি যে অবস্থানে আছি সেরকম যে কোন মেয়ের জীবনে ঘটতে পারতো। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবেন না। অন্তত আমার স্বামী শফিক জুয়েলকে নিয়ে কোনো খারাপ কথা বলবেন না, কারণ ও অনেক সরলমনা একটি ছেলে। সে কোনো হাসি ঠাট্টার কাজ করেনি। সে অনেক বড় একটা কাজ করেছে। আমার মেয়ে ও জুয়েলকে নিয়ে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যেন সুখে-শান্তিতে ঈমান নিয়ে বাঁচতে পারি সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

সাক্ষাৎকার দু’টো নিয়েছেন মঈনুল রাকীব।
কৃতজ্ঞতা: ঢাকা টাইমস

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।